রিস্টব্যান্ড নিলামে তুলে বাউল রণেশ ঠাকুরকে ১ লক্ষ টাকা দিলেন অমি রহমান পিয়াল

0

সময় এখন ডেস্ক:

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার প্রয়াত বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের শিষ্য রণেশ ঠাকুরের উজান ধলের বাড়ির আসরঘরে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেয় দু’র্বৃত্তরা। গত ১৭ মে, রবিবার রাতের সেই ঘটনায় বাউল সাধকের বাদ্যযন্ত্রসহ বিগত ৪০ বছরে রচিত ও সংগৃহীত বাংলার লোকজ গান এবং সাহিত্য সংস্কৃতির অমূল্য সব পাণ্ডুলিপি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে সারাদেশে এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বাংলা সাহিত্য, সঙ্গীত ও সংস্কৃতি অনুরাগী মানুষজন জানান তীব্র প্র’তিক্রিয়া।

ক্ষ’তিগ্রস্থ এই বাউল সাধকের পাশে এগিয়ে আসেন এক চির তরুণ- অমি রহমান পিয়াল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযু’দ্ধ এবং ইতিহাস বি’কৃতি ও প্রপাগান্ডার মচ্ছবে মুক্তিযু’দ্ধের সঠিক ইতিহাস হারিয়ে যেতে বসে। এমন পরিস্থিতিতে যে ক’জন তরুণ এগিয়ে আসেন নিঃস্বার্থভাবে, তাদের একজন অমি রহমান পিয়াল। ক্যারিয়ারের ভাবনা ফেলে রেখে নিজের জীবনের বড় অংশটা তিনি কাটিয়ে দেন মুক্তিযু’দ্ধের হারিয়ে যাওয়া ও চেপে দেয়া ইতিহাসের সন্ধানে।

বাংলা ব্লগ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্রমাগত লিখে গেছেন তিনি গবেষণালব্ধ তথ্য উপাত্ত সমৃদ্ধ ইতিহাস। যার সাথে তীব্রতর হতে থাকে যু’দ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীও। ২০০৫ সালে অমি রহমান পিয়াল যু’দ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবির এক দৃঢ় চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় হাতে ধারণ করেন একটি রিস্টব্যান্ড। বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম এই সংগঠক বলেন, যু’দ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হওয়া পর্যন্ত এই রিস্টব্যান্ড হাতে থাকবে। এ নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এপি (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস) একটি ফটো স্টোরিও করে সে সময়।

দেশে বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতিতে সুইজারল্যান্ড প্রবাসী ব্লগার, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক, লেখক অমি রহমান পিয়াল তার রিস্টব্যান্ডটি নিলামে তোলেন। প্রাপ্ত অর্থ করোনা দুর্গতদের জন্য সহায়তার উদ্দেশ্যে। কিন্তু বাউল রণেশ ঠাকুরের ঘটনায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তত করেন। তিনি ঘোষণা দেন, এই রিস্টব্যান্ড বিক্রির অর্থ সহায়তা হিসেবে দেবেন বাউলকে। তখন এর কোনো ভিত্তিমূল্য ছিল না। তবে বন্ধুদের পরামর্শে এর ভিত্তিমূল্য নির্ধারিত হয় ৫০ হাজার টাকা। নিলামের সময়সীমা নির্ধারত হয় ১ দিন। এরপর সেই রিস্টব্যান্ডটি ১ লক্ষ টাকায় কিনে নেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী চিকিৎসক এবং অমি রহমান পিয়ালের সাথে একই মেডিকেলে পড়ুয়া ডা. ফেরদৌস খন্দকার। নিলামে প্রাপ্ত অর্থ অমি রহমান পিয়ালের ঘোষণা অনুযায়ী পাঠিয়ে দেয়া হয় বাউল রণেশ ঠাকুরের কাছে। সেই অর্থ গ্রহণ করেন বাউল কন্যা জুঁই ঠাকুর নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে।

অমি রহমান পিয়াল উপায় খুঁজছিলেন কীভাবে এই অর্থ সাহায্য সরাসরি বাউলের কাছে পৌঁছানো যায়। পরে বাউল কন্যার সাথে যোগাযোগ হয় এবং তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১ লক্ষ টাকা পাঠিয়ে দেন রিস্টব্যান্ডের ক্রেতা ডা. ফেরদৌস খন্দকার নিজেই। আর রিস্টব্যান্ডটি নিজে গ্রহণ না করে সেটি অমি রহমান পিয়ালকে উপহার হিসেবে নিজের কাছে রেখে দেয়ার অনুরোধ করেন।


ছবি: প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সেই রিস্টব্যান্ড

বাউল পরিবারের পাশে ঘোষণা অনুযায়ী অর্থ সাহায্য পৌঁছে দিতে পেরে উচ্ছ্বসিত অমি রহমান পিয়াল ফেসবুকে লিখেছেন,

‘প্রতিজ্ঞা পূরণ করলাম। প্রতিশ্রুতি রাখলাম। সুনামগঞ্জের বাউল রণেশ ঠাকুরের সম্মানে এক লক্ষ টাকা বিপদকালীন উপহার দিবো বলছিলাম। একটু আগে নিশ্চিত হইলাম তার কন্যা জুই ঠাকুরের একাউন্টে এক লক্ষ টাকা পাঠানো হইছে। তিনি সেটা পাইছেন। পুরা ব্যাপারটায় আসলে আমার কোনো কৃতিত্ব নাই, পুরাটাই আমার সেই ল’ড়াইয়ের মেমোয়ার কেনা ছোট ভাই ডাঃ Ferdous Khandker এর। আমি স্রেফ উছিলা মাত্র। আমি ডাক দিছি ও সেই ক্যাম্পাসকালীন সময়ের মতোই বিনাপ্রশ্নে কোনো কথা ছাড়াই পাশে আইসা দাড়াইছে। ওরে ধন্যবাদ দিয়া ছোট করবো না, তবে এখনও আমার উপর আস্থা রাখে এই বিশ্বাসটার জন্য কৃতজ্ঞতা তারে। করোনা দূর্গতদের জন্য সরকারী সাহায্য আছে, প্রচুর মানুষ নিজের উদ্যোগেও সাহায্য করতেছেন, পোলাপাইন দিনরাত খাটতেছে। বাউলরা আমাদের আবহমান সংস্কৃতির অংশ। তাদের পাশে কেউ নাই। কতরাত কাটছে আমার শাহ আবদুল করিমের গানে। এইটা ক্ষুদ্র সামর্থে ক্ষুদ্র প্রতিদান। যারা এই বিষয়টায় আমারে সবরকম তথ্য এবং অন্যভাবে সহযোগিতা করছেন তাদের সবাইকেও ধন্যবাদ…’

এ বিষয়ে বাউল রণেশ ঠাকুর গণমাধ্যমকে বলেন, বৃহস্পতিবার আমার মেয়ের অ্যাকাউন্টে ১ লক্ষ টাকা এসেছে। যারা আমার বিপদে এই সহযোগিতা করেছেন তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমি জানিনা তারা কেন আমাকে ভালোবাসেন। তাদের এই ভালোবাসা মাথায় নিয়ে আমি আবার দোতারায় সুর তুলব। গানে গানে আমার প্র’তিবাদ জারি রাখব।

এই সুর সাধক বলেন, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম আমার গুরুভাই ছিলেন। তিনি যেভাবে মানুষের অধিকার আদায়ের কথা গানে সুরে বলেছেন, আমিও তার কথা ও গানে এই প্র’তিবাদের দ্বারা অ’ব্যাহত রাখব। মানুষের কথা বলব গানে গানে। দেশ বিদেশের যারা আমার দুঃসময়ে পাশে দাড়িয়েছেন, প্র’তিবাদ করছেন আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।

এদিকে আগুন লাগার ঘটনার পর বাউল রণেশ ঠাকুর বাদী হয়ে দিরাই থানায় মামলা করলে বুধবার দুপুরের অভিযান চালিয়ে ফরহাদ নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ফরহাদ মিয়া (২৫) উজান ধল গ্রামের এলাম উদ্দিনের ছেলে।

ক্ষ’তিগ্রস্ত বাউল রণেশ ঠাকুরের পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসনও। জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল আহাদ উজানধল গ্রামে আগুনে পুড়ে যাওয়া গানের ঘর পরিদর্শন শেষে টেউটিনসহ আর্থিকভাবে সহায়তা করেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, রণেশ ঠাকুরের ঘরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের সুষ্ঠু শনাক্তকরণের জন্য পুলিশ সুপারকে অনুরোধ করা হয়েছে। আমি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। বাউল রণেশ ঠাকুরকে গানের ঘর নির্মাণের জন্য ৩ বান ঢেউটিন ও আর্থিক সাহায্য দেয়া হয়েছে।

দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কে এম নজরুল ইসলাম জানান, রনেশ ঠাকুর নিজে বাদী হয়ে মঙ্গলবার রাতে মামলা করার পর পুলিশ গ্রামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে জানান তিনি।

শেয়ার করুন !
  • 1.9K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply