করোনা ভাইরাস: লক্ষ্মণ ও করণীয় সম্পর্কে জেনে রাখুন

0

স্বাস্থ্য বার্তা ডেস্ক:

চীনের উহান থেকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া নতুন ধরনের করোনা ভাইরাস এখন আত’ঙ্ক ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, এ ভাইরাস চীনে কেড়ে নিয়েছে অন্তত ৮০ জনের প্রাণ, নিউমোনিয়ার মত লক্ষণ নিয়ে সংক্র’মিত হয়েছে আরও ৩ হাজারের বেশি মানুষের দেহে। চীনের বাইরে করোনা ভাইরাসে সংক্র’মণের ঘটনা ধরা পড়েছে অন্তত ১২টি দেশে।

চীনের সঙ্গে যোগাযোগ বেশি থাকায় বাংলাদেশও নতুন এই ভাইরাসের ঝুঁ’কির মধ্যে রয়েছে। সংক্র’মণ ঠেকাতে বাংলাদেশেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

করোনা ভাইরাস কী?

করোনা ভাইরাস পরিবারের এই নতুন সদস্যকে বলা হচ্ছে ‘নভেল’ করোনা ভাইরাস। সংক্ষেপে ২০১৯-এনসিওভি।

১৯৬০-এর দশকে মুরগির ব্রঙ্কাইটিসের কারণ খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মত করোনা ভাইরাসের সঙ্গে পরিচিত হন। এরপর বহু ধরনের করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ৬টি (এখন হল ৭টি) মানুষের দেহে সংক্র’মিত হতে পারে।

২০০২ সালে সার্স (পুরো নাম সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামে যে ভাইরাসের সংক্র’মণে পৃথিবীতে ৭৭৪ জনের মৃ’ত্যু হয়েছিল সেটিও এক ধরনের করোনা ভাইরাস। সে সময় ওই ভাইরাসে আক্রা’ন্ত হয়েছিল ৮ হাজারের বেশি মানুষ।

এরপর ২০১২ সালে আসে মার্স (মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) করোনা ভাইরাস, যে রোগে আক্রা’ন্ত ২ হাজার ৪৯৪ জনের মধ্যে ৮৫৮ জনের মৃ’ত্যু হয়।

এ পরিবারের নতুন সদস্য ‘নভেল’ করোনা ভাইরাসের মানবদেহে সংক্র’মণের বিষয়টি প্রথম শনাক্ত করা হয় ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরে চীনের উহান শহরে। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এ ভাইরাসটির নাম দেয় ২০১৯-এনসিওভি।

লক্ষণ কী?

শুরুটা হয় জ্বর দিয়ে, সঙ্গে থাকতে পারে সর্দি, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও শরীর ব্যথা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেখা দিতে পারে শ্বাসক’ষ্ট। সাধারণ ফ্লুর মতই হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়াতে পারে এ রোগের ভাইরাস।

করোনা ভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রে সংক্র’মণ ঘটায়। লক্ষণগুলো হয় অনেকটা নিউমোনিয়ার মত। কারও ক্ষেত্রে ডায়রিয়াও দেখা দিতে পারে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হলে এ রোগ কিছুদিন পর এমনিতেই সেরে যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসের পুরোনো রোগীদের ক্ষেত্রে মা’রাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। এটি মোড় নিতে পারে নিউমোনিয়া, রেসপিরেটরি ফেইলিউর বা কিডনি অ-কার্যকারিতার দিকে। পরিণতিতে ঘটতে পারে মৃ’ত্যু।

চীনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের দেহে ভাইরাস সংক্র’মণের পর লক্ষণ দেখা দিতে পারে এক থেকে ১৪ দিনের মধ্যে। কিন্তু লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই এ ভাইরাস ছড়াতে পারে মানুষ থেকে মানুষে। আর এ কারণেই চীনে এ রোগের সংক্র’মণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

উৎস কী?

