মন্ত্রীর ভাগ্নে পরিচয়ে চলা কিং রাসেলের কব্জায় কক্সবাজারের আন্ডারওয়ার্ল্ড

0

কক্সবাজার প্রতিনিধি:

কক্সবাজার সৈকতের পর্যটন জোনের সব ধরনের অপরাধের ‘কিং’ হিসেবে পরিচিত কাজী রাসেল আহমদ নোবেল ওরফে কিং রাসেলকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) ভোরে নারীসহ কলাতলীর সৈকতপাড়ার একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-অপারেশন) মাসুম খান।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে ছবি তুলে মন্ত্রীর ভাগ্নে পরিচয় দেন কিং রাসেল। সেই সঙ্গে পর্যটন এলাকায় নানা ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। গ্রেপ্তারের পর তাকে ছাড়িয়ে নিতে জোর তদবির চালান তার ভাই কক্সবাজার পৌরসভার ১২নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কাজী মোরশেদ আহমদ বাবুসহ তার সহযোগীরা।

গ্রেপ্তার কাজী রাসেল (৩৩) কক্সবাজার পৌরসভার কলাতলীর লাইটহাউজ এলাকার কাজী তোফায়েল আহমদের ছেলে। তিনি জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য ও কলাতলী কটেজ মালিক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার আসমাউল হুসনা মিম (২৭) ঢাকার দোহারের জয়পাড়ার আবদুল মজিদের মেয়ে।

সদর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-অপারেশন) মাসুম খান বলেন, কক্সবাজার পর্যটন এলাকার কলাতলীর হোটেল-মোটেল জোনে দীর্ঘদিন ধরে দলীয় পরিচয়ে কাজী রাসেল নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আসছেন। তার বিরু’দ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া যেত। সম্প্রতি মোরশেদ নামের এক যুবককে পি’টিয়ে গুরুতর জখম করেন রাসেল। ওই ঘটনায় তাকে এক নম্বর আসামি করে মামলা করা হয়। সোমবার ভোরে অভিযান চালিয়ে মিম নামে ঢাকার দোহারের এক নারীসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় ইয়া-বা সেবন করেছিলেন তারা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কলাতলীর সৈকত এলাকার নির্মাণাধীন ওই বাসা দখ’লের জন্য কাজী রাসেল তার সহযোগীদের নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। এ সময় রাসেল ও ছাত্রলীগের এক নেতাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সেই সঙ্গে ইয়া-বা ও অ’বৈধ অ’স্ত্র উদ্ধার করা হয়। কিন্তু তদবিরের মাধ্যমে ছাত্রলীগ নেতাকে ছেড়ে দেয়া হয়। লুকিয়ে ফেলা হয় উদ্ধার হওয়া অ’স্ত্র।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ইকবাল হোসাইন বলেন, কাজী রাসেলকে নারীসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় অ’স্ত্র কিংবা অন্য কিছু উদ্ধারের কথা জানাননি সদর মডেল থানার ওসি সৈয়দ আবু মো. শাহাজান কবির। এরপরও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। কাজী রাসেলের বিরু’দ্ধে থানায় মামলা রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের পর বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সবকিছু আমলে নিয়ে তার বিরু’দ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কলাতলী পর্যটন জোনের একাধিক ব্যবসায়ী জানান, কাজী রাসেলের অপরাধের রাজ্য বিস্তৃত। তার বড় ভাই পৌর কাউন্সিলর মোরশেদ আহমদ বাবুর ৩ শ্যালক মাসুদ, খালেদ ও মাহফুজ এবং স্থানীয় যুবক ওয়াজেদ ও মান্নানসহ ১৫-২০ জনের একটি গ্রুপ গড়ে তোলা হয়েছে। তারা ঢাকারবাড়ি, শারমিন, সবুজ, আমির ড্রিম, সি-টাউন, কমফোর্টসহ কয়েকটি কটেজে যৌ’নকর্মী, ইয়া-বা এবং বিভিন্ন মা’দক সরবরাহ করেন। কলাতলী সড়কের পূর্বপাশের প্রতিটি গেস্ট হাউজ এবং ফ্ল্যাট থেকে রাসেলের হয়ে চাঁদা তোলেন মান্নান। এভাবে প্রতিদিন প্রায় ৪-৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলেন রাসেল। সে হিসাবে মাসে তার চাঁদার টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় দেড় কোটি টাকা।

স্থানীয়রা জানায়, পর্যটন এলাকায় নির্মাণাধীন অনেক ব্যক্তির অ্যাপার্টমেন্ট, ভবন, হোটেলের কক্ষ ও ফ্ল্যাট দখ’ল করে ভাড়া দেন রাসেল ও তার সহযোগীরা। কলাতলী সড়কের পশ্চিম পাশে সরকারি প্লট দখ’ল করে ঘের ও ঘর তুলে ভাড়া দেন রাসেল। ঢাকার ফরিদ খান ইরান নামের এক জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হয় রাসেলের। বিভিন্ন সময় দেখা করার সুযোগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুক, ব্যানার-ফেস্টুন ছাপিয়ে রাসেল প্রচার করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে ভাগ্নে বলে ডাকেন। এভাবে পর্যটন জোনে অপরাধ জগতের ‘কিং’ হয়ে উঠেন তিনি।

এদিকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ওসি মানস বড়ুয়া ও সদর থানার ওসি (অপারেশন) মাসুম খান রাসেলকে কেক খাওয়ানোর একটি ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়। এতে অনেকেই অনেক ধরনের মন্তব্য করেছেন।

এ বিষয়ে সদর থানার ওসি (অপারেশন) মাসুম খান বলেন, অপরাধী ধরতে গেলে অনেক সময় অপরাধীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়তে হয় আমাদের। ভাইরাল ছবি এমন একটি ঘটনা। অ’পকর্মের খবর পেয়ে তা খতিয়ে দেখতে তার সঙ্গে মেশার চেষ্টা করেছি আমরা। ওসি মাসুমের কথায় সুর মিলিয়ে একই কথা বলেছেন ডিবি পুলিশের ওসি মানস বড়ুয়াও।

কক্সবাজার জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান কায়সারুল হক জুয়েল বলেন, অপরাধী কোনো দলের হতে পারে না। দলীয় পরিচয়ে অপরাধ করলে শা’স্তি পেতেই হবে। কাজী রাসেলের দায় দল নেবে না। তার বিরু’দ্ধে দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কাজী রাসেল গ্রেপ্তার এবং অন্যান্য অপরাধের বিষয়ে জানতে তার ভাই কাউন্সিলর কাজী মোর্শেদ আহমদ বাবুকে কল দিলেও রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা দেয়া হলেও সাড়া দেননি তিনি।

শেয়ার করুন !
  • 272
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!