স্বাস্থ্য পরামর্শ: তলপেটের মেদ বাড়ছে? করণীয় জেনে নিন

0

স্বাস্থ্য বার্তা ডেস্ক:

তলপেটে মেদ সবচেয়ে বেশি বিপ’জ্জনক, অন্য যে কোনও স্থানের মেদের চেয়ে। নিতম্বের উরুতে মেদ জমার চেয়েও। তলপেটে মেদ জমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গুরুতর সব স্বাস্থ্য সমস্যা। যেমন- হৃদরোগ, স্ট্রোক ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস। বংশগতি বা জিন হয়ত মোটা হওয়ার সঙ্গে কিছুটা জড়িত, কোথায় মেদ জমবে এর সঙ্গেও। তবে সে সঙ্গে জীবন যাপন পদ্ধতি ত্রু’টিপূর্ণ হলে অবস্থা আরো খারাপ হয়।

কেবল প্রচুর মেদযুক্ত খাবার খেলে তলপেটে মেদ জমে তা নয়, মূল ব্যাপারটা হলো বাড়তি ক্যালরি, তা যে কোনো উৎস থেকেই হোক। বেশি ক্যালরি খেলে কোমরে, তলপেটে জমবে মেদ। তলপেটে মেদ জমার পেছনে একক কোনও কারণ নেই। বংশগতি বা জিন, বয়স, জীবন-যাপন সবারই থাকতে পারে ভূমিকা। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করলে তলপেটে মেদ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

ঘন চর্বি বাদ দিতে হবে, শর্করা কমাতে হবে, ফল ও সবজি খাওয়া বাড়াতে হবে। পরিমাণ কমাতে হবে আহারে প্রতি বেলার খাবারে।

বাড়তি ক্যালরি তা অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় হোক, কোমল পানীয় বা খাদ্যের বিশাল পরিমাণ থেকে হোক, সবই খারাপ। এগুলোই তলপেটে মেদ জমানোর পেছনে বড় কারণ। অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় থেকে আসা ক্যালরি কোমরের অংশকে স্ফীত করে। এছাড়া যেসব হরমোন আমাদের রসনা নিয়ন্ত্রণ করে, এদের উপর প্রভাব বিস্তার করে ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়। অনেক রকম চর্বি আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষ’তিকর হলো ট্রান্সফ্যাট।

গবেষকরা দেখেছেন, আংশিক হাইড্রোজিনেটেড তেল থেকে তৈরি এই ট্রান্সফ্যাট তলপেটে মেদ জমাতে সাহায্য করে এবং শরীরের অন্য অংশ থেকে মেদ এনে তলপেটে জমায়। কেক, পেস্ট্রি, বিদেশি বিস্কুট, মার্জারিন, ফাস্টফুড, কুকিজ, ক্র্যাকারস, ফ্রেষ্ণ ফ্রাই, তেলেভাজা খাবারে আছে ট্রান্সফ্যাট।

গ্রিন টি আর সে সঙ্গে ব্যায়াম চালিয়ে গেলে তা শরীরের ওজন কমাতে সাহায্য করে। গবেষকরা বলেন, গ্রিনটিতে ক্যাটেচিন বলে যে পদার্থ আছে, তা শরীরের ফ্যাট বার্ন করে। বিশেষত তলপেটের মেদ ঝরাতে সাহায্য করে। আবার ব্লুবেরি ধরনের ফলও খুব কাজে দেয় এক্ষেত্রে।

ফাস্টফুড খেলে তলপেটে মেদ হয়, সবাই জেনে গেছে এখন। কারণ ফাস্টফুডে আছে প্রচুর চর্বি, অনেক ক্যালরি। মানুষ এসব খাবার খায়ও বেশি। অনেকের ধারণা, সাধারণ কোমল পানীয়ের বদলে ডায়েট কোমল পানীয় পান করলে তলপেটে মেদ কমানো যায়। কথাটি ঠিক নয়। আমেরিকান হার্ট এসোসিয়েশনের মতে, কোমল পানীয়, শরবত ও অন্যান্য মিষ্টি পানীয় হলো চিনি গ্রহণের এক নম্বর উৎস। আর বাড়তি চিনি মানে বাড়তি ক্যালরি।

অথচ ওজন কমাতে ও তলপেটে মেদ ঝরাতে হলে বাড়তি ক্যালরি গ্রহণ কমাতে হবে প্রথমেই। কোমল পানীয়তে পরিশোধিত চিনির বদলে হাই ফ্রঙ্কটোজ কর্ন সিরাপ দেওয়া হচ্ছে ইদানীং। মেদবহুল শরীর তৈরীর পেছনে এর ভূমিকা সবচেয়ে বড়। আর এর বদলে ডায়েট সোডাও যে উপকারী, এর পক্ষে তেমন জোরালো কোনো তথ্য প্রমাণ নেই। তাই ডায়েট সোডাও বিকল্প নয়।

ঝরঝরে কোমরের অধিকারী হতে হলে খাদ্যে যোগ করতে হবে হোল গ্রেইন বা গোটা শস্য। সাদা চালের বদলে লাল চাল, ঢেঁকিছাঁটা চাল। ময়দার বদলে আটা, লাল আটা বা ছাতু। প্রক্রিয়াজাত খাবার বাদ দিতে হবে। খোসা বাকলসহ তরকারি খেতে হবে।

আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনে প্রকাশিত নিবন্ধে দেখা যায়, ক্যালরি নিয়ন্ত্রিত খাদ্য, গোটা শস্য সম্বৃদ্ধ খেলে কোমরে থলথলে মেদ পাতলা হয় সহজেই। পরিশোধিত শস্যের বদলে তাই গোটা শস্য খেতে হবে। স্প্যাগেটি, কর্নফ্লেক তৈরি হয় পরিশোধিত শস্য থেকে। অবশ্য এদের হোলগ্রেন অপশনও আছে। তবে পপকর্ন হলো হোল গ্রেন খাবার যাতে আছে প্রচুর ফাইবার বা আঁশ। গোটা শস্য বা হোল গ্রেইন ভালো এজন্য যে, এতে আছে প্রচুর আঁশ। যার ফলে এ শস্য পরিপাক হয় খুব ধীরে। এতে ক্ষুধার নিবৃত্তি হয় ভালো। রক্তের সুগার থাকে পরিমিত এবং মেদ জমেনা শরীরে।

মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের তলপেটে মেদ জমার প্রবণতা বেশি। যৌ’ন হরমোনের পার্থক্যের জন্যই এমন হয়। ৪০ বছরের আগে নারীদের মেদ জমার বেশি প্রবণতা হলো উরু ও নিতম্বে। ৪০-এর পর নারীদের হরমোন ইস্ট্রোজেনের মান নিম্নমুখী হয়। এর ফলে তলপেটে মেদ জমতে থাকে। তলপেটের মেদ ঝরানো যে খুব কঠিন কাজ, তা কিন্তু নয়। সুপরিকল্পিতভাবে ওজন কমানো গেলে মেদও ঝরবে। তলপেটেও মেদ কমবে। আর এজন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর আহার ও নিয়মিত ব্যায়াম এবং নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন।

বর্তমানে কর্মব্যস্ত জীবনে ব্যায়ামের জন্য সময় বের করা খুব কঠিন হয়ে গেছে। তবে এজন্য হ’তাশ হওয়ারও কিছু নাই। স্পট এক্সারসাইজ বা এক জায়গায় থেকে ব্যায়াম করা যেতে পারে। যেমন- উঠবস করা, ক্রাষ্ণেস, পেটের ব্যায়াম- এতে পেশি সবল হয়, মেদ কমাতে সহায়ক। তবে নির্দিষ্টভাবে মেদ তলপেটে থেকে ঝরাবে তা নয়। তলপেটে মেদ বা যে কোনও স্থানে চর্বি কমানোর মোক্ষম উপায় হলো স্বাস্থ্যকর আহার ও নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম। অ্যারোবিক ব্যায়াম, যেমন- দৌঁড়ানো, সাঁতার, সাইকেল চালানো, টেনিস খেলা বেশ উত্তম ব্যায়াম। তলপেটে মেদের সাথে বেশ কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা জড়িত। যেমন- হার্টব্লক, এথারোস্ক্লোরোসিসসহ অন্যান্য সমস্যা।

এসব ছাড়াও ওস্টিওপরোসিস, ডিমেনশিয়া, আলঝেইমার, ডায়াবেটিস, কলোরেক্টাল ক্যান্সার, মেটাবলিক সিনড্রোম, উচ্চ রক্তচাপও এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাই বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতে তলপেটের মেদ ঝরানোর জন্য যা করতে হবে, তা হচ্ছে- ক্যালরি মেপে খাবার খাওয়া। যা ফল, শাক সবজি, হোল গ্রেইন, লো ফ্যাটযুক্ত দুগ্ধজাত দ্রব্য, বীনস, বাদাম, বীজ, মাছ, লো কোলেস্টেরলযুক্ত মাংস, ডিম ও পোল্ট্রিজাত মাংস। এতে পাওয়া যাবে সব ধরনের পুষ্টি। যা কোমরের মেদ কমাতেও সহায়ক। সে সঙ্গে চালিয়ে যেতে হবে ৩০-৬০ মিনিট ব্যায়াম, প্রতি সপ্তাহে প্রতিদিন।

শেয়ার করুন !
  • 69
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!