আজ টাঙ্গাইলের গৌরব জাদুসম্রাট পি.সি সরকারের ১০৭ তম জন্মবার্ষিকী

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

পি.সি সরকার (১৯১৩-১৯৭১) জাদুশিল্পী। পুরো নাম প্রতুলচন্দ্র সরকার। জাদুর ইতিহাসে তিনি এক কিংবদন্তি। ১৯১৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার আশেকপুর গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তার জন্ম। স্থানীয় শিবনাথ হাইস্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। বাল্যকাল থেকেই জাদুবিদ্যার প্রতি কৌতূহল এবং কিছুটা বংশগত ঐতিহ্যও তাকে এ পেশায় আগ্রহী করে তোলে।

গণপতি চক্রবর্তী ছিলেন তার জাদুবিদ্যার গুরু। সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তিনি জাদু দেখানো শুরু করেন এবং কলেজে অধ্যয়নকালে পুরোপুরি এর চর্চা শুরু করেন। তবে সাধারণ লেখাপড়া এতে বা’ধাগ্রস্ত হয়নি। ১৯২৯ সালে প্রবেশিকা এবং ১৯৩৩ সালে গণিতশাস্ত্রে অনার্সসহ বিএ পাস করে তিনি জাদুকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন।

জাদুজগতে ব্যাপক প্রচারলাভের উদ্দেশ্যে তিনি এক সময় নিজের পদবি ‘সরকার’ বাদ দিয়ে ইংরেজি ‘সরসারার’ (Sorcerer) শব্দ ব্যবহার করতে শুরু করেন, কারণ শব্দটির অর্থ ‘জাদুকর’। তবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণের পর তিনি আবার নিজের ‘সরকার’ পদবিই গ্রহণ করেন।

পি.সি সরকার শুধু জাদুশিল্পীই ছিলেন না, তিনি একজন লেখকও ছিলেন। জাদুবিদ্যা বিষয়ে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ইংরেজি, বাংলা ও হিন্দি ভাষায় প্রকাশিত তার গ্রন্থের সংখ্যা ২০টি। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: দেশে দেশে হিপনোটিজম, ম্যাজিকের কৌশল, ইন্দ্রজাল, SORCAR ON MAGIC, 100 Magic You can do, Hindoo Magic, Magic for You, More Magic for You ইত্যাদি। এছাড়া তার- ছেলেদের ম্যাজিক, সহজ ম্যাজিক, মেসমেরিজম, সম্মোহনবিদ্যা ইত্যাদি গ্রন্থও জাদুবিদ্যার উন্নয়নে উলে­খযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

জাদুশিল্পে পি.সি সরকারের কৃতিত্ব হলো তিনি বহু প্রাচীন জাদুখেলার মূল সূত্র আবিষ্কার করেন। ‘এক্স-রে আই’, ‘করাত দিয়ে মানুষ কাটা’, ‘ওয়াটার অব ইন্ডিয়া’ প্রভৃতি তার জনপ্রিয় খেলা। ১৯৩৪ সালে তিনি বিদেশ গমন করেন এবং ৭০টির মতো দেশে জাদু প্রদর্শন করে ব্যাপক খ্যাতি ও পর্যাপ্ত অর্থ উপার্জন করেন।

কলকাতার ইম্পেরিয়াল রেস্টুরেন্টে শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হককে যে জাদু দেখিয়ে তিনি মুগ্ধ করেন, তার শিরোনাম ছিল ‘বাংলার মন্ত্রিমন্ডলীর পদত্যাগ’। এ শিরোনামের একটি সাদা কাগজে প্রথমে তিনি ফজলুল হককে কিছু লিখতে বলেন এবং তার নিচে মন্ত্রিগণ স্বাক্ষর করেন। কিছুক্ষণ পর শেরে বাংলা তার নিজের লেখার পরিবর্তে দেখেন ‘আমরা সম্মতিক্রমে সকলেই এই মুহূর্তে মন্ত্রীর পদ ত্যাগ করলাম এবং আজ হতে জাদুকর পি.সি সরকারই বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।’ এটা ছিল Force writing magic-এর জাদু।

