❝পাকিরা বললো ‘মেরা ভাই’, বাঙালির আনন্দের আর সীমা নাই❞

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

বছরখানেক আগের ঘটনা। মিরপুর স্টেডিয়াম, পাকিস্থানের পতাকা উড়ছে! কারো হাতে কারো মুখে। এক বাচ্চার মুখের এক পাশে পাকিস্থানের পতাকা আঁকা। আরেক পাশে বুম বুম আফ্রিদি। একজন আবার পাকিস্থানের পতাকা হাতে গ্যালারির এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত দৌড়াচ্ছিলেন যার পিঠে লেখা প্রজন্ম একাত্তর!

কয়েকদিন পরেই একটি জাতীয় দৈনিকে পড়েছিলাম এই ম্যাচে পাকিস্থানের এতো সমর্থন দেখে পাকিস্থানের বিভিন্ন দৈনিকে লেখা হয়েছে বাংলাদেশের মুসলিম ভাইয়েরা ৭১ এ তাদের (আমাদের) ভুল বুঝতে পেরে পাকিস্থানি ভাইদের বুকে টেনে নিয়েছে। তারা আশা করছে অনেকদিন পর হলেও আবার দুই পাকিস্থান এক হবে!

আফসোস, আমাদের দেশের এই তরুণদের জন্য, তারা কি একবারও ভাবে না ৩০ লাখ শহীদ ও ৬-৮ লাখ মা-বোনের আত্ম’ত্যাগের কথা! যে জাতি আমাদের অস্তিত্ব চায়নি সেই জাতির সাফল্যে আনন্দিত হওয়া, ব্যর্থতায় ক’ষ্ট পাবার কোন অধিকার কি আমাদের আছে? স্বাধীনতার ৫ দশকেও গণহ’ত্যার জন্য ক্ষমা চায়নি তারা। সেই সাথে ১৪ই ডিসেম্বর এবং ১৯৭১ এ যে আমাদের জাতিগতভাবে পঙ্গু করে দিয়ে গেল তার কি কোন ক্ষমা আছে? থাকতে পারে?

অনেকেই বলেন, ক্রিকেটের সঙ্গে রাজনীতি মেশাবেন না। এই কথাটি যারা বলে থাকেন, তারা হয় অ’জ্ঞতার কারণে করেন কিংবা জ্ঞানপাপে কথাটি বলে থাকেন। ক্রিকেটের ইতিহাস পড়লে তাদের জানা থাকার কথা- ব’র্ণবাদী নীতির (শুধু শ্বেতাঙ্গরাই খেলবে এবং শ্বেতাঙ্গদের বিপক্ষেই খেলবে)। যার কারণে ১৯৭০ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেট খেলতে পারেনি দক্ষিণ আফ্রিকা, এমনকি ওয়ানডেও। একটি দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে আন্তর্জাতিকভাবে ব’র্জন করার এই নীতি তাহলে কোন নীতি? পাকিস্থান-ভারতে দীর্ঘদিন ক্রিকেট খেলছে না কোন নীতিতে? সিদ্ধান্তটা রাজনৈতিক। ক্রিকেট রাজনীতি। আমাদের মুক্তিযু’দ্ধের নানা ঘটনাবলীর সঙ্গেও তেমনি জড়িয়ে রয়েছে ক্রিকেট।

আজকে রাজনীতিতে এসে পাকিস্থানের ক্রিকেট নায়ক ইমরান খান ৭১ এর ঘটনায় বাংলাদেশের কাছে পাকিস্থানের ক্ষমা চাওয়া উচিত মনে করলেও ক্ষমা তারা চায়নি। ১৯৭১ সালে কোথায় ছিলেন এই ইমরান খান? নিজ কানে নাকি তিনি বাঙালিদের হ’ত্যা করার নির্দেশ শুনেছিলেন। তখন তো এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে রাজনৈতিক ব্যবসা করবেন এই আশায় এখন এসব নাটক করছেন? বাংলাদেশ এখন সব দিকে পাকিস্থান থেকে যোজন যোজন এগিয়ে আছে। তাই আন্তর্জাতিক বিভিন্ন কোরামে বাংলাদেশকে পাশে টানার চেষ্টায় এসব বলছেন?

একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্থানি বাহিনীর জঘ’ন্যতম হ’ত্যাযজ্ঞের বিরু’দ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন পাকিস্থানি সাংবাদিক হামিদ মীরের বাবা ওয়ারিস মীর। তাই তাকে সম্মাননা দিয়েছিল বাংলাদেশ। হামিদ মীর তার বাবাকে দেওয়া সেই সম্মাননাও ফেরত দিতে চায়। হামিদ মীরের ভাষ্য, ‘সম্মাননার মাধ্যমে পাকিস্থানিদের ধোঁকা দেওয়া হয়েছে। তাই এই সম্মাননা ফেরত দেওয়া উচিত’।

বাংলাদেশকে টেস্টে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় আইসিসিতে একমাত্র বিরো’ধীতা করেছিল এই পাকিস্থান। শুধু তাই নয়, বর্তমানে তারা কথা দিয়েও আমাদের দেশে এসে সিরিজ খেলতে অ’স্বীকৃতি জানায়। যেখানে আমাদের নারী ক্রিকেট দল পাকিস্থানের বাজে পরিস্থিতি মধ্যেও, সেখানে গিয়ে সিরিজ খেলে এসেছে। ২০১৫ সালে পাকিস্থানের বাংলাদেশ সফরের প্রাক্কালে পিসিবি দাবি করেছিল সিরিজ থেকে প্রাপ্ত আয়ের ৫০ ভাগ না দিলে পাকিস্থান খেলোয়াড়দের পাঠাবে না। বিসিবি সেটা প্র’ত্যাখ্যান করে। যদিও পরে পাকি ক্রিকেটারদের বিমানভাড়া দিয়ে আনতে হয়েছিল।

পাকিস্থানি খেলোয়াড়রা আমাদের দেশের অনেকের কাছেই স্বপ্ন-পুরুষ, এই ধারণা আমাদের দেশের অনেক তরুণ-তরুণীর মনেই আছে। আপনাদের এসব স্বপ্ন-পুরুষদের চরিত্রের কথা একটু বলা দরকার। ২০১০ সালে ইংল্যান্ড সফরে পাকিস্থানি কয়েকজন খেলোয়াড় যা করেছে তা ক্রিকেট ইতিহাসেরই সবচেয়ে বড় কল’ঙ্কের জন্ম দিয়েছে। স্পট ফিক্সিং করে জেল খেটেছে সালমান বাট, মোহাম্মদ আসিফ এবং মোহাম্মাদ আমির। জুয়াড়ি মাজহার মাজিদের ভাষায় দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটার টাকা, নারী, খাবার ছাড়া কিছুই বোঝেনা।

জুয়া, মা’দক এবং নারী কেলে’ঙ্কারি পাকিস্থান ক্রিকেটে বহু পুরনো অধ্যায়। ইএসপিএন ক্রিকইনফো-তে পাকিস্থানি ক্রিকেটারদের স্ক্যান্ডাল নিয়ে প্রচুর আর্টিকেল এবং তথ্য প্রমাণ রয়েছে। মূলতঃ ক্রিকেটে ফিক্সিংয়ের প্রচলন করে পাকিস্থানিরাই। যাদেরকে তারা গ্রেট হিসেবে দাবি করে, সবার জীবনেই জড়িয়ে আছে এসব অধ্যায়।

পাকিস্থান ভালো খেলে এই যুক্তিও যথেষ্ট প্রচলিত। কিন্তু ভালো কি শুধু পাকিস্থানই খেলে? ভাল খেলার কথাই যদি ধরা হয় তাহলে সবার আগে আসবে অস্ট্রেলিয়ার নাম।

পাকিস্থান মুসলিম দেশ তাই পাকিস্থানের সমর্থন করি- এই কথাটাও যথেষ্ট জনপ্রিয়। কিন্তু একটু ভালভাবে চিন্তা করে দেখি তো, কথাটা কতটুকু যক্তিসঙ্গত? বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় সারাদেশ আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকায় ছেয়ে যায়। কেন পয়গম্বরের দেশ সৌদি আরব-সেনেগাল কি মুসলিম দেশ না? আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সাথে সৌদি-সেনেগালের ম্যাচে আমাদের দেশের কয়জন মানুষ সৌদি-সেনেগালের পক্ষ নেয়? কয়টা পতাকা উড়ে বাড়ির ছাদে? তখন মেসি-নেইমারদের নামই জপা হয়।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পাকিস্থান যতবার খেলতে এসেছে, মুক্তিযু’দ্ধ ২১ ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ অথবা ১৬ই ডিসেম্বর নিয়ে প্রতিবারই পাকিস্থান অধিনায়ক অথবা ম্যানেজারকে প্রশ্নের সম্মুখীন করেছেন এদেশের কিছু সাংবাদিক। আর প্রতিবারই এসব প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন তারা কখনো বা বির’ক্তির ভাব নিয়ে, কখনো বা নো কমেন্ট বলে, কখনো বা বলেছেন, আমরা এখানে শুধুমাত্র ক্রিকেট খেলতে এসেছি।

আমাদের দেশে পাকিস্থানের হাইকমিশন, পাকিস্থানের পতাকা হাতে নেওয়া যে কোনো দল- এমনকি পাকিস্থানের জাতীয় পোশাক কাবুলি সালোয়ারকেও সবার ঘৃণা করা উচিত। অন্তত কারো ভেতরে ১৯৫২, ১৯৭১ এর নৃশং’স ঘটনার প্রতি ছিটেফোঁটা মমতাও যদি থেকে থাকে। পাকিস্থান আমাদের সঙ্গে কী করেছে, আশা করি তা জানার জন্য উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার দরকার নেই। আমজনতা তথা ঘোরতর বাঙালি সবারই এই সত্য জানার কথা।

