হিন্দু বৃদ্ধাকে কোলে নিয়ে তীর্থ ঘোরালেন মুসলিম পুলিশ কনস্টেবল আফতাব

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

‘আমরা আদিনাথ মন্দির এলাকায় নিরপত্তার ডিউটি করছিলাম। আদিনাথ মন্দিরের নিচে বসেছে শতাধিক দোকান-পাটের মেলা যেখানে মানুষে গিজগিজ করছিল। আর মন্দিরে উঠতে পার হতে হয় শতাধিক সিঁড়ি। নিরপাত্তার স্বার্থে সিঁড়ির মাঝখান খালি রেখে দু’পাশ দিয়ে পূণ্যার্থীদের ওঠার ব্যবস্থা করা হয়। সেভাবেই সময় মতো পূজা দিতে যে যার মতো ব্যস্ত।

সে ব্যস্ততায় দেখলাম লাইনে দাঁড়াতে অ’ক্ষম এক বৃদ্ধা সিঁড়ির একপাশে বসে কাতর স্বরে সবার কাছে আকুতি রেখে চলছে, তাকে যেনো মূল মন্দিরে পৌঁছাতে সহযোগিতা করা হয়। কিন্তু কেউ বিষয়টি গ্রাহ্য করছে না। নতুন কাপড়ে কঙ্কালসার দেহের নারীটিকে দেখে আমার মায়ের কথা মনে পড়ে যায়। নিজের অজান্তেই তাকে কোলে তুলে নিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। মূল মন্দিরের সামনে তার পছন্দমতো জায়গায় বসালাম। পূজা ও প্রার্থনা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে আবার সেই জায়গায় এনে নামিয়ে দিলাম।’

কথাগুলো বলছিলেন মহেশখালী থানার পুলিশ কনস্টেবল আফতাব উদ্দিন। আফতাব এক বৃদ্ধাকে কোলে তুলে বেয়ে উঠছেন কক্সবাজারের মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরের শতাধিক সিঁড়ি। আর তা অবলোকন করছেন সিঁড়ির দু’পাশে দাঁড়ানো পূণ্যার্থী ও দর্শনার্থীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে এমন একটি ছবি।

এর ফলে নানা সময়ে পুলিশের কাজের সমালোচনা করা অনেকেই তার মানবিকতার প্রশংসা করেছেন। বিশেষ করে একজন মুসলিম পুলিশ সদস্য হয়ে সনাতনী বৃদ্ধাকে কোলে তুলে বেয়ে উঠছেন আদিনাথ মন্দিরের শতাধিক সিঁড়ি।

জানা যায়, কক্সবাজারের মহেশখালীর আদিনাথ মন্দিরে চলছিল শিব চতুর্দশী পূজা। ভিড় ঠেলে সিঁড়ি বেয়ে সবাই উঠছেন পূজা দিতে। কিন্তু সিঁড়ির নিচে অসহায় আকুতি করে যাচ্ছেন এক বৃদ্ধা। খুব করে চাইছেন কোনোভাবে মন্দিরে গিয়ে পূজা দেবেন তিনি। কিন্তু এমন ভিড়ে কার কথা কে শোনে। শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এলেন মহেশখালী থানার কনস্টেবল আফতাব উদ্দিন। বৃদ্ধাকে কোলে করে সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরে তুলে দিলেন। বৃদ্ধাকে মন্দিরের একেবারে জিরো পয়েন্টে এনে পূজা ও মনভরে প্রার্থনা করবার সুযোগ করে দিয়ে পুনরায় কোলে নিয়ে আগের জায়গায় নামিয়ে দেন পুলিশ কনস্টেবল আফতাব উদ্দিন।

শিব চতুর্দশী পূজা উপলক্ষ করে সপ্তাহব্যাপী চলে ঐতিহ্যবাহী আদিনাথ মেলা। মহেশখালী থানার কনস্টেবল আফতাব উদ্দিনের (নং-৫২৯) এ মানবিক ঘটনা স্থাপন করেছে সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

এ ঘটনার মর্মোদ্ধার করতে গিয়ে জানা গেছে এক অভিনব কাহিনী। যা ধর্মের চেয়ে মানবিকতাকে উঁচুতে তুলেছে। কোলে থাকা বৃদ্ধার হাতের কারণে পুলিশ সদস্যের নেমপ্লেটটি দেখা যাচ্ছিল না। তাই অনেকে মনে করেছিলেন সনাতনী যুবকটি তার বয়োবৃদ্ধ আত্মীয়াকে জীবনের শেষ বয়সে শিবপূজা দিতে সহযোগিতা করছেন। কিন্তু যখন জানা গেল পুলিশ সদস্যটি মুসলমান তখন চারদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়।

এটা কীভাবে হলো? কেন একজন মুসলমান সনাতনী এক বৃদ্ধাকে এভাবে পূজা করতে সহযোগিতা করলেন? এ রকম নানা ধরনের আলোচনা। এতে পুলিশের ভালো-মন্দ নিয়ে নানাজন নানা অভিজ্ঞতার কথা বলে আলোচনাটি সরব রেখেছে।

আপনি মুসলিম হয়ে একজন সনাতনী নারীকে পূজা করতে সহযোগিতা করলেন এতে কোনো সং’কোচ কাজ করেছে কি না- জানতে চাইলে আফতাব বলেন, যখন বৃদ্ধাকে কোলে নিলাম তখন আমার মাথায় ধর্মানুভূতি কাজ করেনি। মনে হচ্ছিল আমি আমার মাকে তার আবদার পূরণে সহযোগিতা করছি। কোলে মানুষ নিয়ে শতাধিক সিঁড়ি ওঠা কষ্টকর; তাই চারপাশে তাকানো হয়নি আমার। কে কী করছে, কে ছবি তুলছে এসব খেয়ালে আসেনি।

আফতাব উদ্দিন আরও বলেন, যখন তাকে পূর্বের জায়গায় নিরাপদে পৌঁছাতে পারলাম তখন নিজেকে বেশ প্রফুল্ল মনে হচ্ছিল। তখন দেখি ওই বৃদ্ধা নির্দিষ্ট লগ্নের ভেতর পূজা দিতে পেরে নানা ধরণের আশীর্বাদ করছে। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিরাপত্তার কাজে লেগে যাওয়ায় বৃদ্ধার পরিচয়ও জানা হয়নি। বৃদ্ধা নারী তার জন্য অনেক আশীর্বাদ করেছেন, এটিই তার বড়ো পাওনা বলে জানান এ পুলিশ সদস্য।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিবিয়ষক সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাপস রক্ষিত বলেন, কিছু ঘটনা এমনই হয়। যা দিয়ে প্রমাণ পাওয়া যায় আমরা অ’সাম্প্র’দায়িক দেশের অধিবাসী। পুলিশ সদস্য আফতাবের ঘটনাটি ধর্মকে ছাপিয়ে মানবিকতার জয়গান এনে দিয়েছে। আমরা এমনই বাংলাদেশ অ’ব্যাহত থাকুক কামনা করি। মানবিক মানুষ হিসেবে আফতাবকে আমরা স্যালুট জানাচ্ছি।

মহেশখালী থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ বলেন, সবার নিরাপত্তায় কাজ করতে গিয়ে পরিবার-পরিজন থেকে পুলিশ সদস্যদের বছরের সিংহভাগ সময় দূরেই থাকতে হয়। এরপরও পান থেকে চুন খসলেই সমালোচনায় করা হয় পুলিশের। কিন্তু আফতাবদের মতো অসংখ্য ভালো কাজ পুলিশ নিত্যদিন করছে। কিছু নজরে আসে আর কিছু আড়ালে থেকে যায়। নজরে আসা আফতাবের মানবিক ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মতো আমাদেরও পুলকিত করছে।

পুলিশ কনস্টেবল আফতাব উদ্দিন মহেশখালী থানায় কর্মরত। তিনি নোয়াখালীর কবিরহাট এলাকার বেলায়েত হোসেনের ছেলে।

শেয়ার করুন !
  • 271.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!