জনপ্রতিনিধিদের কারনে করোনাকালে রাজনীতির বেহাল দশা!

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

দেশ এখন টালমাটাল। বিএনপি- জামায়াত আর তথাকথিত সুশীল-সমাজের প্রতিনিধিরা দূরে বসে মিটিমিটি হাসছেন। কারণ, করোনা সং’কটকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় একটি নতুন বিত’র্ক তৈরি হয়েছে। এর কেন্দ্রস্থলে আছেন সিনিয়র রাজনীতিবিদ ও সিনিয়র আমলারা। কারণ করোনার শুরুতেই দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, বাণিজ্য এবং শ্রম মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার কথা গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে আলোচনায় এসেছে। তাছাড়া করোনা সংক্র’মণের শুরুতেই যখন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হলো, তারপরই গরীবদের খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি সকলের সামনে চলে এসেছে।

এ সময় দেখা গেল, তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিদের চাল-গম লোপাটের কাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশিত হতে শুরু করলো, এর ফলে রাজনীতিবিদরা সমালোচনার শি’কার হলেন। ইতোমধ্যে প্রতিটি জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৬৪টি জেলার জন্য ৬৪ জন সচিবকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন পর জেলার দায়িত্ব সচিবরা পেলেন, অতীতে জেলার দায়িত্ব মন্ত্রীরা পেতেন। এই সমস্ত উদ্যোগের ফলে কার্যত ৩০০ আসনের মন্ত্রী ও এমপিরা কর্মহীন বা একরকম ওএসডি হয়ে পড়েছেন। এমতাবস্থায় দেশের বিভিন্ন এলাকার তৃণমূলের (শহর বাদে) জনপ্রতিনিধিরা যা ভাবছেন, তার সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরা হল-

মূল ধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই দুর্যোগময় সময়ে জনপ্রতিনিধি মানেই যে চোর সেটা বুঝতে কারো বাকি নাই। অনেক বড় বড় রাজনীতিবিদও বলছেন, যারা চুরি করছেন তাদের বিরু’দ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে, ইত্যাদি ইত্যাদি। মন্ত্রীরা গিলেছেন বলে আমলাদের হাতে ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমলারা চুরি বা অ’ন্যায় কিছু করলে জনস্বার্থে দেশের অন্যত্র বদলি করা হবে। ভাবটা এমন, যেখানে বদলি করা হবে সেখানে কোন জনগণ নেই। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা এলাকা ছেড়ে যেতে পারেন না, রাজনীতিতে একটা ভুল মানে সারা জীবনের রাজনীতি শেষ। তাই পদ বাণিজ্য বা কমিটি বাণিজ্যের মাধ্যমে নমিনেশন নিয়ে যারা জনপ্রতিনিধি হয়েছেন, তারা ছাড়া কেউ চুরি করার কথা না।

ঢাকায় বসে কেউ আর্মি চাইছেন, কেউ আবার বিদ্যুৎ বিলের কথা বলছেন, নানান রকম অ’বান্তর কথা। কিন্তু কৃষকের ক্ষেতের টমাটো বিক্রি হচ্ছে না, তরমুজ বিক্রি নাই, এমন অনেক পচনশীল সবজির ক্রেতা নাই, সেদিকে কারো খবর নেই। পাইকারি ক্রেতারা পানির দামে কিনছেন এসব পণ্য। যশোরে ফুল চাষিরা শেষ হয়ে গেল তার কোন খবর নেই। অর্থকরী ফসলের দাম নেই, কারণ ক্রেতা নেই, থাকলেও তারা কৃষকদের ফাঁকি দিচ্ছেন। তা দেখার কেউ নেই প্রশাসনে; জনপ্রতিনিধি কিছু বললেই তারা হয়ে যান চাঁদা’বাজ, কোম্পানি আর আমলাদের আর্থিক ষড়’যন্ত্রে।

দেশের এই মহা-দুর্যোগের সময় মিডিয়ায় কোন পজেটিভ নিউজ চোখে পড়ে না। বলা হচ্ছে, সরকারে নির্দেশন মতে ঘরে ঘরে কেন পৌঁছানো হচ্ছে না। অনেক অ’সহায় মানুষ ত্রাণ পাননি, মে’রে খাওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগ আসলে কতটুকু সত্য? ১ ভাগ, ৫ ভাগ, ১০ ভাগ না আরও বেশি? যারা দোষারোপ করছেন তাদের সাথে প্রশাসনকে কিছু প্রশ্ন করতে চান তৃণমূলের জনপ্রতিনিধিগণ-

১। একটি ওয়ার্ডে গড় ভোটার ২,০০০ থেকে ৩,৫০০র মত। অ’সহায়ের সংখ্যা ৭০০ থেকে ১,০০০ কোথাও তার থেকে বেশি। এই করোনাতে নতুন করে কর্মহীন হয়ে পড়া অ’সহায়ের সংখ্যা নিতান্তই কম নয়। প্রতি ওয়ার্ডে ত্রাণ দিয়েছেন মাত্র ৫০ জনকে। সেটাও চলতি মাসের ৫ তারিখে দিয়েছেন। তার আগে পুরা ইউনিয়নে মাত্র ৬০ জনকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। আজ ২৫ তারিখ, বাকিদের কবে ত্রাণ দেওয়া হবে? যদি পর্যায়ক্রমে দেয়া হবে সেটা ঠিক আছে, কিন্তু এই পর্যায়ক্রমটা কত দিনের গ্যাপে? নাকি গ্যাপে কিছু দিয়েছেন সেটা জনপ্রতিনিধিরা মে’রে খেয়েছেন?

২। ৪৫০ প্যাকেট ত্রাণ রাতের অন্ধকারে বাড়ি বাড়ি পৌঁছাতে হবে। দিনের বেলা হলে লু’ট হয়েও যেতেও পারে। যদি প্রতি প্যাকেটে গড়ে ২০ টাকা করে পরিবহন খরচ হয় তাহলে ৪৫০X২০ = ৯,০০০ টাকা। এই খরচটা কি সরকারিভাবে দিচ্ছেন? না হলে জনপ্রতিনিধি মেম্বারকে মাসে কত টাকা সরকারিভাবে ভাতা দেওয়া হয়, এসব কাজে?

৩। নতুন করে যে তালিকা করতে বলা হয়েছে ৪৫০ জনের। তথ্য চাওয়া হয়েছে নাম, বাবা/ স্বামীর নাম, জাতিয় পরিচয়পত্রের নাম্বার, বাৎসরিক আয়, মোট কৃষি জমি, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, পেশা, ভাতাভোগী হলে ভাতার নাম, মন্তব্য, ইত্যাদি। এমন তথ্য সংগ্রহ করতে বিগত দিনে সরকারিভাবে কন্ট্রাক্টচুয়াল লোক নিয়োগ দেয়া হতো। কারণ এ তথ্য নিতে বাড়ি বাড়ি যাওয়া ছাড়া উপায় নাই। এজন্য কি আগের মত আলাদা খরচ দেয়া হবে কি? না হলে এ কাজ কে করবে, চোর জনপ্রতিনিধি?

৪। ৭ সদস্যের ওয়ার্ড কমিটি করা হয়েছে তালিকা করার জন্য। যেটা নিয়ে অনেকের মনে অনেক প্রশ্ন- চোরদেরকে দিয়ে কমিটি করা হচ্ছে। অথচ ওয়ার্ড কমিটির রুপরেখাঃ ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বর/ পৌরসভার কাউন্সিলর… আহ্বায়ক, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি, একজন প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক, একজন হাইস্কুল শিক্ষক, একজন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, একজন মসজিদের ইমাম। এখানে জনপ্রতিনিধি ১ জন বাকি ইমাম, শিক্ষক, সুশীল সবাই আছেন, এরাও কি চোর বলে আপনার মনে করেন? নাকি না জেনে না বুঝে চিলে কান নিয়ে গেছে বলে কানে হাত না দিয়ে চিলের পিছনে দৌড়াচ্ছেন?

