চাঞ্চল্যকর তথ্য: পাপিয়ার মোবাইলের কললিস্টে বহু এমপির নাম!

0

সময় এখন ডেস্ক:

আওয়ামী যুব মহিলা লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ও সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক এমপি সাবিনা আক্তার তুহিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল শামীমা নূর পাপিয়ার। নানা তদবির ও কাজ বাগিয়ে নিতে প্র’ভাবশালীদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করতেন যুব মহিলা লীগের বহি’ষ্কৃত এই নেত্রী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র গণমাধ্যমকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

পাপিয়া রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিচ্ছেন। এরই মধ্যে তার মোবাইল কললিস্ট পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসা’বাদে একাধিক এমপির সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

গত রোববার পাপিয়া ও তার স্বামী মফিজুর রহমান ওরফে মতি সুমন চৌধুরীকে তিন মামলায় জিজ্ঞাসা’বাদের জন্য ১৫ দিনের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। নানা অ’পকর্মের ব্যাপারে বিমানবন্দর থানা পুলিশ পাপিয়াকে জিজ্ঞাসা’বাদ করছে।

তদন্তকারীরা জানান, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের বড় বড় কাজ মোটা অঙ্কের কমিশনের ভিত্তিতে পাইয়ে দেয়ার দেনদরবার করতেন পাপিয়া ও তার স্বামী। যাকে যে কায়দায় ম্যানেজ করা যায়, সেটা ব্যবহার করতেন পাপিয়া। কেউ প্র’লোভনের ফাঁদে পা না-দিলে তাকে কৌশলে প্র’তারণার জালে ব’ন্দি করতেন।

সূত্র জানায়, একটি সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা পাপিয়া ৫ বছরে কয়েক কোটি টাকা ও বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন। তাকে রাজধানী ও নরসিংদীতে মা’দক-বাণিজ্যে সহায়তা দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন রাজনৈতিক ব্যক্তিরা।

পাপিয়াকে সহায়তা দেয়ার তালিকায় রয়েছেন সরকারি কর্মকর্তাও। তাদের মধ্যে যুব মহিলা লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি সাবিনা আক্তার তুহিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার কথা স্বীকার করেছেন পাপিয়া।

তুহিনের সঙ্গে পাপিয়ার চ্যাটিংয়েও এ বিষয়ক তথ্য উঠে এসেছে। এ ছাড়া যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দুই শীর্ষ নেত্রীর পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার তথ্য রিমান্ডে উঠে এসেছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসা’বাদে কয়েকজন ভিক্টিমকে পাপিয়ার মুখোমুখি করা হয়। পাপিয়া তাদের সঙ্গে প্র’তারণা করার কথা স্বীকার করেন।

জিজ্ঞাসা’বাদে নিয়োজিত সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, নরসিংদীর একজন এমপির সঙ্গেও পাপিয়ার ভালো সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্র’ভাবশালীর মাধ্যমেই নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈধ-অ’বৈধ গ্যাস সংযোগ এবং লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি দিয়ে আসছিলেন তিনি। নিজে নিয়মিত মা’দক সেবন করতেন।

পাপিয়ার অ’পকর্মের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না জানতে চাইলে বিমানবন্দর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কায়কোবাদ কাজী বলেন, তিনি যুব মহিলা লীগ কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমা আক্তার, সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল এবং যুব মহিলা লীগ ঢাকা উত্তরের সভাপতি সাবেক এমপি সাবিনা আক্তার তুহিনের নাম বলেছেন। সব অভিযোগ যাচাই করা যায়নি।

সব কিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাপিয়া নিজে বাঁচার জন্যও উপর মহলের সংশ্লিষ্টতার কথা বলতে পারেন। তাই তার দেয়া তথ্য যাচাই করতে এরই মধ্যে হোটেলের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ জ’ব্দ করা হয়েছে। এখনও ফুটেজ বিশ্লেষণ করার সুযোগ হয়নি। যেসব রাজনৈতিক নেতা, আমলা বা ব্যবসায়ীর নাম এসেছে প্রয়োজনে তাদেরও জিজ্ঞাসা’বাদ করা হবে।

যুব মহিলা লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি ও সাবেক এমপি সাবিনা আক্তার তুহিন বলেন, সাংগঠনিক সম্পর্কের বাইরে পাপিয়ার সঙ্গে আমার অন্য কোনো সম্পর্ক ছিল না। রাজনীতির কারণেই আমাকে তার সঙ্গে মিশতে হয়েছে।

তিনি বলেন, পাপিয়া ২০১৪ সালে নেতা হয়েছে। আর আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে ২০১৭ সালে। তখন আমি এমপি ছিলাম। তাই সে আমার বাসায় নিয়মিত আসতো। গত ১ বছর ধরে পাপিয়ার সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। এমনকি আমি নরসিংদীতে গিয়ে ফোন করেও দেখা পাইনি। অ’নৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়ানোর কারণেই হয়তো সে আমার কাছ থেকে দূরে সরে গেছে।

