বাংলাদেশের রাজনীতির ক্যান্সার- চাটুকারগোষ্ঠী

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

একজন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান দেশ পরিচালনা করেন এবং দেশ পরিচালনা করতে গিয়ে তাকে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কাজ করে কিছু তথ্য-উপাত্ত। যদি এ তথ্য উপাত্ত সঠিক না হয় তাহলে সিদ্ধান্তটি হতে পারে ভুল। আর তার মাশুল দিতে হয় সরকারকে বা দেশকে বা সেই ক্ষমতাসীন দলকে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এ রকম ভুল কারণে সরকার প্রধানদের অনেক ক্ষ’তি হয়েছে এবং বাংলাদেশও অনেক পিছিয়ে গিয়েছে সামগ্রিক বিবেচনায়। এ রকম ভুল তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানকে বিভ্রা’ন্ত করার নজিরও বাংলাদেশে কম নয়। অনেকে বলেন, মিথ্যা দুই রকম, ডাহা মিথ্যা এবং পরিসংখ্যান। কাজেই অনেক সময় সরকার দলের কিছু চাটুকার গোষ্ঠী ভুল তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সরকারের মনঃতুষ্টির চেষ্টা করেন এবং চাটুকারিতা করতে চান। কিন্তু এতে লাভের চেয়ে ক্ষ’তি হয় বেশি।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখছি যে আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনাকে অনেক তথ্য দেয়া হচ্ছে করোনা সংক্রান্ত বিষয়ে, ত্রাণ সংক্রান্ত বিষয়ে, গরীব মানুষকে সহযোগিতা সংক্রান্ত বিষয়ে। তথ্যগুলোর কোনটা সত্যি কোনটা ভুল এবং কোনটা চাটুকারিতায় ভরা এ নিয়ে ইতিমধ্যেই গুঞ্জন চলছে। সেই গুঞ্জনে আমরা নাই বা গেলাম, আমরা দেখি যে, চাটুকারদের ভুল তথ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষ’তিগুলো হয়েছিলো, সেই ক্ষ’তিগুলোর দিকে আমরা একটু তাকাই।

১. তাজউদ্দীন ষড়’যন্ত্র করছেন(!)

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযু’দ্ধের পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। এই প্রত্যাবর্তনের পর তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে যান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্থানে ব’ন্দি ছিলেন তখন মুক্তিযু’দ্ধ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তার অনুপস্থিতিতে তাজউদ্দীন আহমেদসহ জাতীয় চার নেতা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পরই এক শ্রেণীর চাটুকার এবং স্বাধীনতাবিরো’ধীরা ষড়’যন্ত্র শুরু করে। তারা বঙ্গবন্ধুকে ভুল এবং অ’সত্য তথ্য দিয়ে কান ভারি করতে থাকে। এই অ’সত্য তথ্যের মুল উপজীব্য ছিল, তাজউদ্দীন ষড়’যন্ত্র করছেন। এই রকম ভুল তথ্যের ফলে এক সময় বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীনকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দেন এবং সরকারি ও দলের নীতিনির্ধারণী অবস্থান থেকেও তাজউদ্দীন সরে যান। এর মাশুল দিতে হয় পুরো জাতিকে। এই ষড়’যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠদের আলাদা করে ৭৫-এর ১৫ আগস্টের মত ম’র্মান্তিক ঘটনা ঘটায়।

২. মঞ্জুর ক্যু করতে চায়

৭৫-এর ১৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর স্বৈ’রাচারী জিয়াউর রহমান অ’বৈধভাবে ক্ষমতা দখ’ল করেন এবং হ’ত্যা, ক্যু ষড়’যন্ত্রের ধারায় তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান। তার ক্ষমতাসীন সময়ে তিনি একের পর এক ক্যু মোকাবেলা করেন এবং সামরিক – বেসামরিক কর্মকর্তাদের হ’ত্যা করে তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকেন। এ সময় জিয়াউর রহমানের চারপাশে গাঁটছড়া বাঁধে স্বাধীনতাবিরো’ধীরা এবং পাকিস্থান প্রত্যাগত সেনা কর্মকর্তাদের চাটুকারিতায় জিয়াউর রহমান বিভ্রা’ন্ত হন। এই সেনা কর্মকর্তারাই জিয়াউর রহমানকে বোঝান, জেনারেল মঞ্জুর- যিনি একজন বীর মুক্তিযো’দ্ধা, তিনি জিয়াউর রহমান এর বিরু’দ্ধে ষড়’যন্ত্র করছেন এবং জেনারেল মঞ্জুর ক্যু করতে চান। এই ভুল তথ্যে জিয়া তাকে চট্টগ্রামে পাঠান এবং মঞ্জুরের সাথে সম্পর্কে অব’নতি ঘটান। অনেকেই মনে করেন জিয়াউর রহমান হ’ত্যাকাণ্ডের পিছনে এই ভুল তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৩. বিরো’ধী দলের জনসভায় লোক হয়নি

হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদও জিয়াউর রহমানের কায়দায় অ’বৈধভাবে ক্ষমতা দখ’ল করেন, এরশাদের ক্ষমতা দখ’লকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় জোট এবং বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় জোট আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হতে থাকে এবং ১৯৮৮ সালের নির্বাচনের পর আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়।

এ সময় চাটুকাররা এরশাদকে বোঝান, বিরো’ধীদলে কোন জনসমাবেশ নেই। বিরো’ধীদলের জনসমাবেশে যখন লাখো মানুষের সমাগম হয় তখন গোয়েন্দা সংস্থা এবং চাটুকাররা এরশাদকে তথ্য দেন, এই সমাবেশে হাজারখানেক লোক হয়েছে, এজন্য এরশাদকে চরম মূল্য দিতে হয়। গণ আন্দোলনের মুখে স্বৈ’রাচারী এরশাদ সরকারের পত’ন ঘটে।

৪. জনগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় না

এরশাদের পত’নের পর নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে নাটকীয়ভাবে ক্ষমতায় আসেন বেগম খালেদা জিয়া। তিনি এসে ভোট কা’রচুপির এক নতুন নজির স্থাপন করেন, মাগুরা এবং মিরপুরের উপ-নির্বাচনে মানুষের ভোটের অধিকারকে পি’ষ্ট করে তিনি ভোট ব্যবস্থাকে কল’ঙ্কিত করেন। এ সময় নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবীতে আন্দোলন শুরু করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরো’ধী দল। সে সময় বেগম খালেদা জিয়াকে বোঝনো হয়, জনগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় না, বেগম খালেদা জিয়া সেই ভুল তথ্যে ঘোষণা দেন, পাগল ও ছাগল ছাড়া কেউই নিরপেক্ষ নয়। এর চরম মূল্য দিতে হয় বেগম জিয়াকে। তিনি ১৯৯৬ সালে গণ আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

৫. আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবে

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে এবং আওয়ামী লীগই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম দল যারা শান্তিপূর্ণভাবে একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ২০০১ সালে বিদায় নেয়।

বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুরু থেকেই বিএনপির সাথে আঁতাত করে ষড়’যন্ত্র শুরু করে এবং আওয়ামী লীগকে হারানোর নীলনক্সা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু করে। শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ধরপাকড় করা, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা দেওয়াসহ নানা রকম একতরফা সিদ্ধান্ত নিতে থাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এ সময় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতারা দলের সভাপতিকে বোঝান যে এই নির্বাচনে গিয়ে লাভ নেই, এই নির্বাচন কা’রচুপি এবং পরিকল্পিত নির্বাচন হচ্ছে, যার ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত। কিন্তু কিছু চাটুকার আওয়ামী লীগ সভাপতিকে বোঝান, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে এবং ভোটের দিনই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আওয়ামী লীগের পক্ষ গ্রহণ করবে। কিন্তু বাস্তবে এই ভুল তথ্যের জন্য আওয়ামী লীগকে চরম মূল্য দিতে হয়েছিল।

৬. মঈন আমাদের লোক

২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসে। বেগম জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বের সময় নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগের প্রশ্নে ৯ জনকে ডিঙিয়ে জেনারেল মঈন ইউ আহমেদকে সেনাপ্রধান করা হয়। সে সময় বেগম জিয়াকে তথ্য দেওয়া হয়, জেনারেল মঈন আমাদের লোক। এই তথ্যের চরম মাশুল দিতে হয় বেগম জিয়াকে। ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি কারাব’রণ করেন। এই ওয়ান ইলেভেন বিএনপিকে ছি’ন্নভিন্ন করে। যে মঈন ইউ আহমেদকে বিশ্বাস করে বেগম জিয়া সেনাপ্রধান করেছিলেন তিনিই বিএনপির সর্ব’নাশ করেন।

কাজেই সং’কটের সময় যে বা যারা তথ্যগুলো দিচ্ছে তা যাচাই বাছাই করার দায়িত্ব সরকার এবং রাষ্ট্রপ্রধানের। সঠিক তথ্য না পেলে যে কোনো বিপ’র্যয় হতে পারে, সেটাও মাথায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

শেয়ার করুন !
  • 115
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply