বাংলাদেশে নির্মিত নৌবাহিনীর নতুন পেট্রোল ভ্যাসেলে যা যা থাকছে

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ নৌ-বাহিনীর অধীস্থ চিটাগং ড্রাই ডক এন্ড শিপইয়ার্ড দ্বারা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য ৬টি অফশোর পেট্রোল বোট তৈরির টেন্ডার ডাকা হয় যার স্পেফিকেশন দেখে অনেকেই হতা’শা প্রকাশ করেছেন।

মূলতঃ টেন্ডার স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী অনেকেই আশা করেছিলেন এই ভ্যাসেলগুলোকে ভারি অ’স্ত্র এবং আধুনিক স্টেট অব দ্যা আর্ট টেকনোলজি দ্বারা সজ্জিত করা হবে। অ’স্ত্র ব্যবস্থা মোটামুটি একটি কর্ভেট কিংবা মিসাইল পেট্রোল ক্রাফটের সমতুল্য হবে। কিন্তু আদতে দেখা গেল এগুলোর অ’স্ত্র আমাদের নিজেদের তৈরিকৃত পদ্মা ক্লাস পেট্রোল বোটের অপেক্ষায় কম। মাত্র ১টি ৩০ মি.মি. অটোমেটিক ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম যুক্ত নেভাল/ এয়ার ডিফেন্স গান এবং সাথে ২টি .৫০ ক্যালিবার জেনারেল পারপাজ হেভি মেশিনগান রয়েছে।

৮৫ মিটার বা তার বেশি দৈর্ঘ্যের একটি জাহাজে মিসাইল ব্যবস্থা তো দূরে থাক আছে ১টি ৩০ মি.মি. গান শুধু! এরকম একটি জাহাজ, যাতে প্রায় ১১ টন ওজনের ভারি হেলিকপ্টার ওঠানামার মত আধুনিক ব্যবস্থা থাকবে, তাতে এত কম অ’স্ত্র রাখাটা সাধারণ ডিফেন্স লাভারদের জন্য হতা’শাজনকও বটে।

তবে অফশোর পেট্রোল বোটের রোলটা বুঝলে এই হতা’শা আর থাকবে না আশা করি। প্রথমে জানতে হবে একটি নেভাল ফ্লিটের অংশ হিসাবে ফ্রিগেট, কর্ভেট, মিসাইল ক্রাফট এবং এই অফশোর পেট্রোল বোট এর মাঝে তফাতটা কোথায়?

এখানে মূল তফাতটাই হচ্ছে মিশন। কার মিশন কি! এপিসি ইউনিট দিয়ে যেমন সেনাবাহিনী আর্টিলারি মিশন চালাতে সক্ষম নয়; তেমনি ফ্রিগ্রেট, কর্ভেট কিংবা মিসাইল বোটের মত হেভিলি আর্মড কিছু দিয়ে শুধু মাত্র শান্তিকালীন পেট্রোল দেয়া সম্ভব নয়।

অফশোর পেট্রোল ভ্যাসেল হল এমন একটি জাহাজ যার মুল মিশন হচ্ছে শান্তিকালীন সময়ে নিজের সমুদ্র সীমা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক জলসীমায় বানিজ্যিক জাহাজ, যাত্রীবাহী জাহাজ, ফিশিং বোটগুলোর নিরাপত্তা প্রদান করা বিভিন্ন জলদ’স্যু গ্রুপ থেকে। শুধু তাই নয় নিজ জলসীমা বা আন্তর্জাতিক জলরাশিকে ব্যবহার করে ঘটা বিভিন্ন অপরাধ, যেমন- মানব পাচার, অ’বৈধ অ’স্ত্র এবং মা’দক চোরা-চালান প্র’তিরোধ করে দেশের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রদান করা। দু’র্যোগকালীন সময়, যেমন- ঘূর্ণি’ঝড়ের সময় গভীর সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য অফশোর পেট্রোল বোটকে বিশেষভাবে ব্যবহার করা হয়।

আর উপরোক্ত দ্বায়িত্বগুলো পালনের জন্য এমন ক্যাটাগরির জাহাজ দরকার, যা একইসাথে গভীর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ভেঙে সী-স্টেট ৬ এর মত কঠিন ও বিপ’জ্জনক পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে মিশন ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। সেই সাথে সী-স্টেট ৯ এর মত অতিরিক্ত বিপ’জ্জনক পরিস্থিতিতে সারভাইভ কর‍তে সক্ষম। এই ধরনের অপারেশনের জন্য এমন ধরনের জাহাজ দরকার, যা বিনা রসদে সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত সাগরে নিজের অপারেশন চালাতে পারবে। আর রসদসহ মাসের পর মাস মিশন চালানো সম্ভব, কোন রকম টেকনিক্যাল সমস্যা ছাড়াই। উপরোক্ত অবস্থা বিবেচনায় এমন জাহাজ দরকার, যা তার রাডার ব্যবহার করে অধিক দূরত্ব পর্যন্ত নজরদারি করতে সক্ষম হবে। পাশাপাশি বিপজ্জনক অবস্থায় মানবিক সহায়তা কিংবা রেস্কিউ মিশন পরিচালনা করতেও সক্ষম।