তুহিন বলেন, পরিচয়ের পরে সাংগঠনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ফোনে কথা হয়। আবার ম্যাসেঞ্জারে চ্যাটিংও হয়। সংগঠনের জেলা নেত্রী হিসেবে তার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। তবে তার মধ্যে এমন কু’ৎসিত কিছু রয়েছে তা জানা ছিল না।

পাপিয়ার সঙ্গে গাড়ির ব্যবসা থাকার কথা অ’স্বীকার করে তিনি বলেন, এটা কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। প্রয়োজনে ওর সামনে আমাকে নিয়ে জিজ্ঞাসা’বাদ করুক।

তুহিন আরও বলেন, যাচাই-বাছাই না করে সরল বিশ্বাসে মিশেছি, এটাই আমার দোষ। সে অনেক আগে আমার বাসায় আসত। একবার পাপিয়াকে শাড়ি উপহার দিয়েছিলাম। সংগঠনের নেত্রী হিসেবে সেটা দিতেই পারি। সে একবার আমার কাছে টাকা ঋ’ণ চায়। তবে ওই সময় টাকা না থাকায় দিতে পারিনি। যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়ার পর মনে করেছি টাকা ধার না দেয়ায় হয়তো আসা-যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

সূত্র জানায়, গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হওয়ার চেষ্টায় বড় অংকের টাকা বিনিয়োগ করেন পাপিয়া। কিন্তু যারা এ দায়িত্ব নিয়েছিলেন তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাপিয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করতে সাহস পাননি। এ কারণে ওই বিনিয়োগটি বি’ফলে যায়।

শুধু তাই নয়, জেলা যুব মহিলা লীগের সাধারণ সম্পাদক হতে খরচ করেছিলেন ১ কোটি টাকা। এছাড়া উপঢৌকন হিসেবে কতিপয় প্র’ভাবশালী কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে দিয়েছিলেন বিশেষ উপহার।

তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে বুধবার বিকালে বিমানবন্দর থানার ওসি বিএম ফরমান আলী বলেন, রাজধানীর বিমানবন্দর থানার এক মামলার রিমান্ডের ২য় দিনে তদন্ত কর্মকর্তাদের নানা তথ্য দিয়েছেন পাপিয়া। আমরা যেসব তথ্য পাচ্ছি তাতে অবাক হচ্ছি। যাচাই করা ছাড়া এ বিষয়ে কিছু বলা যাবে না।

জানতে চাইলে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন-কাশেম বলেন, মামলাটি এখন থানা পুলিশ তদন্ত করছে। র‌্যাবের পক্ষ থেকে তদন্তের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অনুমতি পাওয়ার পর র‌্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত করবে।

তিনি জানান, পাপিয়ার অ’পকর্মের সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। পাপিয়া ও তার স্বামী অ’স্ত্র, জাল টাকা এবং ইয়া-বা ব্যববসায় জড়িত বলে সুনির্দিষ্ট তথ্য রয়েছে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেবল মা’দক ব্যবসাই নয়, পাপিয়া দম্পতি প্রচুর পরিমাণে মা’দক সেবন করতেন বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।

পাপিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বিষয়ে জানতে চাইলে যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি নাজমা আকতার বলেন, জেলা কমিটিতে পাপিয়া আগে কোনো পদে না থাকলেও তাকে পদ দিতে অনেকটা বাধ্য হয়েছিলাম। নরসিংদীর একটি পক্ষ পাপিয়াকে পদ না দেয়ার জন্য আমাদের বলেছিল। আমিও পাপিয়াকে পদ দেয়ার পক্ষে ছিলাম না। তারপরও শেষ পর্যন্ত দিতে হয়েছে। বাণিজ্য করে যারা পাপিয়াকে পদ দিয়েছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক। এমন মেয়েদের জন্য যুব মহিলা লীগের সম্মান যায়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাপিয়া কাদের সঙ্গে উঠাবসা করে, তাদের খুঁজে বের করলেই সব পেয়ে যাবেন। অনেকের সঙ্গেই পাপিয়ার ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল, তাদের বের করুন।

যুব মহিলা লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অপু উকিল বলেন, নরসিংদী আওয়ামী লীগ নেতাদের সুপারিশে পাপিয়াকে পদ দেয়া হয়েছিল। জেলার নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই আমরা কমিটি দেই। তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, এমপি-মন্ত্রীদের অনেক তদ্বির ছিল। অনেকেই পদ দেয়ার জন্য সুপারিশ করে।

শেয়ার করুন !
  • 15
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!