মধ্য চীনের উহান শহরে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর করোনা ভাইরাসের প্রথম সংক্র’মণ শনাক্ত করা হয়। নিউমোনিয়ার মত লক্ষণ নিয়ে নতুন এ রোগ ছড়াতে দেখে চীনা কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃ’ত্যু হয়।

বিবিসি লিখেছে, ঠিক কীভাবে করোনা ভাইরাস সংক্র’মণ শুরু হয়েছিল- সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাদের ধারণা, মানুষের দেহে এ রোগ এসেছে কোনো প্রাণী থেকে। তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে।

করোনা ভাইরাসের সাথে উহান শহরে একটি সি ফুড মার্কেটের যোগাযোগ পাওয়া যায়। কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন- বেলুগা জাতীয় তিমি করোনা ভাইরাসের বাহক হতে পারে। তবে ওই বাজারে মুরগি, বাদুড়, খরগোশ, সাপসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী পাওয়া যায়, যেগুলোর মাধ্যমে করোনা ভাইরাস মানুষের দেহে আসতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, হর্স শ্যু প্রজাতির বাদুড়ের মধ্যে পাওয়া যায় এরকম একটি করোনা ভাইরাসের সঙ্গে এই নভেল করোনা ভাইরাসের মিল পাওয়া যায়। তবে উহানের ওই বাজারে জ্যান্ত মুরগি, বাদুড়, খরগোশ, এবং সাপ বিক্রি হতো। হয়তো এগুলোর কোন একটি থেকে এই নতুন ভাইরাস এসে থাকতে পারে।

সার্স ভাইরাস প্রথমে বাদুড় এবং পরে ভোঁদড়ের মাধ্যমে মানুষের দেহে ছড়িয়েছিল। আর মার্স ছড়িয়েছিল উট থেকে।

প্রতিকার কী

নভেল করোনা ভাইরাসের কোনো টিকা বা ভ্যাক্সিন এখনো তৈরি হয়নি। ফলে এমন কোনো চিকিৎসা এখনও মানুষের জানা নেই, যা এ রোগ ঠেকাতে পারে।

ভাইরাসটির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হল, যারা ইতোমধ্যেই আক্রা’ন্ত হয়েছেন বা এ ভাইরাস বহন করছেন- তাদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্যাব্রিয়েল লিউং বলছেন, বার বার হাত ধুলে, হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করলে এবং ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরলে ভাইরাসের সংক্র’মণ এড়ানো সহজ হতে পারে।

পাশাপাশি কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা, মাংস ও ডিম ভালোভাবে ধুয়ে এমনভাবে রান্না করে (যাতে কোনোভাবে কাঁচা না থাকে) খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

আর যাদের মধ্যে ইতোমধ্যে সংক্র’মণ ঘটেছে, তাদেরও মাস্ক ব্যবহার করা উচিৎ, যাতে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস না ছড়াতে পারে।

আক্রা’ন্ত হলে জ্বর ও ব্যথানা’শক ও’ষুধ সেবন করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে প্রচুর তরল পানের পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।

কারও মধ্যে কাশি, হাঁচির সঙ্গে শ্বাসক’ষ্টের লক্ষণ দেখা গেলে তার সংস্পর্শে আশার ক্ষেত্রেও সাবধান থাকতে বলছেন চিকিৎসকরা। উহান শহরে করোনা ভাইরাস আক্রা’ন্ত রোগীদের সংস্পর্শে এসে বেশ কয়েকজন চিকিৎসাকর্মীও আক্রা’ন্ত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগ করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনতা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দিচ্ছে।

>> এ ধরনের ভাইরাস যানবাহনের হাতল, দরজার নব, টেলিফোন রিসিভার ইত্যাদি সাধারণ বস্তু থেকেও ছড়াতে পারে। তাই বাইরে থেকে এসে অবশ্যই সাবান পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে৷ যারা হাসপাতাল বা ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন, তারা হাত পরিষ্কার করতে অ্যালকোহল স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারেন।

>> যেখানে-সেখানে প্রকাশ্যে থুতু-কফ ফেলা বন্ধ করার বিষয়ে সচেতনতা দরকার। হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় টিস্যু ব্যবহার করতে হবে, যা অবশ্যই একবার ব্যবহারের পরই ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে।

>> হাত দিয়ে নাক মুখ চোখ স্পর্শ যত কম করা যায়, ততই ভালো।

>> বিদেশ থেকে আসা কোনো ব্যক্তি কাশি-জ্বরে আক্রা’ন্ত হলে অন্তত ১৪ দিন তাকে বাড়িতে একটি আলাদা ঘরে রাখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

কত দেশে ছড়িয়েছে?

চীনের বাইরে এ পর্যন্ত ১২টি দেশে নভেল করোনা ভাইরাস ছড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

নেপাল, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, নেপাল, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় করোনা ভাইরাসে আক্রা’ন্ত ৪১ ব্যক্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে চীনের বাইরে এ রোগে মৃ’ত্যুর কোনো তথ্য এখনও আসেনি।

এ ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষের শহর উহান এবং আশপাশের কয়েকটি শহর কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে গণপরিবহন।

বেইজিংয়ে সব বড় উৎসব ও মন্দিরের মধ্যে মেলা নি’ষিদ্ধ করা হয়েছে, কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে ট্র্যাভেল এজেন্সিগুলোর ট্যুর আয়োজনের ওপর। শনিবার থেকে বন্ধ রাখা হয়েছে সাংহাইয়ের ডিজনিল্যান্ড। আর রোববার থেকে চীনে সব ধরনের বন্যপ্রাণী বিক্রি নি’ষিদ্ধ করা হয়েছে।

কী করছে বাংলাদেশ

চীনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া নতুন ধরনের করোনা ভাইরাস সংক্র’মণ ঠেকাতে বাংলাদেশেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে এখনও কেউ শনাক্ত না হলেও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রতিরো’ধমূলক ব্যবস্থা নিতে বলেছে বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার ব্যবহার করে দেখা হচ্ছে, যাত্রীদের কারণ শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কি না।

>> কোনো যাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি পাওয়া গেলে তাকে প্রথমে বিমানবন্দরের পর্যবেক্ষণ কক্ষে রাখা হবে। পরে তাকে প্রয়োজনে কুর্মিটোলা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা তার শারীরিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহে রাখবেন।

>> যারা চীন থেকে আসবে, স্বাস্থ্য সংক্রা’ন্ত তথ্যের একটি হেলথ কার্ড পূরণ করতে হবে। ঢাকায় আসার পর সেটি বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য ডেস্কে জমা দিতে হবে। তাদের বলা হচ্ছে, আসার সময় জ্বর না থাকলেও চীন থেকে আসার ১৪ দিনের মধ্যে যদি জ্বর হয়, তাহলে যেন তারা যোগাযোগ করেন।

>> ভাইরাসটির বিভিন্ন লক্ষণ সম্পর্কেও বিমানবন্দরে তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষণ।

রোববার পর্যন্ত বিমানবন্দরে ২ হাজার ১৯০ জনকে পরীক্ষা করা হলেও কারও শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সোমবার বলেন, বাংলাদেশে এখনও এ ভাইরাসে আক্রা’ন্ত কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নজরদারি বাড়িয়েছে। আমরা নিবিড়ভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা সতর্ক আছি এবং আমরা প্রস্তুতও আছি।

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার মনে করছেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁ’কি তুলনামূলকভাবে বেশি।

আমাদের দেশ জনবহুল। এছাড়া মানুষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে কম, রাস্তাঘাটে থুতু-কফ ফেলে। তাছাড়া বাংলাদেশে তাপমাত্রা-বাতাসের আর্দ্রতাও ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির জন্য উপযোগী।

© বিডিনিউজ

শেয়ার করুন !
  • 803
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply