ঘূর্ণিঝড় সন্নিকটে জেনেও আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে আগ্রহী নয় কেউ!

0

সময় এখন ডেস্ক:

করোনা পরিস্থিতির মধ্যেই ধেয়ে আসছে সুপার সাইক্লোন আম্ফান। এ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় গতকাল মঙ্গলবার বিকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হয়। বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষ’তি এড়াতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। জনসচেতনতা বাড়াতে চলছে মাইকিংসহ নানা প্রচার। প্রাণহা’নির হাত থেকে রক্ষায় উপকূলবাসীকে নেওয়া হচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্রে। কিন্তু ঝুঁ’কিপূর্ণ জেনেও ঘূর্ণিঝড় থেকে বাঁচতে বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে তেমন একটা আগ্রহী নন মানুষ।

জীর্ণ-শীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে তেমন লাভ নেই বলেও জানান দুর্গম এলাকার লোকজন। তা ছাড়া করোনার সময়ে সেখানে গিয়ে গাদাগাদি করে থাকতে হবে মনে করছেন তারা। এ কারণে লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। এ ছাড়া সেখানে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করাটাকেও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঝড় আসার আগেই বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেলে গবাদিপশুসহ মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাড়িঘর ফাঁকা দেখে এ সময় চোরের উপদ্রব হতে পারে বলে মনে করেন অনেকেই। তাছাড়া অনেক সময় দেখা যায়, ১০ নম্বর বিপদ সংকেত দেখা দিলেও ঝড় হয়ত শেষ মুহূর্তে দুর্বল হয়ে যায় অথবা ভারতের দিকে চলে যায়। তাই আবার ফিরে আসতে হয় বাড়িঘরে। এসব কারনেও অনেকে ঘরবাড়ি ছাড়তে চান না।

দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন তাদের এলাকার প্রস্তুতির খবর।

চট্টগ্রাম: ইতোমধ্যে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ আলাদাভাবে নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করেছে। গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় ৭ হাজার পুলিশ প্রস্তুত আছে।

চসিক নগরীর দামপাড়ায় নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন করেছে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন নিয়ন্ত্রণকক্ষে বসে নির্দেশনা দেন। চসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সুদীপ বসাক বলেন, উপকূলীয় এলাকার সব স্কুল খোলা রাখা হচ্ছে। শুকনো খাবারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সব কিছু প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এলাকায় মাইকিং চলছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, উপকূলীয় উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তাদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপকূল এলাকা থেকে মানুষ যাতে সরে যায় সে জন্য মাইকিং করা হচ্ছে।

কক্সবাজার: আম্ফানের প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে। মাছ ধরার বেশকিছু ট্রলার এখনো সাগর থেকে ফিরে আসেনি। উপকূলীয় এলাকার মানুষের মধ্যে আত’ঙ্ক বিরাজ করছে। ঝুঁ’কিতে রয়েছে উপকূলের বেড়িবাঁধগুলো। নিচু এলাকার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার জন্য মাইকিং চলছে। প্রস্তুত রয়েছে ৫৭৬টি আশ্রয়কেন্দ্র ও ২৫টি মুজিব কিল্লা।

কুতুবদিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান ফরিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, আমরা মঙ্গলবার বিকাল থেকে নিচু এলাকায় মাইকিং করছি মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে চলে আসার জন্য। কিন্তু কোনো মানুষ এখন পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে আসেনি।

বরগুনা: উপকূলীয় মানুষ প্রায় প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় দেখে দেখে যেন অভ্যস্ত। তাই নিজের জীর্ণ ঘর ছেড়ে সাইক্লোন শেল্টার যেতে তেমন একটা আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে না। এর ওপর সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে জেলায় বাড়ানো হয়েছে দেড় শতাধিক নতুন আশ্রয়কেন্দ্র।

জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান বলেন, ইতোমধ্যে ২৫ লাখ টাকা ও ২০ টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। ৫০৯টি আশ্রায়ণ কেন্দ্র রয়েছে, যা এরই মধ্যে প্রস্তুত। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য দেড় শতাধিক আশ্রয়কেন্দ্র বাড়ানোর হয়েছে।

সাতক্ষীরা: আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষ স্বেচ্চায় আসতে চাচ্ছেন না। তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে আনতে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। গতকাল দুপুর ১টা পর্যন্ত এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বলে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

সাতক্ষীরা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আবুল বাসেত জানান, জেলায় ১৪৫টি সাইক্লোন শেল্টার ও ১ হাজার ৭০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ও চেয়ারম্যানদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে যাতে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও সাবানের ব্যবহার নিশ্চত করা যায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।

বাগেরহাট: গতকাল সকালে জেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঘূর্ণিঝড় আঘা’ত হানলে ক্ষয়ক্ষ’তি যাতে কম হয় সে জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদ জানান, এবার করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ঘূর্ণিঝড় আঘা’ত হানতে যাওয়ায় জেলার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে আগের মতো লোক গাদাগাদি করে রাখা যাবে না। সবাইকে সামাজিক দূরত্ত বজায় রেখেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রাখতে হবে। এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে জেলার সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ইউপি চেয়ারম্যানদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বরিশাল: বিভাগীয় কমিশনার জানান, বরিশাল বিভাগে ৬ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ১১ লাখেরও বেশি মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় প্রায় ২ হাজার আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেখানে আড়াই লাখ মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে। এবার করোনার কারণে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।

ঝালকাঠি: সাধারণ মানুষের মধ্যে আম্ফান নিয়ে তেমন সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাইক্লোন শেল্টারে যাওয়ার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ এখন পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া শুরু করেনি।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভায় নদীবেষ্টিত উপকূলীয় জেলা ঝালকাঠিতে ঘূর্ণিঝড় আঘা’ত হানার আগেই শতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জেলা প্রসাশক মো. জোহর আলী। ইতোমধ্যে জেলার ২৭৪টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

চাঁদপুর: জেলা দুর্যোগ প্রতিরোধ কমিটি ও উপকূলীয় এলাকার জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে দুটি ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। চাঁদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, পদ্মা-মেঘনা নদী উপকূলীয় সদরের ৮টি, মতলব উত্তরের ৬টি ও হাইমচর উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের চরাঞ্চলের বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদে আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

পিরোজপুর: এলাকার মানুষ এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে যায়নি। করোনা ভাইরাস আত’ঙ্কের কারণে সাধারণ মানুষ সাইক্লোন শেল্টারে যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, সদস্য ও জনগণ। মঠবাড়িয়া উপজেলার মিরুখালী ইউনিয়নের বাসিন্দা জাকির তালুকদার বলেন, এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ দিয়ে অনেক লোক ঈদের জন্য বাড়িতে এসেছে। ঝড় শুরু হলে সবাই তো এক সাইক্লোন শেল্টারে যাবে। সেখানে সামাজিক নিরাপত্তা থাকবে না বলে তারা আত’ঙ্কে রয়েছেন। এ কারণে অনেকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চাচ্ছেন না।

পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন জানান, ৭টি উপজেলায় ৫৫৭টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো থাকার উপযুক্ত করা হয়েছে। সেখানে যথাযথভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ, পানির ব্যবস্থা ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ইন্দুরকানী: উপকূলীয় উপজেলা ইন্দুরকানীতে লক্ষাধিক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। এ উপজেলাবাসীর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সাইক্লোন শেল্টার নেই। তবে উপজেলায় ১৯টি স্কুল কাম শেল্টারকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

হাতিয়া: নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে সেসব এলাকার বাসিন্দারা আত’ঙ্কে রয়েছে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা হয়।

চরফ্যাশন: উপজেলার বিচ্ছিন্ন ঢালচরের ৫ হাজার আশ্রয়হীন মানুষকে দক্ষিণ আইচা থানার ৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে কোস্টগার্ড চরমানিকা বিসিজি। সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহীন মাহমুদ জানান, ঢালচরে কোনো বেড়িবাঁধ না থাকায় ঝুঁ’কিপূর্ণ বিবেচনা করে ১১টি ট্রলারের সাহায্যে কোস্টগার্ড, পুলিশ উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে।

শেয়ার করুন !
  • 73
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!