তখন টাকা ছিল না, কিন্তু ক্রিকেট আমাদের হৃদয়ে ছিল: আকরাম

0

স্পোর্টস ডেস্ক:

১৯৯৪ সালের আইসিসি ট্রফিতে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ দলটি ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু স্বপ্নভ’ঙ্গ হয় দ্বিতীয় রাউন্ডে কেনিয়ার কাছে ১৩ রানে হেরে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে তখন ফুটবলের জয়জয়কার। ওই বছর আইসিসি ট্রফি থেকে ছিটকে যাওয়ার পর কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছিল ক্রিকেটার থেকে শুরু করে সংগঠকদের। ওই অবস্থায় ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি ক্রিকেটারদের জন্য অনেকটাই শেষ সুযোগ হয়ে সামনে আসে। পাহাড়সম চাপ নিয়েই বাংলাদেশ কেনিয়াকে হারিয়ে হয়ে যায় চ্যাম্পিয়ন।

এমন সাফল্যের পেছনে আকরাম খানের নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল অনেক বেশি। বিপ’র্যস্ত একটি দলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে তার অবদান বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ২০০৩ সালে মাঠের ক্রিকেট ছাড়লেও ক্রিকেট থেকে দূরে যাননি। ক্রিকেট ছাড়ার পর নির্বাচক কমিটির সদস্য হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এখন আছেন ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগে।

২৩ বছর আগে ঐতিহাসিক দিনটিতে ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলানোর ম্যাচটি নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান আকরাম খান।

প্রশ্ন: ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিতে খেলতে যাওয়ার আগের প্রেক্ষাপটটা জানতে চাই…

আকরাম খান: ক্রিকেট আসলে তখন অতটা জনপ্রিয়তা পায়নি। বাংলাদেশের দ্বিতীয় খেলা হিসেবে প্রচলিত ছিল। আমাদের ভালো সুযোগ এসেছিল ১৯৯৪ সালে। দলটাও ভালো ছিল। কিন্তু আমরা পারিনি। সত্যিকার অর্থে আমরা যেমন দল ছিলাম, ওই আসরে তেমনটা খেলতে পারিনি। এমনিতেই ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা কম, তার মধ্যে আমাদের ব্যর্থতা। সবমিলিয়ে ক্রিকেট নিয়ে সবার মধ্যেই হ’তাশা চলে এসেছিল। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি আমাদের জন্য খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। শেষ সুযোগের মতো আর কি..। সেখানে ভালো না করলে হয়তো বাংলাদেশ থেকে ক্রিকেটটাই উঠে যেত! তবে আমরা শেষ পর্যন্ত কোয়ালিফাই করে বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করি। আমি মনে করি আমাদের ক্রিকেট এই পর্যায়ে আসার পেছনে এই ট্রফির ভূমিকা অনেক। এখন ক্রিকেটে অনেক সুযোগ সুবিধা বেড়েছে। অনেক মাঠ হয়েছে, অনেক কিছু অর্জন হয়েছে। মাশরাফি, সাকিব, তামিম, মোস্তাফিজ, মুশফিকদের মতো অনেক খেলোয়াড় তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন: ব্যাট-গ্লাভস তুলে রাখলেও ক্রিকেট ছেড়ে যাননি, ২৩ বছর আগের এই অর্জন কতখানি তৃপ্তি দেয়?

আকরাম খান: খুবই ভালো লাগে। ক্রিকেট তো বাংলাদেশকে খুব বড় একটা পরিচয় দিয়েছে সারাবিশ্বে। বিশেষ করে ৫-৬ জন খেলোয়াড় এসেছে বিশ্বমানের। সাকিব, আশরাফুল, তামিম, মাশরাফি, মুশফিক, মোস্তাফিজদের ভক্ত পুরো বিশ্বেই এসেছে। এগুলোতো বড় অর্জন। আইসিসি ট্রফি জেতার পর বাংলাদেশের ক্রিকেটে জোয়ার এসেছে। এই জোয়ারেই কিন্তু এইসব ক্রিকেটার উঠে এসেছে। অফিসে বসে যখন এগুলো ভাবি, সত্যিকার অর্থেই দারুণ তৃপ্তি অনুভব করি। শুধু নিজের সময়ের জন্যই নয়, এখনকার খেলোয়াড়দের সাফল্যও আমাদের তৃপ্তি দেয়। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা, অনেক বড় বড় দলকে হারানো। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের অর্জনটা কম নয়।

প্রশ্ন: আইসিসি ট্রফির ফাইনালের আগে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে অধিনায়কোচিত ৬৮ রানের ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়েছিলেন। ওই ইনিংসটিকে আইসিসি ট্রফি জয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা হিসেবে দেখা হয়। সেই ম্যাচটি নিয়ে শুনতে চাই।

আকরাম খান: আমরা ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফির শুরু থেকেই ভালো খেলছিলাম। বৃষ্টির জন্য আমাদের একটি পয়েন্ট হারাতে হয়েছিল। ওই ম্যাচটি যদি টাই হতো, তাহলে আমরা কিন্তু সেমিফাইনালে কোয়ালিফাই করতাম না। আমাদের জিততেই হবে- এমন একটি সংকল্প নিয়ে আমরা মাঠে নেমেছিলাম। বোলিং-ফিল্ডিং আমাদের ভালোই হয়েছিল। কিন্তু ব্যাটিংয়ের শুরুতে আমরা ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলি। ওই হারা ম্যাচটি আমরা জিতে যাই শেষ পর্যন্ত। আমি ম্যাচ সেরা ইনিংস খেলেছিলাম। ওই ম্যাচে আমার খুব ভালো ব্যাটিং হয়েছিল।

প্রশ্ন: ওই ইনিংসটি কি আপনার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস?

আকরাম খান: খুব স্বাভাবিকভাবেই আমার ওই ইনিংসটার কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। আমার ক্যারিয়ারে অন্যতম সেরা ইনিংস হিসেবে এটা থাকবে। এই ইনিংসের কথা মনে পড়লে আমার গর্ব হয় যে, এমন একটা ইনিংস দেশের জন্য খেলতে পেরেছি। সত্যি কথা বলতে ওই জয়টা আসলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য প্রয়োজন ছিল।

প্রশ্ন: ১৯৯৭ সালের ১২ এপ্রিল আপনারা বৃষ্টির কারণে ব্যাটিং করতে পারেননি, সেই রাতটি কাটানো কতটা কঠিন ছিল?

আকরাম খান: খুব স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ হ’তাশ ছিলাম। ওরা অনেক বেশি রান করেছিল। সবার মধ্যে ভীষণ অ’স্থিরতা কাজ করছিল। স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে যেতে পারিনি। এর মধ্যে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল। ফলে মাঠের আউটফিল্ড আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। সবমিলিয়ে নানামুখী টেনশনে ঘুম হয়নি।

প্রশ্ন: শেষ ওভারে ১১ রান প্রয়োজন ছিল, ওই সময়ে ড্রেসিংরুমের আবহ নিয়ে বলুন…

আকরাম খান: ফাইনাল ম্যাচটি আমাদের সবার মনে আছে। আপনারা জানেন কেনিয়া শক্তিশালী দল ছিল। ওদের ব্যাটসম্যান-বোলাররাও উঁচু মানের। ওদের ফিজিক্যাল ফিটনেসও ভালো। ব্যাটিং করে ওরা প্রথম দিনে অনেক রান (২৪১) করেছিল। ২য় দিন বৃষ্টি থামার পর আমরা ব্যাটিং করি। কার্টেল ওভারে ১৬৬ রানের টার্গেট দাঁড়ায়। বৃষ্টি হওয়াতে মাঠের আউটফিল্ড স্লো হয়ে গিয়েছিল। তাই লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। শেষ ওভারে প্রয়োজন ১১ রান। এখন মনে হতে পারে এটা অনেক বড় কোনো লক্ষ্য নয়। কিন্তু তখনকার হিসেবে এটা অনেক বড় লক্ষ্যই। আমাদের পাইলট ও শান্ত খুব ভালো খেলেছে। পাইলট প্রথম বলে ৬ নিয়ে ম্যাচটি আমাদের দিকে নিয়ে এসেছে। পুরো টুর্নামেন্টটা আমরা টিম হিসেবে খেলতে পেরেছিলাম। দলের সবাই আমাকে সাহায্য করেছে। তাই অধিনায়ক হিসেবে কোনো চাপ অনুভব করিনি। টিম অফিসিয়ালরাও সাহায্য করেছে। আমাদের হয়তো টাকা ছিল না, কিন্তু সবাই হৃদয় দিয়ে ক্রিকেটকে ধারণ করতাম। এই কারণে আমরা সাফল্য পেয়েছিলাম।

প্রশ্ন: অধিনায়ক হিসেবে ট্রফি উঁচিয়ে ধরা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত উঁচিয়ে ধরেছেন- এমন দুটি বিখ্যাত ছবি আছে। কেমন লাগে ছবিগুলি দেখলে?

আকরাম খান: অনেক ভালো অনুভূতি। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই। এখন পর্যন্ত ক্রিকেটের যত ভালো ভালো অর্জন হয়েছে, সবখানে কোনো না কোনোভাবে আমি ছিলাম এবং আছি। অধিনায়ক হিসেবে ওই ট্রফিটা আমার হাতে উঠেছে। এটা আমার জন্য দারুণ প্রাপ্তির ব্যাপার। ধন্যবাদ আমার আম্মাকে। আম্মা সব সময় অনুপ্রেরণা দিতো। বলতো, ‘তোমাকে দিয়ে এমন কিছু হবে।’ তার কথায় সব সময় আত্মবিশ্বাস পেতাম। কেবল মাকেই নয়, ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীকে, তখন ক্রিকেট কিন্তু এত পরিচিত ছিল না। বাংলাদেশের প্রথম কোনো অর্জন। উনি যদি সংবর্ধনা না দিতেন, তাহলে হয়তো সবার মধ্যে আকর্ষণ জন্ম নিতো না। প্রায় ১ লাখ লোক হয়েছিল আমাদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। এর পর থেকে ক্রীড়াঙ্গনে ১ নম্বরে চলে আসে ক্রিকেট।

বাংলাট্রিবিউন

শেয়ার করুন !
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!