তার জাদু বিভিন্ন দূরদর্শণ যথা অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশন, বি.বি.সি, শিকাগোর ডাবলিউ.জি.এন.টি.ভি এবং নিউইয়র্কের এন.বি.সি ও সি.বি.এস টেলিভিশনে বহুবার প্রদর্শিত হয়েছে। ১৯৫৭ ও ১৯৬৭ সালে আমেরিকায় এবং ১৯৬২ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মস্কো ও লেনিনগ্রাদ শহরে জাদু প্রদর্শন করে তিনি বিপুল সুনাম অর্জন করেন। পি.সি সরকারই প্রথম রাজকীয় পোশাক এবং আকর্ষণীয় পাগড়ি পরে জাদু প্রদর্শনের প্রচলন করেন।

জাদু দেখিয়ে পি.সি সরকার দেশে-বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। সর্বশ্রেষ্ঠ স্টেজ ম্যাজিকের জন্য আমেরিকার জাদুবিদ্যার নোবেল প্রাইজ বলে খ্যাত ‘দি ফিনিক্স অ্যাওয়ার্ড’ তিনি ২ বার লাভ করেন। এছাড়া তিনি ‘গোল্ডবার’ পুরস্কার, ‘সুবর্ণ লরেল মালা’ নামে জাদুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় জার্মান পুরস্কার, হল্যান্ডের ‘ট্রিক্স পুরস্কার’ এবং ১৯৬৪ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত ‘পদ্মশ্রী’ উপাধি লাভ করেন। জাদুখেলার কৃতিত্বের জন্য মায়ানমারের (বার্মার) প্রধানমন্ত্রী থাকিন নু তার নাম দিয়েছিলেন ‘এশিয়ার গৌরব’।

পি.সি সরকার ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের স্বার্থে ১৯৩৭ সালে জাপান সফরের সব অর্থ দান করেন। তিনি ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মান, বেলজিয়াম এবং জাপানে ম্যাজিশিয়ান সমিতির অন্যতম সদস্য ছিলেন। এছাড়া তিনি আন্তর্জাতিক রোটারি ক্লাবের সদস্য এবং বিলেতের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য ছিলেন। তার নামে আমেরিকার ‘আন্তর্জাতিক জাদুকর ভ্রাতৃসংস্থার’ কলকাতা শাখার নামকরণ করা হয়। ইউরোপের বিখ্যাত লেখকরা তার ওপর বেশ কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। সেগুলির মধ্যে SORCAR: Maharaja of Magic গ্রন্থটি উলে­খযোগ্য।

পি.সি সরকার জাদুর প্রতি এতই আন্তরিক ছিলেন যে ‘জাদু’ শব্দটিকে তিনি তার বিভিন্ন বাড়ির নামকরণেও ব্যবহার করেছেন। যেমন: ‘ইন্দ্রজাল’, ‘জাদুমহল’ এবং ‘জাদুভবন’ (টাঙ্গাইলে অবস্থিত)। তার জাদুবিদ্যার ওপর রঙিন চলচ্চিত্র ও ফটোগ্রাফিক অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। তার জন্মের ৫০ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ১৯৬৩ সালে নিখিল ভারত জাদু সম্মেলন প্রকাশ করেছে ‘TW’s GM = The Great Sorcar’ নামে একটি ফটোগ্রাফিক অ্যালবাম। হিজ মাস্টারস ভয়েস বের করেছে একটি লংপে­য়িং রেকর্ড।

জাদুশিল্পে অসাধারণ পারদর্শিতার জন্য বিশ্ববাসীর কাছ থেকে তিনি ‘জাদুসম্রাট’ ও সর্বকালের ‘শ্রেষ্ঠ সম্রাট’ উপাধি লাভ করেন। তার পুত্র পি.সি সরকার জুনিয়রও একজন বিশ্বখ্যাত জাদুশিল্পী। ১৯৭১ সালের ৬ জানুয়ারি পি.সি সরকার জাপানের আশাহিকাওয়ার নিকটবর্তী জিগেৎসু শহরে অকস্মাৎ মা’রা যান।

প্রতিবেদক: টিপু চৌধুরী

শেয়ার করুন !
  • 72
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!