সম্প্রতি তিন কিস্তির পাকিস্থান সফর নিয়ে এক শ্রেণির বাঙালি আনন্দে উদ্বেলিত। বিশেষ করে গণমাধ্যমে পাকিস্থানি দর্শকদের মুখে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদেরকে শুভ কামনা জানানো, পাকিস্থানি পুলিশ সদস্যের মুখে বাংলা ভাষায়- বাঙালি পাকিস্থানি ভাই ভাই, আমি তোমাকে ভালোবাসি- শোনার পর পাকিপ্রেমি বাঙালি যেন আকামের চাঁদ হাতে পেয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাল্টা ভালোবাসা জানানোর হিড়িক পড়ে গেছে। অথচ তারা এটা ভাবছে না, ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশ পাকিস্থানে বিদেশি বিনিয়োগ বলতে গেলে নাই, পর্যটকরা আগ্রহী নয় পাকিস্থান ভ্রমণে, ক্রিকেট বাণিজ্য শুন্যের কোঠায়। এমন অবস্থায় বিদেশি দান খয়রাতে চলা দেশটি ক্রিকেটের মাধ্যমে জ’ঙ্গিবাদের আঁতুড়ঘরের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে নেমেছে। আর এখানে বাংলাদেশকে বানানো হয়েছে গিনিপিগ।

প্রেসিডেনশিয়াল স্ট্যাটাসের সিকিউরিটি দেয়ার মাধ্যমে বহির্বিশ্বকে পাকিস্থান এই বার্তা দিতে চায়- আমাদের এখানে নিরাপত্তার অভাব নাই। তোমরা আসো, ক্রিকেট খেলো। আমাদেরকে উদ্ধার কর। বাংলাদেশ সফলভাবে ক্রিকেট খেলে দেশে ফিরতে পারলেই পাকিস্থানিদের মোক্ষলাভ হয়। অথচ শ্রীলঙ্কার ওপর হাম’লার পর পাকিস্থানে ক্রিকেট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আরব আমিরাতকে হোম ভেন্যু বানিয়ে বহু দেশের সাথে পাকিস্থান ক্রিকেট খেলেছে। কিন্তু সে সময় বাংলাদেশকে তারা আমন্ত্রণও জানায়নি। আজ নিজের দেশে ক্রিকেটকে ফেরাতে আইসিসির মধ্যস্থতায় বাংলাদেশকে সফরে যেতে রাজি করিয়েছে। নিমকহারাম তাদেরকে এমনি এমনি বলে না।

মূলতঃ পাকিস্থানের কাছ থেকে শিক্ষার কিছুই নেই। ক্রিকেট মাঠে আর মাঠের বাইরে অ’সততার জ্বলন্ত উদাহরণ এই জাতি। জ’ঙ্গিদের অভয়ারণ্য পাকিস্থানে বেশ কয়েক বছর ধরেই কোনো বিদেশি দল খেলতে যায় না। কারণটা নিরাপত্তা। শেষবার শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দল পাকিস্থান সফরে গিয়ে মুখোমুখি হয়েছিল ভ’য়াবহ অভিজ্ঞতার। এর সঙ্গে বল টেম্পারিং থেকে শুরু করে, স্পট ফিক্সিং সব কিছুতেই পাকিস্থান অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে। পিছিয়ে শুধু মাঠের খেলায়। র‍্যাংকিং-এও তাদের অবস্থান তলানিতে। তাদের সংস্কৃতি আর আমাদের সংস্কৃতি সম্পূর্ণ আলাদা। যদি একই হতো তাহলে বায়ান্ন আসতো না, বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা আসতোনা, একাত্তরও আসতোনা।

অনেকে আবার বলেন সবকিছুতে ৭১ আনা ঠিক নয়। তাহলে ৭১ কি শুধুই ইতিহাসের পাতায় থাকবে? হ্যাঁ, হয়তো যারা পাকিস্থানিদের সমর্থন করে, তাদের কাছেই তা শুধু ইতিহাসের পাতায় থাকবে। কিন্তু আমাদের কাছে তা মৃ,ত্যুর আগে পর্যন্ত বাস্তব সত্য। ৫২, ৭১-কে আমরা আমাদের বুকে ধারণ করি, শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়।

তাই দয়া করে পাকিস্থানকে সমর্থন করার আগে একবার ভাবুন।

লেখক: ক্বারী ইকরামুল্লাহ মেহেদী
পরিচিতি: শিক্ষক ও গণমাধ্যম কর্মী
পেকুয়া, কক্সবাজার

শেয়ার করুন !
  • 442
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply