পাকিস্থানি রাজুর ইয়া’বা সিন্ডিকেট নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

0

সময় এখন ডেস্ক:

আটকে পড়া পাকিস্থানি পরিবারের যুবক। মোহাম্মদপুরে জেনেভা ক্যাম্পে ঠাঁই হয়েছিল তার পরিবারের। স্বাধীনতার পর পাকিস্থানে ফেরত যায় পরিবারটি। ১ যুগ আগে দেশটি থেকে ফের বাংলাদেশে ফিরে আসে তারা। আবার ক্যাম্পেই ঠাঁই নেয়। ৭ সদস্যের পরিবারটির একজন রাজু ওরফে বাবা রাজু ওরফে পাকিস্থানি রাজু। এসব পরিচিতি পাওয়ার আগে তাকে ক্যাম্পে সবাই চিনত পান-দোকানি রাজু নামে।

এই রাজু জেনেভা ক্যাম্পকে ঘিরে গড়ে তুলেছে ‘ইয়া’বা সাম্রাজ্য’। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রীতিমতো ডিলার নিয়োগ দিয়ে দিনের পর দিন বিক্রি করে আসছে এই নে’শাদ্রব্য। তার সিন্ডিকেটের কেউ কেউ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায় রাজু। এখন তাদের গোটা পরিবারই এই কারবারে জড়িত বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজু কিংবা তার পরিবারের কাউকে গ্রেপ্তার করতে না পারায় ক্ষু’ব্ধ এলাকাবাসী।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, একজন নারী এবং ৬ জন পুরুষসহ ৭ সদস্যের এই পরিবারটি মোহাম্মদপুরের জেনেভা পাকা ক্যাম্পের রিয়াজের সাউন্ড দোকানের গলির একটি ঘরে বাস করছে। আর ক্যাম্পের বি ব্লকে ৫টি ঘর ভাড়া নিয়েছে রাজু। তবে রাজু কোথায় থাকে তা কারও জানা নেই।

জেনেভা ক্যাম্প সূত্র জানায়, পাকিস্থানে চলে যাওয়ার পর ভ্রমণভিসা নিয়ে ফের বাংলাদেশে আসে রাজুর পরিবার। জেনেভা ক্যাম্পের এইচ ব্লকের বাসিন্দা নূর ইসলাম ওরফে চারকু তাদের সার্বিক সহযোগিতা করে। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশি বাসিন্দা হিসেবে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে দেয় চারকু।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পাড়ি জমানোর আগে এই পরিবারটি পাকিস্থানে ড্রা’গের ব্যবসা ও জ’ঙ্গি কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। পরিবারের বড় সন্তান পাকিস্থানের এলিট ফোর্স ‘রেঞ্জার্স’ এর সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহ’ত হয়। তাদের কর্মকাণ্ড পাকিস্থানে ফাঁ’স হয়ে গেলে তারা বাংলাদেশে আসতে বাধ্য হয়।

বাংলাদেশে এসে প্রথমে জেনেভা ক্যাম্পের দক্ষিণ দিকে একটি পান-সিগারেটের দোকানের ব্যবসা শুরু করে পরিবারটি। তবে এর আড়ালে চলত অ’বৈধ ব্যবসা। একপর্যায়ে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে এক বিশাল সিন্ডিকেট। বর্তমানে সেই পান দোকান অন্য একজনকে ভাড়া দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নূর ইসলাম চারকু ও তার ছেলে ‘এস’ বাহিনীর সদস্য ইমরান শুরু থেকেই এই কারবারে রাজুর পরিবারকে সবরকম সহযোগিতা করেছে।

জেনেভা ক্যাম্পের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজুর আরও ৪ ভাই রাশেদ, কাশেম, আতিক ও হামজা এবং রাজুর স্ত্রী রিমা, রাশেদের স্ত্রী ঝিনু ও কাশেমের স্ত্রী চাঁদনিও এই ব্যবসায় জড়িত। তবে সবচেয়ে সক্রিয় রাজু ও তার মা রেহানা। এই ব্যবসা করেই রাজু বর্তমানে চকবাজারে নিজের নামে একটি ফ্লাট কিনেছে।

ব্যবসার হিসাব রাখতে হাসান নামে একজন ম্যানেজারও নিয়োগ দিয়েছে রাজু। হাসান জুয়েলারির বাক্স তৈরির কাজের আড়ালে এই কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। হাসানের দোকানে বসেই বড় বড় চালান আনার লাইন-ঘাট ঠিক করা এবং বেচা-বিক্রির হিসাব নেয় রাজুর বাবা মান্ডা ওরফে পাকিস্থানি মান্ডা ও রাজুর মা রেহানা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পের মা’দক সম্রাট হিসেবে পরিচিত ছিল পঁচিশ। র‌্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে গত বছর মা’রা যায় পঁচিশ। তারপর জেনেভা ক্যাম্পের আরেক কারবারি ইশতিয়াক চলে যায় আত্ম’গোপনে। রাজুর ছোট ভাইয়ের শ্বশুর ‘মেন্টাল আসলাম’ ইশতিয়াকের বোন জামাই। এ ছাড়া ধরা পড়ে বেশ কয়েকজন চিহ্নিত অপরাধী। সে সময় ক্যাম্প ছেড়ে যায় রাজু ও তার পরিবার।

অনুসন্ধান বলছে, রাজু বিভিন্ন সময় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছে এবং নিয়মিত ঠিকানা পাল্টায়। ক্যাম্প ছাড়ার পর পুরান ঢাকার নবাবপুরে তার আনাগোনা বেশি ছিল। এরপর ঘন ঘন জায়গা পরিবর্তন করে কখনো পুরান ঢাকায়, কখনো আদাবর, কখনো হাজারীবাগে বাস করে। সম্প্রতি মোহম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান মোড় এলাকায় স্থানীয় যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে রাজুর আনাগোনা দেখা গেছে।

রাজুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার স্ত্রী রিমার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের পরিচয় অ’স্বীকার করেন। এমনকি তার স্বামী রাজুকে চেনেন না বলেও প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন।

যেসব এলাকায় রাজুর এই ব্যবসার রেঞ্জ:

মোহাম্মদপুর ও আশপাশের এলাকার প্রায় ৩ শতাধিক কারকারি রাজুর নিয়ন্ত্রণাধীন। তার দেয়া মাল বিক্রি করে এসব ডিলার। তাদের মধ্যে অন্যতম- আন্ডে, জাম্বু ওরফে কসাই জাম্বু, শাকিল ওরফে বাবা শাকিল, মাউরা রাসেল ও তার স্ত্রী, ওয়াসিম ওরফে ফরমা ওয়াসিম। এদের প্রত্যেকেই আটকে পড়া পাকিস্থানি আর জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা। তাদের নেটওয়ার্ক রয়েছে জেনেভা ক্যাম্প, টোল ক্যাম্প, টাউনহল ক্যাম্প, জান্নাতবাগ ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকায়।

কৃষি মার্কেট সংলগ্ন ক্যাম্পে ব্যবসা পরিচালনা করে তুষার, সরফু, মজো বিকি, কালা চান, জাবেদ, গা’ঞ্জা জাবেন, পাইজামা ওয়ালির ছেলে আরমান, নিহ’ত পঁচিশের ভাই আরমান। ক্যাম্পের হুসেন পান দোকানের সামনে, তাজমহল রোড ও ক্যাম্পের পেছনে কমিউনিটি সেন্টারের সামনে তারা ক্রেতাদের হাতে তুলে দিচ্ছে মা’দক।

ক্যাম্পের সবাই জানে:

রাজু ও তার পরিবারের এসব অ’বৈধ ব্যবসা ও সিন্ডিকেটের বিষয়টি জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সকলেই জানে। দীর্ঘসময় ধরে এই ব্যবসায় জড়িত থাকায় বিপুল অর্থ ও ক্ষমতার অধিকারী হয়েছে রাজু। তাই তার কর্মকাণ্ডে অনেকে বির’ক্ত হলেও মুখ খুলতে রাজি নন কেউ।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রাজুর উত্থান ও কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানিয়েছেন ক্যাম্পের অনেক বাসিন্দা। জেনেভা ক্যাম্পের এক যুবক বলেন, রাজু পান দোকান করত। তারপর এসব ব্যবসা শুরু করল। হুট করে টাকার মালিক হয়ে গেল। আরেক বাসিন্দা বলেন, শুধু ক্যাম্প না। ক্যাম্পের আশপাশে যত সিন্ডিকেট আছে, সব রাজুর লোকজন। ওদের অনেক ক্ষমতা, তাই কেউ মুখ খুলতে পারে না।

পঁচিশ ক্রসফায়ারে মারা যাওয়ায় খুশি ক্যাম্পের অনেকেই। তবে রাজুসহ অন্যদেরও একই ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে ক্যাম্পবাসী। তারা বলেন, রাজু ও তার পরিবারের কারনে আমাদের সন্তানেরাও আস’ক্ত হয়ে পড়ছে। সরকার চাইলেই তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে পারে।

ক্যাম্পের অপর এক বাসিন্দা বলেন, ক্যাম্পের নামে নানা অভিযোগ। সবাই জানে আমরা অ’বৈধ জিনিসের ব্যবসা করি। আসলে ক্যাম্পের লোকজন যারা এসব ব্যবসা করে, তাদের কাছে বিক্রি করা এবং তাদেরকে সেবন করা শিখিয়েছে পাকিস্থানি রাজুরা। এদের নি’র্মূল করতে পারলে সব সমস্যার সমাধান হবে।

জেনেভা ক্যাম্পের নন লোকাল রিলিফ কমিউনিটি জোন-এ-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে আছেন এস এম সিমা কোরাইশি। ক্যাম্পে রাজুর এসব ব্যবসায় সম্পৃক্ততার কথা তিনিও জানেন। সিমা বলেন, ওরা (রাজু ও তার পরিবার) আমাদের ক্যাম্পেই ছিল। এখান থেকে তারা পাকিস্থান চলে যায়। আবার কিসের জন্য ফুল (পুরো) ফ্যামিলি পাকিস্থান থেকে চলে আসছে। একটা রুম নিয়ে ওরা এখানে থাকতেছে। আমার জানা মতে সে এখন ক্যাম্পে নাই। আসে-যায় বলে শুনেছি।

রাজুর ডিলারদের বেশিরভাগেই জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা এ বিষয়ে জানেন কি না প্রশ্নে সিমা বলেন, এক সময় ছিল। এখন ওই রকম নাই। একেবারে নাই, আমি এটা বলব না। এটার ফুল (পুরো) দায়িত্ব থানার। আমাদের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে সহযোগিতা করছি।

জেনেভা ক্যাম্পে এসব নি’ষিদ্ধ কারবার ঠেকাতে সক্রিয় হয়েছে ক্যাম্পভিত্তিক সংগঠন মোহাজির রিহেবিলিটেশন ডেভেলপমেন্ট মুভমেন্ট (এমআরডিএম)। সংগঠনটির সভাপতি ওয়াসি আলম বশির জানান, প্রায় ১০ থেকে ১২ বছর আগে বাংলাদেশে আসার পর থেকে এসব কারবারে জড়িয়ে পড়ে রাজুর পুরো পরিবার। পান-সিগারেট বিক্রির দোকান থেকে রাজুর মা ও বাবা এসব ব্যবসা শুরু করে। এরপর রাজু ও তার ভাইদের পাশাপাশি একই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে রাজু ও তার ভাইদের স্ত্রীরা।

ওয়াসি বলেন, মা’দকসহ হাতেহাতে এই পরিবারটি ধরার জন্য আমরা দীর্ঘ সময় ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু এরা খুবই চালাক। এই পরিবারকে ক্যাম্প থেকে বের করতে আমরা তাদের ঘরে তালাও দিয়েছিলাম।

তথ্য না পাওয়া ও স্থান পরিবর্তনে অভিযানে সমস্যা: র‌্যাব

জেনেভা ক্যাম্পের কারকারিদের বেশিরভাগে এখন ক্যাম্পের বাইরে রয়েছে বলে তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আছে। র‌্যাব-২ এর কোম্পানি কমান্ডার মহিউদ্দিন ফারুকী বলেন, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে জেনেভা ক্যাম্পে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। এতে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। জেনেভা ক্যাম্প কেন্দ্র করে যারা এসবের ব্যবসা করে, যারা বিহারি এবং এখন আস্তে আস্তে বাংলাদেশে স্থায়ী হয়েছে, তারা এখন আর ক্যাম্পে থাকে না। কারণ এরা অঢেল টাকাপয়সার মালিক হয়েছে আমাদের কাছে এমনও তথ্য আছে। পাশাপাশি তারা ক্যাম্পের আশপাশে, বিভিন্ন জায়গায় থাকে।

জেনেভা ক্যাম্প থেকে তেমন তথ্য না পাওয়ায় এবং বারবার স্থান পরিবর্তন করার কারনে এ ধরনের অপরাধীদেরকে আইনের আওয়াত আনতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে উল্লেখ করে ফারুকী বলেন, এদের আসলে অবস্থানটা কী, আমরা জানার চেষ্টা করি। ক্যাম্প থেকেও আমরা তেমন তথ্য পাই না। আবার আমরা যখন অভিযানে যাই, তখন দেখা যায়, তার পরিবার এখানে থাকে, সে থাকে অন্য জায়গায়।

এর আগে ক্যাম্প থেকে ২ দফায় ৫ শতাধিক কারবারিকে আটক করা হয়েছে। এখনো যারা এসব কারবারের সাথে জড়িত রয়েছে তাদের ধরতে আগামী ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে উল্লেখ করে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, জেনেভা ক্যাম্পকে ব্যবহার করেও অনেকেই অ’বৈধ ব্যবসা করে। আগামী ২ থেকে ৩ মাসের মধ্যে অ্যাকশন প্ল্যান করে আমরা অগ্রসর হব। বাইরে থেকে এসব সরবরাহ করে, তাদের চিহ্নিত করা, খুচরা ডিলার চিহ্নিত করা, যারা সেবন করে এবং ডিলার এদের চিহ্নিত করা। এই ৩ ধাপে এসব অপরাধীদের চিহ্নিত করে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিব।

ঢাকাটাইমস

শেয়ার করুন !
  • 190
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!