পদ্মাসেতু প্রকল্পে কর্মরত চীনা কর্মীদের দেশে যাতায়াতে বাধা

0

সময় এখন ডেস্ক:

করোনা ভাইরাসের কারণে পদ্মাসেতু প্রকল্পে কর্মরত চীনা কর্মীদের মধ্যে যারা ছুটি কাটাতে দেশে গেছেন, আপাতত তাদের বাংলাদেশে যাতায়াতে নিষে’ধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া যারা প্রকল্প এলাকায় রয়েছেন তাদের কেউ যেন চীনে যেতে না পারেন সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৮ জানুয়ারি) পদ্মাসেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক দেওয়ান আবদুল কাদের এ খবর নিশ্চিত করেছেন।

দেওয়ান আবদুল কাদের বলেন, করোনা ভাইরাস নিয়ে আত’ঙ্কিত নই। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে চীনা কর্মীদের দেশে যাওয়া আসায় নিষে’ধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। আমরা খুব সতর্ক অবস্থায় আছি, যেন কোনো ঝামেলা না হয়।

পদ্মাসেতু প্রকল্পে অনেক চীনা প্রকৌশলী ও কর্মী রয়েছেন। তবে দেশি-বিদেশি কোনো কর্মী এখনও করোনা ভাইরাসে আক্রা’ন্ত হননি বলে নিশ্চিত করেছেন প্রকল্পের সিনিয়র অক্যুপেশনাল অ্যান্ড হেলথ স্পেশালিস্ট মাহমুদ হোসেন ফারুক।

তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসে পদ্মাসেতু প্রকল্পের কোনো কর্মী এখনও আক্রা’ন্ত হননি। তবে এই ভাইরাসের যেহেতু কোনো ভ্যাক্সিন নেই, তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যেগুলো নিতে হয় সেগুলো নেওয়া হচ্ছে। যেমন− স্টাফদের নিয়ে পর্যায়ক্রমে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও হাইজিন ব্যবস্থা ও মাস্ক পরিধান করা, সময়ে সময়ে আইইডিসিআর (ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ) এর সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। তারাও (আইইডিসিআর) বিষয়গুলো মনিটর করছে।

এ সময় তিনি আরও বলেন, চীনা কর্মকর্তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আলাদা। যারা তাদের সার্ভ করেন তারা যেন সব সময় সেফটি ড্রেস (মাস্ক ও গ্লাভস) পরে থাকেন, সেগুলোতে জোর দেওয়া হচ্ছে।

চীনা কর্মীদের জন্য আলাদা ক্যাম্প রয়েছে। তারা যেন অন্যদের সঙ্গে অতিরিক্ত মেলামেশা না করেন, সে বিষয়গুলো দেখা হচ্ছে বলে জানান মাহমুদ হোসেন ফারুক।

করোনা ভাইরাসের লক্ষণ ও প্রতিকার:

লক্ষণ কী?

শুরুটা হয় জ্বর দিয়ে, সঙ্গে থাকতে পারে সর্দি, শুকনো কাশি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা ও শরীর ব্যথা। সপ্তাহখানেকের মধ্যে দেখা দিতে পারে শ্বাসক’ষ্ট। সাধারণ ফ্লুর মতই হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়াতে পারে এ রোগের ভাইরাস।

করোনা ভাইরাস মূলত শ্বাসতন্ত্রে সংক্র’মণ ঘটায়। লক্ষণগুলো হয় অনেকটা নিউমোনিয়ার মত। কারও ক্ষেত্রে ডায়রিয়াও দেখা দিতে পারে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো হলে এ রোগ কিছুদিন পর এমনিতেই সেরে যেতে পারে। তবে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদযন্ত্র বা ফুসফুসের পুরোনো রোগীদের ক্ষেত্রে মা’রাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। এটি মোড় নিতে পারে নিউমোনিয়া, রেসপিরেটরি ফেইলিউর বা কিডনি অ-কার্যকারিতার দিকে। পরিণতিতে ঘটতে পারে মৃ’ত্যু।

চীনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের দেহে ভাইরাস সংক্র’মণের পর লক্ষণ দেখা দিতে পারে এক থেকে ১৪ দিনের মধ্যে। কিন্তু লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই এ ভাইরাস ছড়াতে পারে মানুষ থেকে মানুষে। আর এ কারণেই চীনে এ রোগের সংক্র’মণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রতিকার কী

নভেল করোনা ভাইরাসের কোনো টিকা বা ভ্যাক্সিন এখনো তৈরি হয়নি। ফলে এমন কোনো চিকিৎসা এখনও মানুষের জানা নেই, যা এ রোগ ঠেকাতে পারে।

ভাইরাসটির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায় হল, যারা ইতোমধ্যেই আক্রা’ন্ত হয়েছেন বা এ ভাইরাস বহন করছেন- তাদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা।

হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্যাব্রিয়েল লিউং বলছেন, বার বার হাত ধুলে, হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করলে এবং ঘরের বাইরে গেলে মাস্ক পরলে ভাইরাসের সংক্র’মণ এড়ানো সহজ হতে পারে।

পাশাপাশি কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ও নাক ঢেকে রাখা, মাংস ও ডিম ভালোভাবে ধুয়ে এমনভাবে রান্না করে (যাতে কোনোভাবে কাঁচা না থাকে) খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

আর যাদের মধ্যে ইতোমধ্যে সংক্র’মণ ঘটেছে, তাদেরও মাস্ক ব্যবহার করা উচিৎ, যাতে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস না ছড়াতে পারে।

আক্রা’ন্ত হলে জ্বর ও ব্যথানা’শক ও’ষুধ সেবন করা যেতে পারে। সেই সঙ্গে প্রচুর তরল পানের পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।

কারও মধ্যে কাশি, হাঁচির সঙ্গে শ্বাসক’ষ্টের লক্ষণ দেখা গেলে তার সংস্পর্শে আশার ক্ষেত্রেও সাবধান থাকতে বলছেন চিকিৎসকরা। উহান শহরে করোনা ভাইরাস আক্রা’ন্ত রোগীদের সংস্পর্শে এসে বেশ কয়েকজন চিকিৎসাকর্মীও আক্রা’ন্ত হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগ করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনতা ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দিচ্ছে।

>> এ ধরনের ভাইরাস যানবাহনের হাতল, দরজার নব, টেলিফোন রিসিভার ইত্যাদি সাধারণ বস্তু থেকেও ছড়াতে পারে। তাই বাইরে থেকে এসে অবশ্যই সাবান পানি দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে৷ যারা হাসপাতাল বা ল্যাবরেটরিতে কাজ করেন, তারা হাত পরিষ্কার করতে অ্যালকোহল স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে পারেন।

>> যেখানে-সেখানে প্রকাশ্যে থুতু-কফ ফেলা বন্ধ করার বিষয়ে সচেতনতা দরকার। হাঁচি-কাশি দেওয়ার সময় টিস্যু ব্যবহার করতে হবে, যা অবশ্যই একবার ব্যবহারের পরই ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হবে।

>> হাত দিয়ে নাক মুখ চোখ স্পর্শ যত কম করা যায়, ততই ভালো।

>> বিদেশ থেকে আসা কোনো ব্যক্তি কাশি-জ্বরে আক্রা’ন্ত হলে অন্তত ১৪ দিন তাকে বাড়িতে একটি আলাদা ঘরে রাখতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

কী করছে বাংলাদেশ

চীনে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া নতুন ধরনের করোনা ভাইরাস সংক্র’মণ ঠেকাতে বাংলাদেশেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে এখনও কেউ শনাক্ত না হলেও বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রতিরো’ধমূলক ব্যবস্থা নিতে বলেছে বাংলাদেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার ব্যবহার করে দেখা হচ্ছে, যাত্রীদের কারণ শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি কি না।

>> কোনো যাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি পাওয়া গেলে তাকে প্রথমে বিমানবন্দরের পর্যবেক্ষণ কক্ষে রাখা হবে। পরে তাকে প্রয়োজনে কুর্মিটোলা হাসপাতালে স্থানান্তর করা হবে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা তার শারীরিক অবস্থার তথ্য সংগ্রহে রাখবেন।

>> যারা চীন থেকে আসবে, স্বাস্থ্য সংক্রা’ন্ত তথ্যের একটি হেলথ কার্ড পূরণ করতে হবে। ঢাকায় আসার পর সেটি বিমানবন্দরের স্বাস্থ্য ডেস্কে জমা দিতে হবে। তাদের বলা হচ্ছে, আসার সময় জ্বর না থাকলেও চীন থেকে আসার ১৪ দিনের মধ্যে যদি জ্বর হয়, তাহলে যেন তারা যোগাযোগ করেন।

>> ভাইরাসটির বিভিন্ন লক্ষণ সম্পর্কেও বিমানবন্দরে তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া হয়েছে প্রশিক্ষণ।

রোববার পর্যন্ত বিমানবন্দরে ২ হাজার ১৯০ জনকে পরীক্ষা করা হলেও কারও শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা সোমবার বলেন, বাংলাদেশে এখনও এ ভাইরাসে আক্রা’ন্ত কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নজরদারি বাড়িয়েছে। আমরা নিবিড়ভাবে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা সতর্ক আছি এবং আমরা প্রস্তুতও আছি।

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার মনে করছেন, বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশের কারণে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁ’কি তুলনামূলকভাবে বেশি।

আমাদের দেশ জনবহুল। এছাড়া মানুষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে কম, রাস্তাঘাটে থুতু-কফ ফেলে। তাছাড়া বাংলাদেশে তাপমাত্রা-বাতাসের আর্দ্রতাও ভাইরাসের বংশবৃদ্ধির জন্য উপযোগী।

শেয়ার করুন !
  • 101
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply