যেভাবে ঘুষ না পেয়ে হাসপাতাল মালিককে ফাঁ’সালো সিভিল সার্জনের অনুগতরা (ভিডিও)

0

নোয়াখালী প্রতিনিধি:

ঘুষ না পেয়ে এক বেসরকারি হাসপাতাল মালিককে ফাঁ’সিয়েছেন নোয়াখালী সিভিল সার্জন ডা. মমিনুর রহমান এর নির্দেশে তারই অনুগত লোকজন। যার অডিও ক্লিপ এবং ভিডিও ফুটেজ অনলাইনে ভাইরাল হয়ে গেছে।

সিভিল সার্জনের ব্যক্তিগত সহকারী কর্তৃক হাসপাতাল মালিকের কাছে ১২ লাখ টাকা ঘুষ দাবির ভয়েস রেকর্ডিং এবং পকেট থেকে মেয়াদো’ত্তীর্ণ রিএজেন্ট বের করে ফ্রিজে রাখার সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

গত বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার ৬টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিককে সিলগালা করেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. মমিনুর রহমান। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ঘুষ না দেয়ায় এ কাজ করেছেন তিনি। এমন কর্মকাণ্ডের প্র’তিবাদ করায় মনোয়ারা প্রাইভেট জেনারেল হাসপাতাল এন্ড ডক্টরস পয়েন্ট- এর মালিককে ফাঁ’সিয়ে আটক করিয়েছেন।

হাসপাতাল সিলগালা করার পর পরই হাসপাতালের সত্ত্বাধিকারী একেএম শাহরিয়ার ফয়সাল সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তিনি জানান, গত ১২ ফেব্রুয়ারি, বুধবার সিভিল সার্জনের পিএস খায়রুল আনাম সবুজ ও তার কার্যালয়ের ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী আবু তাহেরের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকার ঘুষ দাবি করেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে। কেন ঘুষ দিতে হবে, এ প্রশ্নের জবাবে সবুজ জানান- টাকা দিলে হাসপাতালে ডাক্তার নার্সও লাগবে না, রোগী মে’রে ফেললেও নির্বি’ঘ্নে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সুযোগ করে দেয়া হবে, ডকুমেন্টও লাগবে না। সব দায় দায়িত্ব তিনি নেবেন। কিন্তু ঘুষ দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন শাহরিয়ার ফয়সাল। [এই কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সংবাদের সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে নিচে]।


ছবি: হাসপাতাল মালিকের স্ত্রী কর্তৃক জেলা প্রশাসক বরাবর তথ্য-প্রমাণসহ সিভিল সার্জনের বিরু’দ্ধে অভিযোগ


ছবি: হাসপাতাল মালিকের স্ত্রী কর্তৃক জেলা প্রশাসক বরাবর তথ্য-প্রমাণসহ সিভিল সার্জনের বিরু’দ্ধে অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, সবুজ ঘুষের টাকা না পেয়ে যান। সেদিনই (বুধবার) বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে মনোয়ারা হাসপাতালে আসেন সিভিল সার্জনের লোকজন। স্টাফ ও নার্সদের বের করে দেন এবং নারী স্টাফদের সাথে অ’সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ সময় ও’ষুধ কর্মকর্তা হাসপাতালের ফ্রিজ খুলে পকেট থেকে কিছু একটা (মেয়াদো’ত্তীর্ণ রিএজেন্ট) রেখে দিয়ে হাসপাতাল মালিককে ফাঁ’সিয়ে দেন। এই রিএজেন্ট হাসপাতালের ও’ষুধ রেজিষ্টারে পর্যন্ত নেই! যা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। [ভিডিও ফুটেজটিও সংযুক্ত হলো সংবাদের নিচে]।

এদিকে ডা. মমিনুর রহমানের এমন কান্ডের পর চিকিৎসক সমাজ ক্ষু’ব্ধ প্র’তিক্রিয়া জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে দেশের চিকিৎসা খাতের অ’নিয়ম অ’ব্যবস্থাপনা নিয়ে সোচ্চার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভাইরোলজি বিভাগের সহ. অধ্যাপক ডা. জাহিদুর রহমান লিখেছেন-

বাংলাদেশের অধিকাংশ সিভিল সার্জন কার্যালয়ের দুর্নীতির সিংহভাগ আসে লাইসেন্সবিহীন, নিম্নমানের ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে। এটা ওপেন সিক্রেট। দুএকটি ব্যতিক্রম ছাড়া সিভিল সার্জন থেকে শুরু করে ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী পর্যন্ত এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের অংশ। মাঝে মাঝে বনিবনা না হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়, কিছু জরি’মানা হয়, কয়েকদিনের জন্য সিলগালা হয়। কিছুদিন পর আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। সারা দেশের হাজার হাজার ভুয়া ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার এভাবেই চলছে, বছরের পর বছর।

ইদানিং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই বিষয়ে কিছুটা নড়েচড়ে বসায় সিভিল সার্জনের সাথে ভুয়া ক্লিনিক মালিকের এই গভীর প্রেম কিছুটা বিঘ্নি’ত হচ্ছে। এরই মধ্যে অপ’চিকিৎসার তালিকায় উপরের দিকে থাকা নোয়াখালি সিভিল সার্জন কার্যালয় দুর্নীতিতে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে। এতদিন দেখে এসেছি, কাউকে মিথ্যা মামলায় ফাঁ’সিয়ে দিতে পুলিশ তার পকেটে গাঁ’জা বা ইয়া-বা ঢুকিয়ে দেয়। আজকে দেখলাম এক ক্লিনিক মালিক ঘুষ দিতে রাজি না হওয়ায় সিভিল সার্জন অফিসের লোকজন কীভাবে নিজেরাই ক্লিনিকের ফ্রিজে মেয়া’দোত্তীর্ণ রিয়েজেন্ট রেখে ক্লিনিক মালিককে মিথ্যা মামলায় ফাঁ’সিয়ে দেয়।

নোয়াখালীর সিভিল সার্জন অফিসের হর্তাকর্তাদের লম্বা স্যালুট। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং যেখানে দুর্নীতির বিরু’দ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা দিয়েছেন, বাঘা বাঘা দুর্নীতিবাজরা আজকে যেখানে কোণঠাসা, সেখানে আপনারা যে অভিনব পন্থায় দুর্নীতি করে দেখাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। তবে এরপর কোন ক্লিনিকে এরকম নাটক মঞ্চস্থ করার আগে দয়া করে সিসিটিভির সুইচটা অফ করে নিয়েন। আমাদের হার্ট দুর্বল, তাই একটু বেশি লজ্জা লাগে।

শুধু নোয়াখালী কেন? বাংলাদেশের সবগুলো অ’বৈধ ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা করে দেয়া হোক। দুর্নীতিবাজ প্রত্যেক সিভিল সার্জনের বিরু’দ্ধে শা’স্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হোক। সবার আগে ভিডিওসহ সমস্ত ডকুমেন্ট আমলে নিয়ে “মেয়াদো’ত্তীর্ণ ওষুধ রাখার” মিথ্যা, সাজানো মামলায় গ্রেপ্তারকৃত নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার “মনোয়ারা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড নার্সিং হোম” এর স্বত্বাধিকারী একেএম শাহরিয়ার ফয়সালকে মুক্তি দেয়া হোক। তার নামে মিথ্যা মামলা প্র’ত্যাহার করা হোক। তারপর এই মামলার বাদী নোয়াখালীর সিভিল সার্জনের বিরু’দ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হোক।

প্রতি মাসে মোটা অংকের ঘুষের বিনিময়ে শত শত ভুয়া ক্লিনিক চালু রাখবেন, আর কোন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ ঘুষ দিতে রাজি না হলেই তাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁ’সিয়ে দিবেন! এটা কি মগের মুল্লুক? ফয়সালের ক্লিনিক নিয়ে যদি এতই অভিযোগ থাকে, তাহলে কেন তাকে গ্রেপ্তার করতে এত কষ্ট করে নাটক সাজাতে হল? আমাদের অবস্থান কোন একজন অ’বৈধ ক্লিনিক/ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিকের পক্ষে না। আমাদের অবস্থান একজন মিথ্যা, সাজানো মামলায় গ্রেপ্তারকৃত মানুষের পক্ষে। আপনার অবস্থান কোন পক্ষে, জনাব?

এদিকে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করলে নোয়াখালী সির্ভিল সার্জন ডা. মমিনুর রহমান জানান, সিলগাল ও বন্ধ ঘোষণা করা হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর কোন বৈধ কাজপত্র ছিল না। কাগজপত্র ছাড়া কোন হাসপাতাল চলতে দেওয়া হবে না। ঘুষের টাকার অভিযোগকে তিনি অ’বান্তর বলে দাবী করেন।

এ ঘটনায় বিক্ষু’ব্ধ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় লোকজন। তারা জানান, মনোয়ারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক জনপ্রিয় একটি হাসপাতাল। কারন এখানে সিজার করার চাইতে নরমাল ডেলিভারীতে উৎসাহ দেয়া হয় প্রসূতিদের। যার ফলে নামমাত্র সেবা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে দিন দিন। এতে কিছু প্রভাবশালী হাসপাতাল ক্ষ’তিগ্রস্থ হচ্ছে।

(উপরে মিথ্যা মামলায় কারাব’ন্দী মনোয়ারা হাসপাতালের মালিক শাহরিয়ার ফয়সাল এর স্ত্রী নোয়াখালী জেলা প্রশাসক বরাবর যে লিখিত অভিযোগ করেছেন, তা যুক্ত করা হয়েছে। আর নিচে ঘুষ দাবির কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ডিং এবং তার নিচে সিসিটিভি ফুটেজ সংযুক্ত করা হলো।)

সিভিল সার্জনে ব্যক্তিগত সহকারী খায়রুল আনাম সবুজ কর্তৃক ঘুষ দাবি করার কথোপকথন:

ফ্রিজে মেয়াদো’ত্তীর্ণ রিএজেন্ট রাখার ভিডিও ফুটেজ:

শেয়ার করুন !
  • 617
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!