এই ধরনের রোলে জন্য তাই কোন হেভিলি আর্মড জাহাজের দরকার হয় না বরং এমন একটি জাহাজ দরকার যা এসব মিশন পরিচালনা করতে অধিক পারদর্শী। নেভির বহরে এ ধরনের জাহাজ না থাকায় এতদিন তাদের ফ্রিগেট কর্ভেটের মত স্পর্শকাতর অ’স্ত্র সমুহকে শান্তিকালীন সময় দিনের দিন সমুদ্রে মোতায়েন রাখতে হয়েছে। যার ফলে এসব জাহাজের আয়ুস্কাল কমার পাশাপাশি এসব জাহাজে অত্যধুনিক সেন্সরসমুহ বিভিন্ন টেকনিক্যাল সমস্যায় পড়েছে। এতে নেভির খরচ বেড়ে গেছে এবং প্রয়োজনীয় সময়ে এসব জাহাজের ফুল টাইম ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

লক্ষ্যণীয়, আমাদের অধিকাংশ ফ্রিগেটের মিসাইল সিস্টেমগুলো হয় খুলে রাখা হয়েছে অথবা ক্যাপাসিটির তুলনায় কম মিসাইল বহন করছে। এর কারন সামুদ্রিক বাতাসে লবণাক্ততা বেশি হওয়ায় এসব সিস্টেমের উপর ক্ষ’তিকর প্রভাব পড়তে পারে। শুধু তাই নয়, নেভাল গ্রেড হলেও জাহাজের সেন্সরসমুহ সামুদ্রিক পরিবেশে কম বেশি ক্ষ’য়প্রাপ্ত হয়ে থাকে। সে তুলনায় অফশোর পেট্রোল ভ্যাসেলের মত জাহাজগুলো এমনভাবে ডিজাইন করা হয়, যাতে এতে খরচ কম হয় সেই সাথে পেট্রোলিং এবং উদ্ধার অভিযানের মত শান্তিকালীন পরিস্থিতিতে এসব জাহাজকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস কোন সমস্যা ছাড়াই ব্যবহার করা যেতে পারে।

আর যেহেতু এ ধরনের জাহাজগুলো শান্তিকালীন অবস্থা বিবেচনায় বানানো হয় তাই সেই পরিবেশ বিবেচনায় এতে ভারি অ’স্ত্র লাগানোর কোন প্রয়োজন থাকে না। কারন তা নিছক অ’পচয় ছাড়া কিছুই নয়। উপরোক্ত মিশন পরিচালনার জন্য ৩০ মি.মি. নেভাল গান যথেষ্ট। তার জন্য মিসাইল লঞ্চার রাখার প্রয়োজন নেই। এ ধরনের জাহাজে লং রেঞ্জ রাডার থাকে। যা দ্বারা একটি জাহাজ একটি বিশাল এলাকার নজরদারি একাই করতে পারে। জলদ’স্যু বা চোরা-কারবারীদের সাথে ল’ড়াইয়ের জন্য মিসাইল বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের প্রয়োজন নেই। এজন্য ৩০ মি.মি. এবং .৫০ ক্যালিবার মেশিনগানই যথেষ্ট।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীতেও একই ধরনের অফশোর পেট্রোল ভ্যাসেল রাখা হয়। যা মুলত এই ধরনের অ’স্ত্র ব্যবহার করে থাকে। তাই বলে এসব জাহাজকে আন্ডারপাওয়ারড ভাবার উপায় নেই। কারন প্রয়োজন হলে এইসব জাহাজকে যেন ভারি অ’স্ত্র দ্বারা সজ্জিত করা যায় সেই ব্যবস্থা রাখা হয়। তাই নেভির জন্য এ ধরণের জাহাজযুক্ত করা পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে খুবই যুগপোযুগী একটি পদক্ষেপ।

তবে অ’স্ত্র নিয়ে যেহেতু অনেকের হতা’শা রয়েছে এবং আমরাও মনে করি আমাদের অফশোর পেট্রোল ভ্যাসেলগুলো সী-ড্রাগন ক্লাসের মত মেইন গান হিসাব ৫৭ মি.মি. গান রাখা যেতে পারে। সেই সাথে ২টি অপশনাল ৩০/২০ মি.মি. গান ব্যবস্থা রাখলে হয়তোবা জাহাজগুলো স্বাভাবিক মিশনের পাশাপাশি সাধারণ স্ট্রাইক মিশনও পরিচালনা করতে সক্ষম হত।

© ডিফেন্স রিসার্চ ফোরাম

শেয়ার করুন !
  • 31
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply