যেভাবে বিশ্বজুড়ে বাসমতির বাজার দখ’ল নিতে যাচ্ছে বাংলামতি!

0

কৃষি বার্তা ডেস্ক:

বাংলাদেশ আরব আমিরাতকে বাংলাদেশের উদ্ভাবিত ব্রি-৫০ ধানের চাল বাংলামতি দিয়েছে। কিন্তু কেন এই বাংলামতি? কেন অন্য কোন ধান নয়?

সরু, লম্বা পাকিস্থানি বাসমতি চাল বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ভারতেও খুব ভাল মানের বাসমতি চাল উৎপন্ন হয়। তবে বাসমতির বাজারের বড় অংশ পাকিস্থানের দখ’লে। আরব বিশ্বে বিরিয়ানির জন্য তাই বাসমতির কোন বিকল্প নেই।

আমাদের দেশেও বাসমতি চাল পাওয়া যায়। তবে সেটা ২০০-২৫০ টাকা কেজি। এত দাম দিয়ে কিনে খাওয়া কঠিন। তবে কিছু বিরিয়ানির দোকানে এই বাসমতি চালের লম্বা ভাতের দেখা মেলে।

বাংলাদেশে এই জাতটি একদম ভাল হয়না। তাই চাইলেও আমরা এই জাতের চাষ করতে পারিনি। তাই বলে কি আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীরা চুপ করে বসে থাকবেন? সেটা হতে পারেনা।

আর এই অনুপ্রেরণা নিয়েই তারা তাদের ৫০ তম ধানের জাত আবিস্কার করেন, যার নাম দেন ব্রি-৫০। এই ব্রি-৫০ জাতের ধান এখন বাংলামতি (বাসমতির বাংলা সংস্করণ) নামে পরিচিত। দেশের বাজারে এই জাতের চাল এখন ৫৭-৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয় যেখানে পাকি বাসমতি ২৩০ টাকা করে কেজি বিক্রি হয়।

আমাদের উদ্ভাবিত ব্রি-৫০ বাসমতি থেকেও এগিয়ে। কারন বাংলামতি ধানে পোলাওর চালের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। যেটাকে আমরা বলি সুগন্ধী চাল। শুধু এখানেই শেষ নয়। এর আরো কিছু দিক তুলে ধরা দরকার।

বাংলাদেশে উৎপাদিত উৎকৃষ্টমানের ও সুগন্ধি সম্পন্ন বাংলামতি চাল দিয়ে পোলাও এবং বিরিয়ানি রান্না করা হয়। এ চালের ভাত আঠালো নয়। বাংলামতি উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের বোরো মৌসুমে বাংলামতি ধানের প্রথম বাণিজ্যিক চাষ হয়।

৪-৫টি জেলায় মাত্র ১০-১২ জন কৃষক এ ধান চাষ করেছেন। প্রথম বছরে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার মেছাঘোনা গ্রামের এক কৃষক এস এম আতিয়ার রহমান এই ধান চাষাবাদ করে একরে ৭ মন (প্রতি হেক্টরে ৭ মেট্রিক টন) পেয়েছেন। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০০৯-এর বোরো মৌসুমে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট যশোরে পরীক্ষামূলকভাবে এ ধানের চাষ করে সফল হয়।

পাকিস্থান ও ভারতে গড়ে হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদন ৩-৩.৫ টন। যেখানে বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ৪-৪.৫ টন। কিন্তু বাংলামতি ধানের উৎপাদন ৬ টনের বেশি।

পাকি বাসমতি ধানের সর্ব্বোচ্চ একরপ্রতি ফলন যেখানে ৩০-৪০ মণ, সেখানে বাংলাদেশের বাংলামতি ধানের একরপ্রতি ফলন ৭০-৮০ মণ। এখানে উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে ব্যাপকভাবে চাষকৃত ব্রি-২৮ ধানের চেয়েও এর ফলন বেশি। ব্রি-২৮ ধানের একরপ্রতি ফলন ৪৫-৫০ মণ।

বোরো মৌসুমে বাংলাদেশে সুগন্ধি ধানের জাত যেমন নেই, তেমনি চাষও হয় না বললেই চলে। বাংলদেশে সুগন্ধি ধান হিসেবে কালিজিরা, চিনি কানাই, ব্রি উদ্ভাবিত দুলাভোগ বা অন্য ২/৪টি জাত, যা চাষ হয় তার সবই আমন মৌসুমে। বাংলামতি ধান (ব্রি-৫০) সে অভাব পূরণ করবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলের ধারনা।

বাংলামতি ধান লম্বা এবং সরু হওয়ায় প্রচলিত রাইস মিলে মিলিং করলে চাল ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশে সর্বত্র এটা মিলিং করা যায়না। এই ধান রাবার রোল হলারযুক্ত অটো রাইস মিলে মিলিং করতে হবে, এতে চালের সুগন্ধি বজায় থাকে। আপাতত কুষ্টিয়ায় এটা করা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে কৃষি প্রযুক্তির উন্নতির কোন বিকল্প নেই। জমি কমছে। তাই খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করতে উফশী (উচ্চ ফলনশীল) ধান ছাড়া বিকল্প নেই। যেহেতু এই ধান ৬ টনের অধিক ফলন দেয় তাই বাংলাদেশের খাদ্য চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই ধান।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে সারা বিশ্বে ভারত এবং পাকিস্থানের বাসমতি চালের বাজার। কিন্তু আমরা এত ভাল ধান উৎপন্ন করলেও এ দেশের অনেক মানুষ এর সাথে পরিচিত নন। দাম কম হওয়া, ফলন বেশি, সুগন্ধিযুক্ত হওয়ার পরেও আমরা সারাবিশ্বের বাসমতি চালের বিশাল বাজার ধরতে পারছি না।

আরব আমিরাতের মত মধ্যপ্রাচ্যর দেশগুলোতে আমাদের এই চালের বাজার সৃষ্টি করতে হবে। বাসমতি চালের ৪ ভাগের ১ ভাগ দাম বাংলামতির। যদি সে দেশের মানুষদেরকে এই চালের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়, তবে ভবিষ্যতে বড় একটি বাজার আমাদের দখলে আসবে। আর এই কারনেই আরব আমিরাতকে আমরা বাংলামতি বা ব্রি-৫০ ধানের চাল উপহার দিয়েছি।

আরব আমিরাত আমাদেরকে পিপিই এবং ওষুধসামগ্রী সাহায্য হিসাবে পাঠিয়েছে, আমরাও পাঠিয়েছি। তবে যা পাঠিয়েছি, তা গভীরভাবে চিন্তা করলে আমাদের রপ্তানির নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে।

লেখক: ওয়াসি উদ্দিন মহিন

শেয়ার করুন !
  • 4K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply