‘যা হবে, হোক, কিছু করার নেই’- করোনা প্রতিরোধে হাল ছেড়ে দিলো বাংলাদেশ?

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি ক্রমশ নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। চিকিৎসক এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা মোকাবেলায় আমাদের সামনে যে শেষ সুযোগটি ছিল সেটাও আমরা হাতছাড়া করে ফেলছি। এর ফলে বাংলাদেশে যে করোনা পরিস্থিতি ভ’য়ঙ্কর আকার ধারণ করবে সেটা বোধহয় আমরা উপলব্ধি করতে পারছি না। বাংলাদেশে করোনা মোকাবেলার পদ্ধতি এক ধরনের দায়সারা গোছে এগোচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন, বাংলাদেশ হয়তো করোনা মোকাবেলায় হাল ছেড়ে দিয়েছে।

যা হবে- হবে, নিয়তির হাতে সমর্পণ করে বাংলাদেশ নির্লিপ্ত থাকার কৌশলই সম্ভবত গ্রহণ করেছে। আর একারনেই ঈদের ছুটিতে লাগামহীনভাবে মানুষ ছোটাছুটি করছে, গ্রামে-গঞ্জে যাচ্ছে, দোকানপাট খুলে দেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ হয়তো করোনার পরিণতি কী হবে তা এখন ভাবতেও চায় না, অনুমানও করতে চায় না। বরং ঈদের পরে করোনার কারণে লকডাউন থাকবে কি না- সিদ্ধান্তগুলোকেও স্থ’গিত রেখে এখন ঈদ উৎসব আয়োজনে মনোযোগ দিয়েছে।

অথচ বাংলাদেশ যখন মানুষের চলাফেরার উপর শিথিলতা আরোপ করেছে, তখন গত ১ সপ্তাহে টানা প্রতিদিন ১৫শ এর উপর করোনা শনাক্ত হয়েছে এবং প্রতিদিন ২০ জনের উপর মৃ’ত্যুবরণ করেছে। আজ সর্বোচ্চ ২৮ জন মৃ’ত্যুবরণ করেছে। এই সপ্তাহের শুরুতে (২৩ মে) ২০ জনের মৃ’ত্যু দিয়ে শুরু হয়েছিল এবং সপ্তাহের শেষে এসে আজ ২৮ জনের মৃ’ত্যু সংবাদ পাওয়া গেল। অর্থাৎ এই ১ সপ্তাহে দেড়শ জন মা’রা গেছেন। অনেকে বলছেন, আক্রা’ন্ত কম দেখানোর চেষ্টা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। গত ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষার শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৮০৯ জন।

যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন অন্তত নূন্যতম ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার পরীক্ষা করা উচিত। সেখানে এখন পর্যন্ত ৭৭ দিনে এখন পর্যন্ত মাত্র ২ দিন ১০ হাজারের বেশি পরীক্ষা করা হয়েছে। বেশি পরীক্ষা হলেই রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায় এবং তখন যেন জনমনে আত’ঙ্ক তৈরি না হয়- সেজন্যেই হয়তো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই কৌশল নিয়েছে। কিন্তু আজ ৮ হাজার ৮০৯ জনের পরীক্ষায় ১ হাজার ৫৩২ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে, অর্থাৎ ১৭ শতাংশের বেশি এবং গত কিছুদিন ধরেই ১৭ শতাংশের বেশি হারে স্থিতিশীলভাবে করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে। এটা যদি স্থিতিশীলভাবে ১৭ শতাংশ করে করোনা শনাক্ত হয়, তবে সেটা ভ’য়াবহ এক চিত্র।

এখন বাংলাদেশে যেহেতু ২ লাখের বেশি পরীক্ষা করে হয়েছে, কাজেই এখন যে তথ্য-উপাত্তগুলো পাওয়া যাবে সেগুলো পুরো দেশের প্রতিনিধিত্বশীল বলে মনে করা হচ্ছে। যদি বাংলাদেশে ১৭ শতাংশ না হয়ে ১৫ শতাংশ মানুষও করোনায় আক্রা’ন্ত হয়, তাহলেও সেটা বাংলাদেশের জন্য এক ভ’য়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করবে। সেটা চিন্তা করেও অনেক বিশেষজ্ঞ আঁৎকে উঠছেন। তবুও বাংলাদেশ তাঁর নিজস্ব পথেই চলছে।

আমাদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু করার জন্য প্রথম স’র্বনাশটি করা হয়েছিল গার্মেন্টস সেক্টরগুলো খুলে দিয়ে। দ্বিতীয়টি ঘটে যখন গার্মেন্টস শ্রমিকরা বেতনের দাবিতে রাস্তায় নামে। তৃতীয়টি হলো- যখন দোকানপাট, শপিং মল খোলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। চুতর্থত- যখন লোকজনকে ঢাকার বাইরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো, বলা হলো যে গণপরিবহন নয়; ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ঢাকার বাইরে যাওয়া যাবে। কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হলো তখন, যখন বলা হলো, আমরা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াচ্ছি না, হাসপাতালে সেবার মান বাড়াচ্ছি না এবং আমরা গুরুতর অসুস্থ করোনা রোগীদের চিকিৎসা কীভাবে করবো তারও কোন ব্যবস্থা করছি না।

এভাবেই দেশের করোনা পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আমরা যদি চেষ্টা করতাম, তাহলে হয়তো এই পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারতাম। এখন যেভাবে সবকিছু চলছে তাতে মনে হচ্ছে বাংলাদেশ হাল ছেড়ে দিচ্ছে। এর পেছনে আরেকটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। গত কয়েকদিনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে আমরা দেখিনি, স্বাস্থ্য সচিব তো দীর্ঘদিন ধরেই গণমাধ্যমে আসছেন না। একজন অতিরিক্ত সচিবকে কথা বলার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মিডিয়া সেলের প্রধান করে, তিনিও এখন আসছেন না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেন মুখে কুলুপ এঁটেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করোনায় আক্রা’ন্ত হয়ে হাসপাতালে আর অতিরিক্ত মহাপরিচালক এসব একাই সামলাচ্ছেন।

এরকম একটি বৈশ্বিক মহামা’রি যখন বাংলাদেশের তা’ণ্ডব চালাচ্ছে, তখন আমরা ঈদ আনন্দ উদযাপনের অপেক্ষায় রয়েছি। হাজার-হাজার মানুষ গাদাগাদি করে গ্রামে যাচ্ছি। এই পরিস্থিতিতে একটি কথাই বলা যায়, আমরা নিয়তির উপরেই সব ছেড়ে দিয়েছি। কাজেই দেখা যাক নিয়তি করোনা নিয়ে বাংলাদেশের ভাগ্যে কী লিখেছে।

শেয়ার করুন !
  • 669
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!