সাক্ষাৎকার: পিবিআই প্রধান বনজ কুমার, আস্থার অপর নাম

0

সময় এখন ডেস্ক:

বারোটায় অফিস আসি, দু’টোয় টিফিন। তিনটেয় যদি দেখি সিগন্যাল গ্রিন, চটিটা গলিয়ে পায়ে নি’পাট নি’র্দ্বিধায়, চেয়ারটা কোনো মতে ছাড়ি। কোনো কথা না বাড়িয়ে, ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে চারটেয় চলে আসি বাড়ি। আমি সরকারি কর্মচারী। আমি সরকারি কর্মচারী।

কথাগুলো নচিকেতার একটি বিখ্যাত গান। সরকারি চাকরিজীবীদের নে’তিবাচক দিকগুলো এভাবেই তুলে ধরেছিলেন বাংলা গানের এই শিল্পী।

সরকারি চাকরি কারও কাছে ক্ষমতা। কারও কাছে সামাজিক মর্যাদা। কারও কাছে সুযোগ অথবা অজুহাত। প্রজাতন্ত্রের এই কর্মচারীদের নিয়ে এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়। তাহলে কি সরকারি চাকরিজীবী মানেই এ রকম? নাকি এর ব্যতিক্রমও আছে। সেই সংখ্যাটিও নিতান্ত কম নয়। যাদের কাছে সরকারি চাকরি মানে ক্ষমতার দা’পট নয়, যাদের কাছে সরকারি চাকরি মানেই কর্তৃত্ব দেখানো নয়।

তাদের কাছে সরকারি চাকরি মানে হল পেশাগত দায়িত্ব। তাদের কাছে সরকারি চাকরি মানে হল জনসেবা। তাদের কাছে সরকারি চাকরি মানেই হল জনগণের বন্ধু, সেবক এবং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। পেশাগত দায়িত্ব পালনে তাদের কোন অজুহাত নেই। ঠিক এমনই একজন মানুষকে নিয়ে এই আয়োজন। নিভৃতে থেকে যারা দিন রাত কাজ করে যাচ্ছেন মানুষের জন্য, প্রজাতন্ত্রের জন্য।

বলছি এক মানবিক পুলিশ কর্মকর্তার কথা। বলছি, ডেপুটি ইন্সপেক্টর অব পুলিশ (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদারের গল্প। সাক্ষাৎকারের শুরুতে ঊর্ধ্বতন এই পুলিশ কর্মকর্তার পেশাগত জীবনের কিছু সাফল্য তুলে ধরা হলঃ

ট্যুরিস্ট পুলিশ:

২০০৬-০৭ সালের দিকে কক্সবাজার জেলা পুলিশে ছিলেন বনজ কুমার। দায়িত্ব পালন করছিলেন জেলা পুলিশ সুপার হিসেবে। আর তখন তিনি কক্সবাজার জেলা পুলিশের অধীনেই সীমিত পরিসরে চালু করেন ট্যুরিস্ট পুলিশ। তখন ট্যুরিস্ট পুলিশের ধারণা ছিল একেবারেই নতুন। বর্তমানে তা পুলিশের একটি বিভাগে পরিণত হয়েছে।

নথি সংরক্ষণ:

বনজ কুমার মজুমদার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) যোগ দেন ২০১৬ সালে। যোগ দেওয়ার পর, পিবিআইতে আসা মামলার নথি সংরক্ষণের জন্য তৈরি করান নতুন এক সফটওয়্যার। আর এতে করে সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির নথি সংরক্ষণ কাজে আসে গতিশীলতা।

ফরেনসিক ল্যাব:

প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে আসার পর, তিনি পিবিআই’র জন্য একটি অত্যাধুনিক ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করেন। এই ফরেনসিক ল্যাবকে আরও যুগোপযোগী করতে তিনি নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। আর এর মাধ্যমে তাদের করা প্রতিবেদনগুলো আদালতে হয়ে উঠছে গ্রহণযোগ্য। অত্যাধুনিক এই ল্যাব সুবিধা বর্তমানে পিবিআইসহ জেলা ও মেট্রোপলিটন পুলিশও সমানভাবে ব্যবহার করছে।

এনআইডির ডাটা:

দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে থাকা এনআইডির ডাটা ব্যাংকে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেন তিনি। ফলে, অপরাধ কাজের সাথে জড়িত আসামি ও ভিক্টিমের পরিচয় শনাক্তের কাজটি সহজ হয়ে উঠেছে। এতে পিবিআই’র অন্যান্য ইউনিটগুলো তাৎক্ষণিকভাবে ডাটাবেজ থেকে তথ্য যাচাইয়ের সুবিধা গ্রহণ করতে পাচ্ছে।

ফিঙ্গার প্রিন্ট:

তার অধীনে দেশের ‘ফিঙ্গার প্রিন্ট আইডেন্টিফিকেশন অ্যান্ড ভেরিফিকেশন সিস্টেম’ চালু করে পিবিআই। বর্তমানে পিবিআই’র সব ইউনিট এই পদ্ধতির সফল ব্যবহার করছে। এর ফলে, আনআইডেন্টিফায়েড ডেডবডি শনাক্তকরণ কাজটি সহজ হয়ে গেছে।

উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল কাজের পাশাপাশি মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি মার্ডার কেস, রাজধানীর সগিরা মোর্শেদ মার্ডার কেস, কর্ণফুলিতে ৪ নারী গ্যাং-রেপ কেস, চট্টগ্রামের সুদীপ্ত মার্ডার কেস, ময়মনসিংহের মিতু মার্ডার কেসসহ নানা চাঞ্চল্যকর মামলা ছাড়াও সম্প্রতি চিত্রনায়ক সালমান শাহের আত্মহ’ত্যা তদন্তের সাফল্য দেখান বনজ কুমার মজুমদারের নেতৃত্ব দেওয়া পিবিআই।

প্রশ্ন: কেমন আছেন?
বনজ কুমার: ভালো আছি।

প্রশ্ন: আপনার পড়াশোনা ও শিক্ষা জীবন সম্পর্কে জানতে চাই…
বনজ কুমার: মাধ্যমিক পর্যন্ত আমি পড়াশোনা করেছি নিজ গ্রাম জুজখোলায়। এটি পিরোজপুর সদরে অবস্থিত। উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনা সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ, পিরোজপুর। উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করেছি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্সে।

প্রশ্ন: আপনার পরিবার নিয়ে, আমাদের পাঠকদের যদি কিছু বলতেন…
বনজ কুমার: পারিবারিক জীবনে আমি ২ সন্তানের জনক। আমার বড় মেয়ে পড়াশোনা করছে কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর ছোট মেয়ে পড়াশোনা করছে গ্রেড নাইনে। একটি ইংরেজি মাধ্যমে। আর, আমার স্ত্রী পেশায় একজন চিকিৎসক।

প্রশ্ন: সরকারি এই চাকরি জীবনে পুলিশিং এর জন্য কোন কোন পদক পেয়েছেন?
বনজ কুমার: পুলিশিং এ পেশাগত কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ৩ বার পুলিশ পদক পেয়েছি। ২০০৮ সালে কক্সবাজার জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার ছিলাম। তখন গৃহকর্মীদের নিয়ে কাজ করার জন্য প্রথমবারের মতো ‘রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক’ (পিপিএম) পেয়েছি। আর ২০১৯ ও ২০২০ সালে ২ বার পেয়েছি ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ (বিপিএম)।

প্রশ্ন: আপনার কোনো প্রশিক্ষণের বিষয়ে যদি কিছু বলতেন..
বনজ কুমার: এখন তো পুলিশের প্রশিক্ষণ হয় রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীতে। আমি ১২তম বিসিএসে যোগ দিয়েছিলাম। তখন আমাদের ব্যাচই প্রথমবারের মতো প্রশিক্ষণ নিয়েছিল ‘বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে’। তখন এটাকে বলা হত ‘বেসিক মিলিটারি ট্রেনিং অব পুলিশ’। সেনাবাহিনীর ক্যাডেটদের সাথে ৬ মাস ঐ প্রশিক্ষণে ছিলাম। এরপর, মূল প্রশিক্ষণ শুরু করেছিলাম ‘বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমীতে’।

প্রশ্ন: পুলিশ সম্পর্কে কোন অভিযোগটি আপনাকে ক’ষ্ট দেয়?
বনজ কুমার: অ’কপটভাবে বললে পুলিশ সম্পর্কে মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। দেখেন, পুলিশের কাছে সবাই খারাপ সময়ে আসে। ফলে কোন কোন ভিক্টিম শো’ষণের শি’কার হয় বলে শোনা যায়। আবার উপকার বা সহায়তা পায় না এমনও কিন্তু নয়। মজার বিষয় হল, যারা কোন দিন আমাদের কাছে কোন সেবার জন্য আসেননি, তাদেরও এমন অভিযোগ করতে শোনা যায়। তবে আমাদের আইজিপি স্যার এসব অভিযোগ বন্ধে অ’নড় অবস্থানে যাচ্ছেন।

প্রশ্ন: অবসরে কী করেন?
বনজ কুমার: (প্রশ্ন শুনে একটা মুচকি হাসি) পুলিশের চাকরিতে খুব একটা অবসর মিলে না। যেটুকু অবসর পাই, বই পড়ি আর সিনেমা দেখি। তাছাড়া, অবসরে স্ত্রীর সাথে বিভিন্ন কেসের মেডিকেল টার্ম নিয়ে আলোচনা করি।

প্রশ্ন: পুলিশ না হলে কোন পেশায় যেতেন?
বনজ কুমার: (হেসে) প্রকৌশলী হতাম। এর বাইরে আমি আর কী হতে পারতাম? পুলিশে আসার আগেও তাই ছিলাম। প্রথমে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেছি বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর)। পরে কাজ করেছি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) তে।

প্রশ্ন: আপনাকে ধন্যবাদ।
বনজ কুমার: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মোস্তাকিম ভুঞা, বাংলা ইনসাইডার

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!