এত কিছু বাদ দিয়ে আর্মি হলেই ভালো হয়। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করে ত্রাণ পৌঁছে দিবে। আর অ’সহায়ের মাল চুরির কথা সকল জনপ্রতিনিধিকে শুনতে হবে না ২/১ জন অ’মানুষের জন্য। জনপ্রতিনিধির মনে হয় আর দরকার নাই। এ দেশ তো মনে হয় আমলাতান্ত্রিক দেশ, কোন গণতান্ত্রিক দেশ নয় বলে কি মন্ত্রী মহোদয়য় মনে করেন?

৫। আগামীতে প্রতি ওয়ার্ডে ৫০ জনকে ত্রাণ দেওয়া হবে। কিন্তু এক ওয়ার্ডে বাস করে এলাকা ভেদে ৪/৫ হাজার লোক। সরকারী হিসেবেই প্রতিটি ওয়ার্ডে কত মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করেন, তার হিসাব কি মন্ত্রী মহোদয় আমলাদের কাছ থেকে নিয়েছে? তা গড়ে ঐ এলাকার মোট জনসংখার কত ভাগ? সারা দেশের দারিদ্রের চিত্র কি একই! কোনো কোনো এলাকায় ২/৩টি গ্রাম নিয়ে একটা ওয়ার্ড হয়। প্রথমবার ত্রাণের চালের সাথে তেল দেয়, ২য় দফায় দাম বেশি হওয়ার কারণে তেল বাদ গেছে বরাদ্দ কম বলে, এবার কোন আইটেম বাদ যাবে? কারণ চাল বাদে বাকি পণ্য বাইরে থেকে কিনতে হয় নগদ টাকায়। বাজারে সব জিনিসের দাম চড়া। সেখানে আছে মেম্বার চেয়ারম্যানদের হেরে যাওয়া মানে পরাজিত প্রতিনিধি, বিএনপি–জামায়াত জোটের মানুষ। দেখতে একই তেল ৩ দোকানে মান ভেদে ৩ রকমের দাম। সেটা সরকারিভাবে কিনে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। নাকি এটা মেম্বার চেয়ারম্যানদের হেরে যাওয়া প্রতিনিধি, বিএনপি–জামায়াত জোটের মানুষের দেওয়া অ’সত্য বা আধা সত্য তথ্যের ভিত্তিতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ফাঁ’দে ফেলে শা’য়েস্তা করার নতুন কৌশল?

মাঠ পর্যায়ে কিছু ভালোমানুষ আমলা ছাড়া ঢাকা বা শহরে বসে থাকা কিছু সিনিয়র রাজনীতিবিদ, সিনিয়র আমলার অনেকেই এই অবস্থা অনুমান করতেও পারেন না। তারা কি নিজের আয়ানায় নিজের না অন্য কারো চেহারা দেখেন! এভাবে দেশের পুরা রাজনীতি (সব রাজনৈতিক দলের) শেষ করে দিলে কি দেশ চালাতে পারবেন? যারা ওয়ার্ড লেভেলের জন্য ত্রাণের একটা গ্রহণযোগ্য লিস্টই করতেই তো পারছেন না, চোর জনপ্রতিনিধি ছাড়া, তারা দেশ চালাবেন! নিকট অতীতের কথা কি উনাদের মনে নাই? গ্রামের মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেলে তারা কিন্তু কোন কথা শোনেন না, কাউকে সম্মান দেখান না। এই মহামা’রী করোনা সং’কটকালে দেশের রাজনীতি আইসিইউতে ভরে দিলেন মন্ত্রী মহোদয়, একবারেও ভাবলেন না!

শেয়ার করুন !
  • 33
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!