কেন সর্বত্র এমন সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্তহীনতা?

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

করোনা মোকাবেলায় সরকারের সমন্বয়হীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সরকারের এক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অন্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় নেই, একটি বিভাগের সিদ্ধান্ত জানে এ সংক্রান্ত অন্য বিভাগগুলো, অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন, কখনও পরস্পরবিরো’ধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ- এর ফলে সিদ্ধান্তহীনতা ক্রমশঃ স্পষ্ট হচ্ছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সমন্বয়হীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে করোনা পরিস্থিতির সঠিক পরিকল্পনা এবং সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারছে না, পরিস্থিতি ক্রমশঃ জটিল হয়ে যাচ্ছে। শুরু থেকেই বলা হচ্ছিল, করোনা একক কোন মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়, এজন্য সরকারকে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমেই করোনা মোকাবেলা করতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে যে, সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা প্রচুর এবং দিনদিন তা বাড়ছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অ’স্থিরতাও লক্ষণীয়। আমরা যদি সিদ্ধান্তহীনতার বিষয়গুলো দেখি তাহলে দেখা যাবে-

১. জাতীয় কমিটির সাথে সরকারের সমন্বয় নেই

করোনা মোকাবেলার জন্য শুরু থেকেই একটি জাতীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। জাতীয় কমিটির প্রধান হলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি নিজেই বলেছেন, সরকারের অনেক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি নিজেই অন্ধকারে রয়েছেন, তিনি কিছুই জানেন না। যখন গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, তখন তা জাতীয় কমিটির সাথে আলাপ-আলোচনা না করেই খুলে দেয়া হয়। এছাড়া সীমিত আকারে সরকারি অফিস-আদালত খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তও জাতীয় কমিটিতে আলোচনা হয়নি বলে জানানো হয়েছে। এমন অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে, যা জাতীয় কমিটি জানে না। সরকারের সঙ্গে জাতীয় কমিটির সমন্বয়হীনতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা হচ্ছে।

একাধিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, সব সিদ্ধান্ত জাতীয় কমিটির মাধ্যমেই হওয়া উচিত। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মন্ত্রীপরিষদ বিভাগ বা জনপ্রশাসন বিভাগ তাদের মতো করে ছুটি দিচ্ছে এবং ছুটির যে নির্দেশনা সেটাও তাদের মতো করে দিচ্ছে। এই সমন্বয়হীনতার কারণে করোনা মোকাবেলার পদক্ষেপগুলো কার্যকর হচ্ছে না. মনে করেন অনেকে।

২. মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে নেই অধিদপ্তরের সমন্বয়

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতাও করোনার সময় খুব জোরেশোরে আলোচনায় এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আইসোলেশনে যাওয়ার আগে তার সাথে মন্ত্রণালয়ের সম্পর্ক শীতল ছিল বলে জানা যায়। এমনকি মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে সচিবের সম্পর্ক নিয়েও অনেক কথা শোনা যায়। এসব কারণেই অতিরিক্ত সচিব প্রশাসনের উপর মন্ত্রী নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এরকম অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে অধিদপ্তর থেকে যেগুলো পরবর্তীতে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে- তারা জানে না। বিশেষ করে পিপিই বিষয়ে দেয়া মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অ’গ্রাহ্য করেছে। আবার সচিব বলেছেন, তিনি এ সম্পর্কে কিছু জানতেন না। এছাড়া পিপিই নিয়েও যে ঘটনাটা ঘটেছে, তাও মন্ত্রণালয়ের অ’গোচরে ঘটেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের ভেতর সমন্বয়হীনতার কথা বারবার আলোচিত হয়েছে।

৩. পরামর্শক কমিটির সাথে সমন্বয় নেই সরকারের মন্ত্রণালয়ের

করোনা মোকাবেলার জন্য একটি টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে বিএমডিসির সভাপতির নেতৃত্বে। কিন্তু সেই টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সাথে সরকারের কোন সমন্বয় নেই, সরকারের নীতিনির্ধারকরা এই কমিটির সাথে আলোচনাতেও বসেনি। টেকনিক্যাল কমিটি ঈদের জন্য দোকানপাট খুলে দেয়া, অফিস-আদালত খোলা বা গার্মেন্টস খোলার ব্যাপারে নে’তিবাচক অবস্থানে ছিল। কিন্তু তাদের এই পরামর্শকে পাত্তা দেয়নি সরকার ও মন্ত্রণালয়। এমন সমন্বয়হীনতার কারণে করোনা সমস্যা বাড়ছে।

৪. স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় নেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা শুরু থেকেই প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, আমি লোকজনকে ঘরে থাকতে বলতে পারি। কিন্তু তাদেরকে ঘরে রাখতে বাধ্য করার ক্ষমতা আমার নেই, এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যৌথ বৈঠক দেখা যায়নি, ছিল না সমন্বয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সবাইকে ঈদে ঘরে থাকতে বলছে, ঢাকার বাইরে যেতে না করছে। অন্যদিকে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা বলছে, ব্যক্তিগত গাড়িতে ঢাকার বাইরে যাওয়া যাবে, ঢাকার বাইরের সব ব্যারিকেডগুলো খুলে দেয়া হয়েছে। ঢাকাকে বিচ্ছি’ন্ন করার কথা বলেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দিয়েছে ঢাকাকে উন্মুক্ত করে! এমন সমন্বয়হীনতার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

৫. ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে জনপ্রতিনিধিদের নেই সমন্বয়

ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তাদের সাথে জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। বিশেষতঃ ৫০ লাখ কর্মহীন মানুষের তালিকা নিয়ে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলায় যতটা না দুর্নীতি, তার বেশি সমন্বয়হীনতা বলে মনে করা হচ্ছে। করোনা নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্তগুলোর মাঝে অ’স্থিরতা দেখা দিচ্ছে। যা দূর করে সমন্বিতভাবে করোনা মোকাবেলা করতে হবে, নইলে করোনার কারনে আমাদের আরো বড় ক্ষ’তির মুখে পড়তে হবে।

বাংলাইনসাইডার

শেয়ার করুন !
  • 144
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!