ইতিহাস: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের যত যু’দ্ধ

0

ফিচার ডেস্ক:

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘা’তে নড়েচড়ে বসেছে পুরো বিশ্ব। বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সর্বত্রই নাক গলাতে আসে। ফলে সেসব দেশের সঙ্গে সংঘা’ত অনিবার্য হয়ে পড়ে। মেক্সিকো থেকে শুরু করে ইরান পর্যন্ত বেশ কয়েকটি দেশের সঙ্গে সংঘা’তে জড়িয়েছে দেশটি। তারই ধারাবাহিক বিবরণ তুলে ধরা হলো-

মেক্সিকো যু’দ্ধ

মেক্সিকো যু’দ্ধই যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম যু’দ্ধ। এটি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেমস কে পোলকের চাপিয়ে দেওয়া একটি যু’দ্ধ। ১৮৪৬-১৮৪৮ সালে এ যু’দ্ধ সংঘটিত হয়। এই দু’ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২.৭২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করে। এ যু’দ্ধের প্রধান কারণ ছিল টেক্সাস। যা ১ দশক আগে মেক্সিকোর কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছিল। চূড়ান্তভাবে জয়ী হওয়ার পর মেক্সিকোর ভূখণ্ডের ৩ ভাগের ১ ভাগ আমেরিকার দখ’লে চলে যায়। মেক্সিকো যু’দ্ধে ১৩,২৮৩ জন মার্কিন সেনা নিহ’ত হয়।

স্পেন যু’দ্ধ

১৮৯৮ সালে স্পেনের সঙ্গে যু’দ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্র। এটি ক্ষণস্থায়ী যু’দ্ধ ছিল। একে ইতিহাসের প্রথম ‘গণমাধ্যম যু’দ্ধ’ বলা হয়। মনরো মতবাদের প্রেক্ষাপটে মার্কিন কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে এ যু’দ্ধ ঘোষণা করে। ৪ মাস স্থায়ী সেই যু’দ্ধে ২,৪৪৫ জন মার্কিন সদস্য মা’রা যায়। বিপরীতে প্রায় ১৬,০০০ স্প্যানিশ সৈন্য প্রাণ হারায়। এ যু’দ্ধের ব্যয় ধরা হয় ১০.৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ যু’দ্ধের ফলে যুক্তরাষ্ট্র ঊনবিংশ শতকের শেষভাগেই একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

জার্মানি যু’দ্ধ

১৯১৪ সালে ইউরোপে যু’দ্ধ শুরু হয়। একে প্রথম বিশ্বযু’দ্ধ বলা হয়। এ যু’দ্ধের প্রথম ৩ বছর যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষ ছিল। ১৯১৭ সালের ২ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিরু’দ্ধে যু’দ্ধ ঘোষণা করে প্রথম বিশ্বযু’দ্ধে অংশ নেয়। তার ১৯ মাস পর বিশ্বযু’দ্ধ শেষ হয়। এ যু’দ্ধে ১ লক্ষ ১৬ হাজার ৫১৬ জন মার্কিন সেনা মা’রা যায়। এতে ৩৮১.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে যুক্তরাষ্ট্র।

ইউরোপীয় যু’দ্ধ

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হার্বারে জাপানিদের বো’মা বর্ষণের পরদিনই ২য় বিশ্বযু’দ্ধের মিত্রজোটে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। জার্মানি ও ইতালি যুক্তরাষ্ট্রের বিরু’দ্ধে যু’দ্ধ ঘোষণার ৩ দিন পরই যুক্তরাষ্ট্রও দেশ দু’টির বিরু’দ্ধে যু’দ্ধের ঘোষণা দেয়। ১৯৪৫ সালের মে মাসে ইউরোপীয় যু’দ্ধের সমাপ্তি ঘটে। আগস্টে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বো’মা ফেলার নির্দেশ দেন। যার আঘা’তে বিধ্ব’স্ত হয়ে সে বছরই আত্ম’সমর্পণ করে জাপান।

কোরিয়ান যু’দ্ধ

১৯৫০ সালে কোরিয়ান যু’দ্ধের শুরু। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীকে দক্ষিণ থেকে উৎ’খাত করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের সমর্থন নেয়। তৎকালীন মার্কিন জেনারেল ডগলাস ম্যাক আর্থারের কাজকে যু’দ্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করে সংঘ’র্ষে জড়ায় চীন। ডুইট আইজেনহোয়ার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এ যু’দ্ধ শেষ হয়। যু’দ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৩৮৯.৮১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ হয়। এতে প্রায় ৩৬ হাজার মার্কিন সেনা মা’রা যায়।

ভিয়েতনাম যু’দ্ধ

এটি মার্কিন ইতিহাসের এক ব্যর্থ যু’দ্ধ। ১৯৫৪ সালে ভিয়েতনামিরা ফরাসিদের পরাজিত করে উপনিবেশবাদ যুগের অবসান ঘটায়। ১৯৫৫ সালে আঞ্চলিক একটি সংঘা’ত থেকে ভিয়েতনাম যু’দ্ধ রূপ নেয়। ১৯৬৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর দিয়েমকে হ’ত্যা করা হয়। নতুন সামরিক নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ ভিয়েতনামি সরকার ভিয়েতনামিদের সমর্থন হারাতে শুরু করে। ১৯৬০-এর দশকের শেষদিকে যু’দ্ধের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জনসাধারণের সমর্থন হারাতে শুরু করে। ১৯৭৩ সালে ভিয়েতনাম থেকে সেনা প্র’ত্যাহার করে নেয় আমেরিকা। ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনাম কমিউনিস্ট উত্তর ভিয়েতনামের কাছে পরাজিত হয়। এ যু’দ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৮৪৩.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয়। যু’দ্ধে ৫৮ হাজার সেনা নিহ’ত হয়।

ইরাক যু’দ্ধ

প্রচলিত আছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হোসেনের বিরু’দ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালিয়ে ইরাকে হাম’লা চালায়। ইরাকের এ সংঘা’তের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় ১ ট্রিলিয়নের বেশি মার্কিন ডলার ব্যয় করতে হয়। সাদ্দামের কাছে ব্যাপক অ’স্ত্র রয়েছে বলে মার্কিন সেনারা ২০০৩ সালে ইরাকে আক্র’মণ করে। দেশটি এখনো সংঘা’ত ও সন্ত্রা’সের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত। এখন পর্যন্ত সাদ্দাম হোসেনের সেই বিধ্বং’সী অ’স্ত্রের সন্ধান দিতে পারেনি আমেরিকা। ৭ বছর ৫ মাসব্যাপী এ যু’দ্ধে ৪ হাজার ৪১০ জন মার্কিন সেনা মা’রা যায়।

আফগান যু’দ্ধ

২০০১ সালে শুরু হয় আফগান যু’দ্ধ। যা এখনো চলছে। ২০০১ সালে ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বে আল-কায়েদা হাম’লা চালিয়েছে এমন অভিযোগে আফগান সরকারের কাছে লাদেনকে হস্তান্তর করার আহ্বান জানায়। তালেবানরা প্রস্তাব প্র’ত্যাখ্যান করলে যু’দ্ধের সূত্রপাত হয়। ২০০১ সালের হাম’লার পর থেকে আফগানিস্তানে আন্তর্জাতিক জোট বাহিনীর প্রায় সাড়ে ৩ হাজার সৈন্য মা’রা যায়। এর মধ্যে ২ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি যুক্তরাষ্ট্রের। এ সংঘা’তে ৩২ হাজারেও বেশি বেসামরিক লোক মা’রা যায়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে সেনা প্র’ত্যাহারের ঘোষণা দিলে এখনো তালেবান-মার্কিন শান্তি আলোচনা চলছে।

ইরান যু’দ্ধ

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্দেশে ২০১৯ সালের ৩ জানুয়ারি ড্রোন হাম’লায় ইরানের জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহ’ত হওয়ার পর বিশ্ব পরিস্থিতি উত্তে’জনাকর পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। ইরান আর আমেরিকার পাল্টাপাল্টি হুম’কির মুখে ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ইরান ১ ডজনের বেশি ব্যালিস্টিক মিসাইল হাম’লা চালিয়েছে। সোলেইমানিকে দাফনের একটু আগেই ইরানের স্থানীয় সময় ৮ জানুয়ারি রাত দেড়টার দিকে এ হাম’লা শুরু হয়। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলা হয়েছে, সোলেইমানিকে ড্রোন হাম’লায় হ’ত্যার জবাব হিসেবে এ হাম’লা করা হয়েছে। তারা এই অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন শহীদ সোলেইমানি’। এই ঘটনায় তেহরান বিমানবন্দর থেকে ১৭৬ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে উড্ডয়নকারী ইউক্রেনিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহিনী বিমানকে মার্কিন বিমান মনে করে মিসাইল হাম’লা করে বসে ইরানি সেনাবাহিনী। এর ফলে প্রাণ হারায় সবাই।

প্রথমদিকে একে দুর্ঘটনা বলে দাবি করলেও ভিডিও ফুটজ প্রকাশিত হলে দেখা যায় একটি ইরানি মিসাইল বিমানটিকে আঘা’ত করেছে। এ ঘটনার দায় স্বীকার করতে বাধ্য হয় খোমেনি প্রশাসন। এই হাম’লায় নিহ’ত হয় বহু ইরানি বেসামরিক মানুষ। দায় স্বীকার করার পর জনতা রাস্তায় নেমে এসেছে খোমেনি সরকারের পদত্যাগের দাবিতে।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

শেয়ার করুন !
  • 238
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!