কল-রেডী: ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

দিন যায়, দিন আসে, রাতের পর রাতের আসা-যাওয়া। একইভাবে বছর-যুগ-শতাব্দীর চলা। জন্ম নেয় বিভিন্ন ঘটনার। স্থান পায় অতীতের পাতায় সেই সব ঘটনা আর দিনক্ষণ। কিন্তু থেকে যায় দুই স্বাক্ষী- সবাক আর নির্বাক। সবাক স্বাক্ষীগুলো ওই সব ঘটনার বিষয়ে নানান কিছু বলার সুযোগ পেলেও নির্বাক স্বাক্ষীগুলো নিতান্তই অ’সহায়। কেবলই দেখে, বলতে পারে না। কিন্তু নির্বাক স্বাক্ষীদের দেখলে সবাক স্বাক্ষীরা স্মৃতির পাতায় ফেরাতে পারে অতীতের বহু ভুলে যাওয়া ঘটনা। সুযোগ পেলেই মুখরিত হয়ে উঠেন অতীতের আলাপচারিতায়।

১৯৪৮ সালের কথা। বিক্রমপুরের শ্রীনগর থানার মঠবাড়িয়া গ্রামের আপন দুই ভাই দয়াল ঘোষ ও হরিপদ ঘোষ। ওই বছর পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে মাইকের ব্যবসা শুরু করলেন। প্রথমেই এই প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল আই এম অলওয়েজ রেডী, অন কল এট ইয়োর সার্ভিস বা আরজা (এআরজেএ) ইলেকট্রনিক্স। এর বছরখানেক পরই নামকরণ হয় কল-রেডী নামে। যার স্থান ছিল ১৯৪৮ এর স্বাধিকার আন্দোলনে, ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে, ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলনে, ঊনসত্তরের গণঅ’ভ্যুত্থানে আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযু’দ্ধের সময়। পরিণত হয় বাংলার ইতিহাসের এক জ্বলন্ত স্বাক্ষী রূপে। বাঙলির প্রধান প্রধান আন্দোলন-সংগ্রামের সভা-সমাবেশে ছিল এই কল-রেডী মাইক কোম্পানি। কেবল বাণিজ্যিক নয়, দেশ ও জনগণের স্বার্থে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে বাকিতেও সেবা দিয়েছে কল-রেডী।

বিশেষ করে স্বাধীনতা যু’দ্ধে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে কল-রেডী বিনে-পয়সায় সেবা দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের অংশীদার হয়েছিলেন। বিশ্বখ্যাত ৭ মার্চের জনসভায়ও কল-রেডীর মাইক ছিল জীবন্ত। বঙ্গবন্ধু শ্বাস-প্রশ্বাসে দুলছিল কল-রেডীর মাইক্রোফোন, কাঁপছিল মাইকগুলো। কী স্বাধীনতার ঘোষণা, কী বিজয়ের ঘোষণা, কল-রেডী ছাড়া কোন কথাই ছিল না। এছাড়াও বাংলাদেশের স্বাধীনতার-পূর্ব ও পরবর্তী সব রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ সভাসমাবেশে কল-রেডীর উপস্থিতি ছিল খুবই স্বাভাবিক। দেশের তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মওলানা ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সবার জনসভা মানেই ছিল ‘কল-রেডী’। এছাড়াও এ কোম্পানির মাইকে দেশখ্যাত অনেক নেতা বক্তব্য রেখেছেন। পরবর্তীতে যাদের কেউ এমপি, মন্ত্রীসহ দেশের খুবই গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

মূলত এ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন পুরাতন ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের কানাই ঘোষের প্রয়াত ভাই দয়াল ঘোষ। শিল্প ও সংস্কৃতি নিয়ে তার আগ্রহ ছিল অনেক। ছিলেন চিরকুমার। সিনেমা, স্টেজ, থিয়েটার, শো এসব নিয়ে থাকতেন। এজন্য ঝুঁকে পড়েছিলেন গ্রামোফোনের ব্যবসায়। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তার দুই ভাই। বাংলাদেশের মাইক ব্যবসা জগতের অগ্রগামী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এটিই ছিল শীর্ষে। বর্তমানে পারিবারিক সূত্র ধরে আরেক ভাই হরিপদ ঘোষের ৪ ছেলে মিলে পারিবারিক ভাবেই এ ব্যবসাটি কোন রকমে টিকিয়ে রেখেছেন বলে জানালেন সাগর ঘোষ ও বিশ্বনাথ ঘোষ।


ছবি: কল-রেডী মাইক কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা দুই সহোদর- স্বর্গীয় দয়াল ঘোষ (বাঁয়ে) এবং হরিপদ ঘোষ (ডানে)

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি ৩৬, এইচকে দাস রোড, লক্ষ্মীবাজার, সূত্রাপুর থেকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। বর্তমানে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান কল-রেডী’র প্রতিষ্ঠাতা দুই ভাইয়ের কেউই বেঁচে নেই। বড় ভাই দয়াল ঘোষের মৃ’ত্যু সাল না জানা গেলেও হরিপদ ঘোষেরটি জানা গেছে। তিনি ২০০৪ সালে স্বর্গলোকে গমন করেন। কিন্তু দুই ভাইয়ের স্মৃতি চিহ্ন আর বিভিন্ন ইতিহাসের নির্বাক রাজস্বাক্ষী কল-রেডীর দোকান লক্ষ্মীবাজারের সেই একই স্থানে রয়েছে। তবে দিন যেমন পাল্টেছে, তেমনি পাল্টেছে কল-রেডী। বেড়েছে দোকানের আয়তন, সংযোজন হয়েছে আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। যা দ্বারা যে কোনও বড় ধরনের সভা-সমাবেশসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান করা সম্ভব। বাবা দয়াল ঘোষের মৃ’ত্যুর পর ২০০৪ সালেই প্রতিষ্ঠানের হাল ধরেন তারই সন্তান সাগর ঘোষ। তাকে সহায়তা করছে চাচা কানাই ঘোষ ও অপর দুই ভাই বিশ্বনাথ ঘোষ ও শিব নাথ ঘোষ। অ’ক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে সুনামের সঙ্গে টিকিয়ে রেখেছেন ইতিহাসের এই স্বাক্ষী ও চাচা-বাবার লালিত স্মৃতি।

রাজধানীর খুব কম মানুষই আছেন যারা কল-রেডীর নাম শোনেননি। ঢাকার বাইরেও যথেষ্ট পরিচিতি রয়েছে এর। কল-রেডীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাগর ঘোষ জানান, এই কল-রেডী একদিনে এ অবস্থায় আসেনি, এর পেছনে রয়েছে বহু সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা। তিনি বলেন, আমাদের আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম রয়েছে, যা দিয়ে যে কোনো বড় অনুষ্ঠান করা সম্ভব। তা দেশের যেখানেই হোক। তিনি আরও বলেন, কল-রেডীর আরেক নাম বাংলাদেশ। যাতে গর্জে উঠে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক। তিনি বেশ দুঃখ করেই বলেন, যে কল-রেডী দেশের জন্য সাধ্যানুযায়ী কাজ করেছিল সে কল-রেডীকে আজ আগের মতো মূল্যায়ন করেন না অনেকেই। সকলেরই বোঝা উচিৎ কল-রেডী কোন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়। কল-রেডী সবার, কল-রেডী বাংলাদেশের। দেশের স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি, বিভিন্ন আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। ঐতিহ্যবাহী কল-রেডী প্রতিষ্ঠানটি যাতে সুনামের সঙ্গে টিকিয়ে রাখা যায় এজন্য তিনি সকল রাজনৈতিক দল, সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে সহযোগিতা কামনা করেছেন।

উত্তাল ১৯৭১, টান টান উত্তে’জনায় দেশ- দেশের প্রতিটি মানুষ। সবাই অপেক্ষা করছে একটি সমাবেশ আর ঘোষণার। সমাবেশের স্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। সারাদেশের মানুষের তখন দৃষ্টি আর মন এ সমাবেশের দিকেই। সমাবেশের স্থান আর দিন তারিখ সবই নির্দিষ্ট। আয়োজনও শেষের দিকে। সমাবেশ যোগদানকারীরা শুনবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা। দেশবাসী বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চান কী করতে হবে তাদের। নেতার ভাষণ সুন্দর-সাবলীলভাবে সবাই যাতে শুনতে পারেন তার জন্য প্রয়োজন সুন্দর একটি সাউন্ড সিস্টেম বা শব্দ ব্যবস্থা।

ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম আয়োজকদের বিবেচনায় থাকলেও নিজেদের মাইক নিয়ে এগিয়ে আসতে সাহস করেনি কোন মাইক ব্যবসায়ী। সমাবেশের মাইক সরবরাহের প্রস্তাব দেয়া হলো তরুণ মাইক ব্যবসায়ী কানাই ঘোষকে। ঢাকার ঐতিহাসিক মাইক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কল-রেডীর প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় দয়াল ঘোষের ভাই তিনি। কানাই ঘোষ জানতেন সামবেশে মাইক সরবরাহের ঝুঁ’কি প্রচুর। এগিয়ে গেলে পড়তে হবে পাকিস্থানিদের রোষানলে। জীবন বি’পন্ন হওয়ার আশ’ঙ্কায় অনেকেই নি’ষেধ করলেন তাকে। পাকিস্থানি দালালদের হুম’কি পেলেন। বয়সে তরুণ আর টগবগে এ তরুণের রক্তে তখন শো’ষকদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার স্বপ্ন। না! কানাই ঘোষ ভ’য় পায় না পাকিস্থানিদের র’ক্তচক্ষুকে। রাজি হয়ে গেলেন আয়োজকদের প্রস্তাবে। মাইক সরবরাহ করবে তার প্রতিষ্ঠান কল-রেডী।

কল-রেডী’র সেই মাইকেই ৭ মার্চ দেশবাসী শুনলো দেশবাসীর প্রতি মুজিবের জেগে ওঠার আহ্বান- এক স্বাধীনতার কাব্য। “এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম”… ইত্যাদি বজ্রকন্ঠের ভাষণ। কল-রেডী’র শাণিত প্রবাহে উদ্বেলিত হয় মুক্তিকামী বাঙ্গালির হৃদয়। এরপর থেকে শেখ মুজিবসহ স্বাধীনতার স্বপক্ষে আয়োজিত প্রায় সব সমাবেশই মাইক সরবরাহ করেছিলেন কানাই ঘোষ। নিজ হাতে লাগিয়ে দিয়েছিলেন তার যত্নের মাইকগুলো। এরপর দেশে চলল অনেক ভাঙা-গড়ার খেলা। এক সময় দেশ স্বাধীন হলো- জন্ম নিল বাংলাদেশ। সেদিনকার সেই আয়োজকদের অনেকেই পরে দেশের নেতৃত্ব দিলেন- ক্ষমতার আসনে বসলেন। কিন্তু জীবন বি’পন্ন জেনেও যে কানাই ঘোষ সমাবেশের মাইক সরবরাহ করেছিলেন তার খোঁজ আর কেউ নিলেন না স্বাধীনতার ৪৪ বছরেও। তবে কল-রেডী এখনও বেঁচে আছে- এক অমর অ’ক্ষয় ইতিহাসের স্বাক্ষী হিসাবে।

বঙ্গবন্ধু নেই। কিন্তু তার ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আছে। সারা দুনিয়ায় প্রচারিত হচ্ছে সে ভাষণ। কিন্তু যে মাইকগুলোর সাহায্যে রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দিয়েছিলেন সেগুলো অ’যত্ন আর অব’হেলায় আজ ন’ষ্ট হতে বসেছে। ওই দিন জনসভায় রেসকোর্স ময়দানে ব্যবহৃত মাইক্রোফোনের স্ট্যান্ডটি আজও সংরক্ষিত আছে কল-রেডীর কাছে। সেদিন যেসব অ্যাম্প্লিফায়ার ব্যবহার করা হয়েছিল তার মধ্যে ৭টি অ্যামপ্লিফায়ার এখনও আছে। আছে ৪টি মাইক্রোফোন। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষে এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যবসায়িক ম’ন্দার কারণে প্রতিষ্ঠান চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন এর পরিচালকরা। তাই উপযুক্ত সম্মানীর বিনিময়ে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে যন্ত্রগুলো সংরক্ষণের আহ্বান জানানো হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে।

কল-রেডীর বর্তমান পরিচালক সাগর ঘোষ জানান, প্রতিষ্ঠানটির আদি মালিকদের মধ্যে একজন তার পিতৃব্য কানাই ঘোষ। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল ১৭-১৮ বছর। ৭ই মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণ প্রচারিত হয়েছিল তার লাগানো মাইকেই। জনসভার একদিন আগে থেকেই কানাই ঘোষ তার অন্য দুই ভাইকে নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে মাইক লাগিয়েছিলেন। ৭ই মার্চ অনেক ঝুঁ’কি সত্ত্বেও কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে মাইক লাগিয়েছেন তিনি। একপ্রকার হাতে প্রাণ নিয়ে কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন ভাষণ শুরু করেন তখন তিনি কাছেই ছিলেন। কল-রেডীর স্বত্বাধিকারীদের মধ্যে একমাত্র কানাই ঘোষ জীবিত। বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত কল-রেডী ও কানাই ঘোষ।

স্বাধীনতা আন্দোলন ও সকল সভা-সমাবেশে উপস্থিতি ছিল কল-রেডীর। সহকর্মী দুই ভাই দয়াল ঘোষ ও হরিপদ ঘোষ এখন বেঁচে নেই। তার প্রতিষ্ঠানের ৩০ জন স্টাফও তার সঙ্গে ছিলেন। কানাই ঘোষ এখন জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছেন। জীবনে অনেক অর্জন থাকলেও স্বীকৃতির অভাবে সেগুলো মূল্যহীন। সারাজীবন রেসকোর্স ময়দানে ব্যবহৃত সরঞ্জাম আঁকড়ে রাখলেও মনের কষ্ট থেকে তা বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি ও তার উত্তরাধিকাররা। এসব সরঞ্জামাদি ও ঐতিহাসিক ঘটনা লিখে ২০১০ সালে ওয়েবাসাইট তৈরি করা হয়েছিল ‘কল-রেডী’ নামে। বর্তমানে আর্থিক সমস্যার কারণে মাইকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর সংখ্যাও কমিয়ে ফেলতে হয়েছে। কমে গেছে ব্যবসার পরিসর। তাই ব্যবসা বাঁচাতে ও কাজের স্বীকৃতি দানে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক।

কল-রেডীর পরিচালক সাগর ঘোষ আক্ষেপ করে বলেন, মুক্তিযু’দ্ধে অ’সামান্য অবদানের জন্য প্রতি বছর বিদেশী বন্ধুদের সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে পুরস্কার দেয়া হয়েছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে বীর বাঙালি মুক্তিযু’দ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সারা বিশ্বের মানুষ বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণ শুনতে পেরেছে সেই প্রতিষ্ঠানকে আজ পর্যন্ত কোন প্রকার সম্মননা দেয়া হয়নি। বরঞ্চ পুঁজির অভাবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হতে বসেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে খরচ বেড়েছে অনেক। কিন্তু সেই অনুপাতে আয় বাড়েনি। প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতি ৭ই মার্চে ব্যবহৃত যন্ত্রগুলো সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, টাকা দিয়ে কল-রেডীর সেই দিনের সার্ভিসকে মূল্যায়ন করা সম্ভব না। এ জন্য দরকার স্বীকৃতি। বঙ্গবন্ধু কন্যা অবশ্যই বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন। তাছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হলেও এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন পট পরিবর্তনশেষে ক্ষমতায় এসে বঙ্গবন্ধুর কন্যার নেতৃত্বের সরকার সর্বপ্রথম সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখানে স্থাপন করেন শিখা চিরন্তন। স্থানটি সংরক্ষিত হলো কিন্তু অব’হেলিত থেকে গেলেন সেই কানাই ঘোষ আর তার ‘কল-রেডী’- যার শব্দ যন্ত্র ব্যবস্থা দিয়েই মুক্তিকামী বাঙালী শুনেছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার সেই তর্জনী উঠানো বজ্রকন্ঠ। প্রতিবছর ৭ মার্চ আসে এখনও চাতকের মত অপেক্ষায় থাকেন কানাই। রাষ্ট্রযন্ত্রের কেউ হয়তো তার বাড়িতে আসবেন- সম্মান দিবেন ৭ মার্চের সেই সমাবেশের অন্যতম নায়ক হিসেবে। কিন্তু না! কেউ আসে না। স্বপ্ন ভাঙে তার।

বার্ধক্য আর ব’ঞ্চনার শি’কার তার জীবন এসব সয়ে গেছে অনেকটাই। সবাই সরে গেছে তার জীবন থেকে। শুধু তার পিছু ছাড়েনি শারীরিক অসুস্থতা। সাউন্ড সার্ভিসের সব সরঞ্জামাদি অনেক যত্নে আগলে রেখেছেন তিনি- আগলে রেখেছেন ইতিহাসের স্বাক্ষী হয়ে থাকা শব্দযন্ত্রগুলো পরম মমতায়। তার সন্তানরা আর এখন চান না সম্মান দিয়ে সেই মাইকগুলো আগলে রাখতে। এগুলো রেখে আর কী হবে? যতসব পুরনো জিনিসপত্র। প্রয়োজনে অর্থের কাছে বিকিয়ে দিতে চান তাদের বাবার সেই অমূল্য সাহসিক শব্দের অস্ত্রগুলো। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা কি পারেন না কানাই ঘোষকে তার উপযুক্ত সম্মান দিতে? সহযোগিতার মাধ্যমে পারেন না কানাই ঘোষের ছেলেদের সিদ্ধান্তকে বদলে দিতে?

এ প্রশ্ন দেশবাসীর- এ প্রশ্ন আমাদেও নবীন প্রজন্মের। আমরা কি পারি না মৃ’ত্যুর আগে বাংলা মায়ের এই বীর মুক্তিযো’দ্ধাকে একটু পূর্নতা দিতে? এই স্বাধীনতার মাসে স্বাধীনতার স্বপক্ষের বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ জানাচ্ছি, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে হলেও কানাই ঘোষের পরিবারের দিকে একটু দৃষ্টি দিন। বাঁচিয়ে রাখুন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের অমূল্য স্মৃতি বিজড়িত স্বর্গীয় দয়াল ঘোষ প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক কল-রেডী এর সাইন্ড সার্ভিসটিকে। সেই সঙ্গে মুক্তিযু’দ্ধ জাদুঘর, জাতীয় জাদুঘর ও বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষণ করুন ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে ব্যবহৃত সেই সময়কার কল-রেডী মাইক সরঞ্জামগুলো- এগুলো ছাড়া বাংলার ইতিহাস যে অসম্পূর্ন থেকে যাবে চিরকাল।

লেখক: ডা. সুব্রত ঘোষ
পরিচিতি: সমাজকর্মী, চিকিৎসক, কলামিস্ট ও সংগঠক এবং আহবায়ক, নব মুক্তিসেনা
৬ মার্চ, ২০১৫ইং

শেয়ার করুন !
  • 4.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply