মানবশরীরে সক্রিয় হতে করোনার সময় লেগেছে দীর্ঘ ৪০ বছর‍!

0

বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি ডেস্ক:

সারা বিশ্বের মানুষের ঘুম কেড়ে নিয়েছে করোনা ভাইরাস। হাজার হাজার মানুষ মা’রা যাচ্ছেন এই মারণ ভাইরাসে আক্রা’ন্ত হয়ে। এই ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখনো উদ্ভাবন হয়নি। এর উত্‍স নিয়ে বিজ্ঞানীমহলে মতভেদ রয়েছে। অনেক বিজ্ঞানীরাই এখনো এর উৎস নিয়ে একমত হতে পারেননি।

উহানের ‘ওয়েট মার্কেট’ থেকে যখন এই ভাইরাস ছড়ানোর কথা প্রথম সামনে আসে, বিজ্ঞানীরা দাবি করেছিলেন বন্যপ্রাণীর শরীর থেকেই এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। তাহলে এই বন্যপ্রাণী কী হতে পারে? অধিকাংশ বিজ্ঞানীর ধারণা, নয়া করোনা ভাইরাস অর্থাত্‍ সার্স-কভ-২ এসেছে বাদুড় থেকেই। আবার অনেকের মত, শুধু বাদুড় নয়, প্যাঙ্গোলিনও (বনরুই) এই ভাইরাসের অন্যতম বাহক।

বাদুড় ও প্যাঙ্গোলিন দুই প্রাণীর শরীরেই এমন ভাইরাল জিন মিলেছে যার সঙ্গে সার্স-কভ-২ এর সাদৃশ্য রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন আসে যে বাদুড় বা প্যাঙ্গোলিনই কি এই ভাইরাসের বাহক? সেটাও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি বিজ্ঞানীরা। কারণ বাদুড়ের শরীরে যে ভাইরাসের খোঁজ মিলেছে অর্থাত্‍ ব্যাট-কভ, তার থেকে সার্স-কভ-২ অনেকটাই আলাদা ও আরো বেশি সংক্রা’মক।

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, এক মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা খুব একটা সহজ নয়। এভাবে ছড়িয়ে পড়াতে অন্তত ৪০ বছর সময় লেগেছে এই ভাইরাসের।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, তার জন্য অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করে। প্রথমত, প্রত্যেক ভাইরাসেরই একটা স্বাভাবিক উত্‍স থাকে। সেটা যে কোনো প্রাণী হতে পারে। এবার সেই প্রাণীর শরীর থেকে মানুষের সংস্পর্শে আসা এবং মানুষের শরীরে নতুন বাহক কোষ খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত জটিল একটা প্রক্রিয়া। সেটা সব ভাইরাসের ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। দ্বিতীয়ত, মানুষের শরীরে যদি ভাইরাস ঢুকেই পড়ে, তাহলেও ক্রমাগত এক শরীর থেকে অন্য শরীরে ট্রান্সমিশন এতো দ্রুত সম্ভব নয়। সেটা কেন? তারও নানা কারণ আছে। আগে জানতে হবে ভাইরাস এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে ছড়ায় কীভাবে?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ধরা যাক বাদুড় হলো কোনো একটি ভাইরাসের উত্‍স। এখন সেই বাদুড়কে আগে মানুষের সংস্পর্শে আসতে হবে। সাধারণত দেখা যায় ভাইরাস তার অরিজিন বা বাহককে সংক্র’মিত করে না। বাদুড়ের থেকে ভাইরাস যখন মানুষের শরীরের সংস্পর্শে আসবে সে তখন চেষ্টা করবে নতুন বাহক কোষ খুঁজে বার করার। মানুষের দেহকোষের প্রোটিন যদি ভাইরাসের পছন্দ হয়, তাহলে ভাইরাল প্রোটিন তার সঙ্গে জোট বেঁধে কোষের মধ্যে ঢুকে পড়ে। এটা হলো এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতে ভাইরাসের ট্রান্সমিশনের প্রথম ধাপ।

হিউম্যান ট্রান্সমিশন কীভাবে হয়? তারও কয়েকটা পর্যায় আছে। প্রথমত, মানুষের শরীরে একবার ঢুকে পড়তে পারলে ভাইরাস চেষ্টা করে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে নিজের কব্জায় আনতে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের শরীরের সব অঙ্গকে কিন্তু ভাইরাস কব্জা করতে পারে না। কারণ সব দেহকোষে সে তার পছন্দের বাহক প্রোটিন খুঁজে পায় না। তাই দেখা যায় কোনো ভাইরাস হয়তো ফুসফুসকে আক্রা’ন্ত করে, আবার কোনো ভাইরাস কিডনি বা হার্টকে সংক্র’মিত করে।

দ্বিতীয়ত, যে অঙ্গকে ভাইরাস তার টার্গেট বানায় সেখানে সে তার প্রতিলিপি তৈরি করতে থাকে। অর্থাত্‍ সংখ্যায় বাড়তে থাকে। এবার তার কাজ হয় নতুন বাহক কোষ খুঁজে বের করা। তার জন্য এক মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করে। সেই সুযোগ যদি আসে তাহলে ভাইরাস সংক্র’মিত হতে শুরু করে। তবে তারও একটা নির্দিষ্ট সময় ও পদ্ধতি আছে। ভাইরাস যদি নিজেকে বদলাতে না পারে তাহলে একটা সময়ের পরে এই ট্রান্সমিশন থেমে যায়। ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরির ক্ষমতাও হারিয়ে যায়, ফলে দেখা যায় একটা পর্যায়ে গিয়ে সংক্র’মণ থেমে গেছে। যেমন, বার্ড ফ্লু-র ক্ষেত্রে হয়েছিল। পাখির শরীর থেকে মানুষের শরীরে ছড়িয়েছিল ভাইরাস, তবে বেশিদূর যেতে পারেনি। একটা সময়ের পরে সংক্র’মণ নিজ থেকেই থেমে গিয়েছিল।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা হলো সাধারণ ভাইরাসের চরিত্র। এবার যে ভাইরাস মহামা’রি আকার ধারণ করেছে সেই ভাইরাস সাধারণ নয়। নিজেকে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে নিয়েছে। করোনা ভাইরাস নতুন নয়, আগেও ছিল। অন্তত ৪০ থেকে ৭০ বছর আগে ব্যাট করোনা ভাইরাস ছিল। কিন্তু যে ভাইরাস মহামা’রি, সেটা কিন্তু ব্যাট করোনা নয়, সে সার্স-কভ-২। কাজেই এদের অরিজিনটা পুরনো, শুধু চরিত্রের বদল হয়েছে। সেটা কীভাবে?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিগত কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে ভাইরাস খুব দ্রুত তার চরিত্রের বদল ঘটাচ্ছে। অর্থাত্‍ নতুন নতুন বাহক খুঁজে বের করার জন্য সেই মতো জিনের গঠন বদলে ফেলছে খুব তাড়াতাড়ি। এটা শুরু হয়েছে ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্র’মণের সময় থেকেই। এই ভাইরাসের ৮টা জিনোম খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। দেখা গিয়েছিল, এই জিনোমগুলো নিজেদের মধ্যে একটা বন্ধন তৈরি করে ফেলছে। দুটি জিন মিলেমিশে গিয়ে নতুন ভাইরাল জিন তৈরি করছে। নতুন তৈরি হওয়া এই ভাইরাল জিন অনেক বেশি শক্তিশালী ও সংক্রা’মক। তার ট্রান্সমিশনের ক্ষমতা অনেক বেশি। সে আবার তার প্রতিলিপি তৈরি করছে। তাদের মধ্যেও আবার মিলমিশ হচ্ছে। ফের নতুন ভাইরাল জিন তৈরি হচ্ছে।

এইভাবে মিউটেশন বা জিনের গঠন বদলে বদলে ভাইরাস খুব দ্রুত সংক্র’মিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। একটা সময় মহামা’রির চেহারা নিচ্ছে। এই ভাইরাসের এতবার বদলের কারণে তার আসল অরিজিন বা ঠিক কোন ভাইরাল জিনোম থেকে বদলটা শুরু হয়েছিল সেটা ধরতেই পারছেন না বিজ্ঞানীরা। ঠিক এমনটাই হয়েছে সার্স-কভ-২ ভাইরাসের ক্ষেত্রেও।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন হতেই পারে ব্যাট-করোনাই বারে বারে জিনের গঠন বদলে এই চেহারা নিয়েছে। আবার নাও হতে পারে। সেক্ষেত্রে কোনো মধ্যবর্তী বাহক আছে। এই মধ্যবর্তী বাহক প্যাঙ্গোলিন হতে পারে। বাদুড়ের শরীর থেকে ভাইরাস প্যাঙ্গোলিনে ছড়িয়েছে, সেখানেই এর বদল হয়েছে। পরিবর্তিত সেই ভাইরাস মানুষে ছড়িয়েছে। তবে এই সবই বিজ্ঞানীদের অনুমান ও গবেষণার পর্যায়তেই রয়েছে।

সার্স-কভ-২ ভাইরাসের বদল কীভাবে হয়েছে, এই ভাইরাসের আসল উত্‍স কী, কেন এতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে তার সঠিক উত্তর এখনো অজানা। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, বন্যপ্রাণীদের আরো কাছাকাছি চলে আসা, জঙ্গল ধ্বং’স করে নগরসভ্যতার বিকাশ, খাদ্যাভাসে বদল, এমনই নানা কারণ রয়েছে সংক্রা’মক ভাইরাসদের মানুষের আরো কাছাকাছি চলে আসার। সচেতনতার অভাব ও অ’সংযমী জীবনযাত্রাই এই মহামা’রির অন্যতম বড় কারণ।

তবে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বার্ড ফ্লু-র মতো কি এই ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরির ক্ষমতা হারিয়ে যাবে? এই প্রশ্নর উত্তর এখনো বিজ্ঞানীরা খোঁজে পাননি। সময়ই হয়তো বলে দেবে।

সূত্র: দ্য ওয়াল, দ্য প্রিন্ট

শেয়ার করুন !
  • 758
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!