ফিভার ক্লিনিকে একদিন || কোভিড-১৯ টেস্ট ও সম্পর্কিত জটিলতা

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিভার ক্লিনিক, কোভিড-১৯ এর জন্য মোটামুটি পারফেক্ট একটা ট্রায়াজ সেন্টার। আজ সাসপেক্টেড করোনা হিসাবে চিকিৎসা নিতে আসা প্রায় ৪০ জনকে চিকিৎসা প্রদান করি ও RT PCR for COVID-19 টেস্ট করাই। এখানে আসা রোগীদের মধ্যে একটা কমন প্যাটার্ন লক্ষ্য করলাম। সেই প্যাটার্ন হিসাবে এদের কিছু গ্রুপে যোগ করা যায়।

# প্রথম গ্রুপঃ (ক্রনিক রোগ ও লাইফ থ্রেটে থাকা রোগী)

এই গ্রুপের রোগীরা অধিকাংশই টার্মিনাল ইলনেসের। যেমন- ক্যান্সার রোগী, কিডনি ফেইলিওরের রোগী ও হার্টের রোগী। এই গ্রুপের অধিকাংশই তাদের মূল চিকিৎসক তাদের ক্রনিক রোগের চিকিৎসার আগে শিওর হতে চাইছে যে, তারা কোভিড-১৯ পজেটিভ না। ফলে তাদের জন্য এক্সট্রা বার্ডেন, কেমো নেবার আগে তাদের দূর দূরান্ত থেকে এখানে আসতে হয়েছে। এই গ্রুপের মধ্যেই রয়েছে কিছু পটেনশিয়াল লাইফ থ্রেটে থাকা রোগী। যেমন, একজন রোগী দেখলাম হার্ট ফেইলিওরের, সাথে শ্বাসক’ষ্ট থাকায় কোভিড-১৯ পজেটিভ কি না শিওর হইতে পাঠিয়েছে। এই ধরনের রোগী যে কোনো সময় মা’রা যেতে পারে। ইভেন টেস্টের জন্য লাইনে থাকা অবস্থায়ও। খোঁজ নিয়ে জানলাম ভোর ৩টা থেকে এখানে লাইনে দাঁড়াতে শুরু করে মানুষ।

জাস্ট ইমাজিন, একজন হার্ট ফেইলিওরের রোগী রাত ৩টার সময় টেস্টের জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছে, বেলা ১০-১১টায় ট্রায়াজ করে আমি কোভিড টেস্ট করতে দিচ্ছি, টেস্টের লাইনে বেলা ২টার সময় তার স্যাম্পল কালেকশন করা হলো। প্রায় ১২ ঘন্টা ভালনারেবল সময় কাটাচ্ছেন একজন লাইফ থ্রেটে থাকা রোগী। সম্ভবত, এদেরই মৃ’ত্যুর খবর দেখা যাচ্ছে প্রতিদিন টিভি মিডিয়ায়। যার ফলস্বরূপ চিকিৎসকদের উপর দায় চাপানো ও হেট স্পিচের বন্যা বইছে অনলাইন জুড়ে।

স্বাস্থ্যসেবার পলিসি মেকারদের অবশ্যই এই গ্রুপের রোগীদের জন্য বিকল্প পদ্ধতি বের করতে হবে টেস্ট করার জন্য।

# দ্বিতীয় গ্রুপঃ (ডাইরেক্ট / ইনডাইরেক্ট কন্টাক্ট)

এই গ্রুপটাও বেশ বড়। এই গ্রুপে রয়েছেন করোনা আক্রা’ন্ত ব্যাক্তির সন্তান থেকে ডাক্তার, পুলিশ, নার্সসহ নানা পেশাজীবী।

# তৃতীয় গ্রুপঃ (সম্ভাব্য করোনার লক্ষণ)

এই গ্রুপের রোগীরা জ্বর বা হালকা ঠান্ডা কাশির লক্ষণ নিয়ে আসছেন। যদিও অধিকাংশের লক্ষণ করোনার ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করে না। তবুও রাত ৩টা থেকে লাইনে দাঁড়ানো আর করোনার অনেক সম্ভাব্য লক্ষণের কথা চিন্তা করে এই দলের সবাইকেই টেস্ট সাজেস্ট করেছি।

কিন্ত এই গ্রুপের অধিকাংশেরই কোভিড টেস্ট ছাড়া অন্যান্য টেস্টের ব্যবস্থা থাকা উচিত। এদের টাইফয়েড, ডেঙ্গু বা জ্বরের লক্ষণ প্রকাশকারী অন্যান্য অসুখ থাকার সম্ভাবনা প্রবল।

# চতুর্থ গ্রুপঃ (বার্ডেন গ্রুপ)

এই গ্রুপে রয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, গার্মেন্টস, কোম্পানীর কর্মীরা। যাদের না আছে সম্ভাব্য লক্ষণ, না আছে কোন কন্ট্রাক্টের হিস্ট্রি। এদের কর্তৃপক্ষের দাবি, কাজে যোগদানের আগে তাদের করোনা নেগেটিভ তার ডকুমেন্ট উপস্থাপন করতে হবে। একটা RT PCR করতে সরকারের আর্থিক খরচ প্রায় ৩ হাজার, একই সাথে ম্যানপাওয়ার, রিসোর্স এগুলোর অপ’চয় করা যায় না জাস্ট তাদের সো কলড কর্তৃপক্ষের দাবি মেটাতে। এই গ্রুপের সাথে আমার বার্গেইন হয়েছে, অধিকাংশকে ফিরিয়ে দিয়েছি।

কিন্ত এদের কর্তৃপক্ষের সাথে প্রশাসনের সিদ্ধান্তে আসা উচিত। নইলে প্রতিদিন হয় হাজার হাজার মানুষকে হয়রা’নি হতে হবে, নতুবা রিসোর্সের অপ’চয় হবে।

# পঞ্চম গ্রুপ (আশার আলোয়)

এই গ্রুপের সবার কোভিড পজেটিভ হয়েছিল। ১৪-২০ দিন পর তারা রিটেস্ট করাতে আসছে। ভালো লাগছে এরা সবাই ভালো ছিল, খুব বেশি ওষুধ লাগেনি এবং এরা সাহস হারায়নি।

রোগীদের কথা বললাম। এবার নিজের কথা বলি। ৬/৭ ঘন্টা নাক মুখ চোখ বন্ধ। কয়েক মিনিট পরপর নিঃশ্বাসের কারনে ফেসশিল্ড ঘোলা হয়ে যাওয়া আর দূরে বসা রোগীর সাথে জোর গলায় কথা বলার ক’ষ্ট বেশ পী’ড়া দিচ্ছে। কান মনে হচ্ছিলো মাস্কের ফিতার টানে ছিঁড়ে যাবে, ভ’য়ে কানে হাত দিতে পারিনি। ব্যাথাটা আরো কয়দিন থাকবে। মাস্ক পিপিই বা প্রটেকশন গিয়ারের মান ও সাপ্লাই নিয়ে কিছু বলতে পারলাম না, বলতে মানা। যতটা সম্ভব ব্যাক্তিগত উদ্যোগে প্রটেকশন কমপ্লিট করার চেষ্টা করেছি। জগতে কে বা মা’রা যেতে চায়।


ছবি: ডা. এম সজীব উদ্দীন (স্বাধীন)

কবির ভাষায়,

তবুও তো পেঁচা জাগে; / গলিত স্থ’বির ব্যাঙ আরো দুই-মুহূর্তের ভিক্ষা মাগে / আরেকটি প্রভাতের ইশারায়—অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।

লেখক: ডাঃ এম সজীব উদ্দীন (স্বাধীন)
পরিচিতি: চিকিৎসক ও সোশ্যাল এক্টিভিস্ট

শেয়ার করুন !
  • 20
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply