ঘরে বসে যেভাবে করোনাযু’দ্ধে জয়ী হতে শরীরের সক্ষমতা বাড়াবেন

0

স্বাস্থ্য বার্তা ডেস্ক:

ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মত করোনাও আমাদের জীবনের নিত্যসঙ্গী হয়ে গেল বলে হয়। তাই এই করোনার মধ্য দিয়েই সাবধানতা নিয়েই আমাদের জীবন চালাতে হবে। জীবন তো আর থামিয়ে রাখা যাবে না। তাই জীবন বাঁচাতেই অবশেষে করোনা ভাইরাসের এই ঊর্ধ্বমুখী সং’ক্রমণ প্রবণতার মাঝেও দেশের কল-কারখানা, যান চলাচল, অফিস, ব্যাংক সব কিছুই খুলে দিতে এক প্রকার বাধ্য হলেন সরকার। যদিও স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত আকারে যান চলাচল, কারখানা চালু করার জন্য বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তা আর সীমিত থাকবে না, অনেকটাই স্বাভাবিকের পর্যায়ে চলে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

কিন্তু প্রায় সবার কাছেই একটা বড় প্রশ্ন হচ্ছে, কী করে আমরা নিজেদের, পরিবারের সদস্য বিশেষ করে সন্তানদের এই করোনা থেকে রক্ষা করবো! সোশ্যাল মিডিয়া, নিউজ পোর্টাল, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় বিভিন্ন বিশেষজ্ঞগন তাদের জ্ঞান ও সাধ্যমত পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। সারা দুনিয়ার গবেষকগণ করোনার ওষুধ, ভ্যাক্সিন তৈরিতে রাত দিন পরিশ্রম করে চলেছেন। কিন্তু এখনো কোন সুনির্দিষ্ট ওষুধ, ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যত বেশি, সে তত বেশি সুরক্ষিত। তবে মানব শরীরে যেসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিল্ট-ইন রয়েছে, তাকে বলে Innate Immunity. আর পরবর্তীতে বিভিন্ন ভ্যাক্সিন, ওষুধ প্রয়োগ করে ও বিভিন্ন রোগে ভুগে ভুগে যে নতুন নতুন প্রতিরোধ শরীরে তৈরি হয়, তাকে একত্রে বলে Acquired Immunity.

শরীরের রোগ প্রতিরোধ করার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো অত্যন্ত কৌশলী। যু’দ্ধের জন্য এরা প্রতিনিয়ত আমাদের দেহে কোটি কোটি নতুন রূপান্তর ঘটিয়ে নতুন শক্তি অর্জন করে এবং আমাদের রক্ষা করে। আর এজন্যই আমাদেরকে শরীরেরর প্রতি যত্নবান হতে হয়। যেন আমাদের দেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে তার জন্য আমাদের শরীরকে সাহায্য করতে হয় নানা উপায়ে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য মতে, করোনা ভাইরাসের সাথে যেহেতু আমাদের শরীর পরিচিত নয়, সেহেতু একমাত্র Innate Immunity বাহিনীই এর সাথে সফলভাবে যু’দ্ধ করতে পারে। শিশুদের Innate Immunity খুব শক্তিশালী বিধায়, করোনা ভাইরাস তাদেরকে সহজে কাবু করতে পারেনা। Innate Immunityর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হলো Monocyte (M) এবং Natural Killer (NK বা N) cells।

আমরা যেমন বিপদে পড়লে থানা পুলিশকে ফোন করি, ঠিক তেমনই ভাইরাস আক্রা’ন্ত কোষগুলোও Type 1 interferon নিঃসরণ করে পার্শ্ববর্তী কোষ এবং M ও N cell-কে বিপদসংকেত পাঠায়। কিন্তু করোনা ভাইরাস এই ফোনের লাইন কেটে দিয়েই তারপর কোষকে আক্র’মণ করে। ফলে কোষগুলো তাদের বিপদের কথা কাউকে জানাতে পারেনা। এতে অন্যান্য কোষ বা মস্তিষ্ক ভাইরাসের আক্র’মণ তাৎক্ষণিকভাবে টের পায়না। এছাড়া করোনা ভাইরাস একই সাথে অজানা কোনো উপায়ে M এবং N cells গুলোকে দুর্বল করতে থাকে।

এজন্যই কেউ করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রা’ন্ত হবার পরবর্তী গড়ে ৫ দিন পর্যন্ত তার শরীরে কোন লক্ষণ প্রকাশ পায়না। এই ৫ দিনে করোনা ভাইরাস বিনা বাধায় ফুসফুসে সং’ক্রমণ ঘটাতে থাকে এবং নিজেরাও বিশাল সেনাবাহিনীতে পরিণত হয়। আর যাদের লক্ষণ প্রকাশ পেতে আরো বেশী সময় লাগে, তাদের দেহে করোনা ভাইরাস আরো ভ’য়ঙ্কর বাহিনীতে পরিণত হয়। লক্ষণ (জ্বর, কাশি) প্রকাশ পাবার পর থেকে M এবং N cells যু’দ্ধে নামে এবং ৮০% রোগীর ক্ষেত্রেই ভাইরাসগুলো ধ্বং’স করে তাদেরকে সুস্থ করে তোলে।

করোনা ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশ পাবার আগেই আমাদের শারীরিক সিস্টেম যদি কোনোভাবে M এবং N Cellগুলোকে ডেকে এনে ভাইরাস নির্মূ’ল করার কাজে লাগিয়ে দিতে পারে, তা হলে কেমন হয়? কারণ শুরুতে ভাইরাস সৈন্যদের শক্তি আমাদের শরীর রক্ষা বাহিনীর শক্তির চেয়ে দুর্বল থাকে, এ কারণে খুব তুলনামূলক ক্ষুদ্র ও দুর্বল ভাইরাস-বাহিনীকে হারিয়ে দেয়া আমাদের শরীরের জন্য অনেক সহজ হতো।

১৯১৮ – ২০ সালে পৃথিবীতে আঘা’ত হেনেছিলো ভ’য়ঙ্কর Spanish Flu। ‘হাইড্রোথেরাপি’ (Hydrotherapy) প্রয়োগ করায় মৃ’ত্যুহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছিলো এবং মানুষ দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছিলো। এই Hydrotherapyর মূলনীতি হচ্ছে, যখন মানুষ কোন রোগে আক্রা’ন্ত হয়, কিন্তু জ্বর হয়নি– তখন কৃত্রিমভাবে তার শরীরের তাপমাত্রাকে ১০২॰ – ১০৩॰ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। যা করা হয় গরম পানিতে গোসল করিয়ে বা Sauna’র মত Heat chamber এ বসিয়ে রেখে। এরপর আবার সাথে সাথেই তার শরীরকে ঠাণ্ডা পানি দিয়ে শীতল করা হয়।

পরবর্তীতে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরের তাপমাত্রা ১০২॰-১০৩॰ ফারেনহাইট এ পৌঁছানো মাত্র, মস্তিষ্ক এটাকে সম্ভাব্য বিপদসংকেত বা শরীরে জ্বর দেখা দিয়েছে বলে ভেবে নেয়। ফলে প্রতিরোধ বাহিনী দ্রুত প্রস্তুত হয়ে যায় শরীরকে রক্ষায়। এ সময় M ও N cells শরীরে বেশী তৈরি হতে থাকে। শরীরের তাপমাত্রা বাড়ার পরপরই আবার তা কমিয়ে আনলে M এবং N cells এর পাশাপাশি Innate Immunityর অন্যান্য componentsগুলোর পরিমাণ এবং ভাইরাস ধ্বং’সের ক্ষমতা বেড়ে যায়।

বেশ কিছু গবেষণায় বিভিন্ন তাপমাত্রা ও সময় ব্যবহার করা হয়েছে। এসব গবেষণায় ব্যবহৃত পদ্ধতি ও ফলাফল ব্যাখ্যা করে, সেরা ফলাফল পাওয়া গেছে। সারাংশ হিসেবে বলা যায়, মাঝারী মাত্রায় ব্যায়াম করার পর, গরম পানি বা Sauna’র মত Heat chamber দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে, তারপর সাথে সাথে আবার শরীরকে ঠাণ্ডা করলেই Immune System এর সর্বোচ্চ ভাইরাস বিধ্বং’সী ক্ষমতা আসে। শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্রুত সক্রিয় হয়ে যায়।

গবেষণাগুলোতে গরম পানি ব্যবহার করা হয়েছে সর্বোচ্চ ৩৯॰ সে: বা ১০৩॰ ফারেনহাইট এবং সময় ১ ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ ৩ ঘন্টা। ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার করা হয়েছে সর্বনিম্ন ৫॰ সে: থেকে সর্বোচ্চ ১৮॰ সে: এবং সময় ১৫ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা।

এই বিখ্যাত Hydrotherapyর জনকের নাম John Hervey Kellog। তার উদ্ভাবিত Hydrotherapy করোনা ভাইরাস মহামা’রীতে আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কারণ, কিছু দেশে, যেখানে Sauna Bath খুবই জনপ্রিয়, সেসব দেশের করোনার সং’ক্রমণ বেশী না। Sauna হলো অনেকটা Hydrotherapyরই একটি অত্যাধুনিক রূপ, যেখানে ১৫ মিনিট শরীরকে গরম পানির বাষ্পের মাধ্যমে অত্যন্ত উত্তপ্ত করে তারপর হঠাৎ ২-৩ মিনিটেই তাপমাত্রা একদম কমিয়ে আনা হয়। শরীরকে ডিটক্স করতে অনেকেই এটি ব্যবহার করেন।

ফিনল্যান্ড এবং নরওয়েতে Saunaর প্রচলন বেশী। ২৮ মে ২০২০ পর্যন্ত ফিনল্যান্ডে করোনা আক্রা’ন্ত মোট ৬,৭৪৩ জন এবং মৃ’তের সংখ্যা ৩১৩ জন। নরওয়ের পরিসংখ্যান হলো, আক্রা’ন্ত ৮,৪১১ জন এবং মৃ’ত ২৩৬ জন। জাপানিরা গরম এবং ঠাণ্ডা পানি দিয়ে পর্যায়ক্রমে গোসল করে। তাদের পরিসংখ্যান, আক্রা’ন্ত ১৬,৬৮৩ জন এবং মৃ’ত ৮৬৭ জন। বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক-দল বিদেশ ভ্রমণের ফলে জাপানে এই সং’ক্রমণ এতো বেশী ছড়ায়।

আমাদের দেশের মানুষের জীবনাচরণের কারণেই অধিকাংশেরই Innate Immunity দুর্বল। শহুরে মানুষের কায়িক পরিশ্রম না করা, রাতজাগা, মানসিক চাপ, ফাস্ট ফুড ও জাংক ফুডের মত অ’স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, ভেজাল খাবার এবং রাসায়নিক মিশ্রিত ফল ও সবজি খাওয়া ইত্যাদি এর প্রধান কারণ। তাই শহরে করোনা ভাইরাসের সং’ক্রমণ আমাদের দেশে গ্রামের চেয়ে অনেক বেশী।

এই বিপদের মুহূর্তে সম্ভাব্য সকল উপায়েই আমাদের Innate Immunityকে শক্তিশালী করে তুলতে হবে। ভাইরাস নির্মূ’লকারী Innate Immunityকে শক্তিশালী করার উপায় হচ্ছে আমাদের প্রতিদিনকার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা। ভিটামিন সি, রসুন, আনারস, ডিম, মাছ, ডালের মত রোগ প্রতিরোধী খাবার খেয়ে শরীরে পিএইচ এর পরিমাণ ৮.৫ এর উপরে বাড়ানো, আর নিয়মিত প্রতিদিন কম করে হলেও ৩০ মিনিট ব্যায়াম করা। দৈনিক অন্তত ১৫-২০ মিনিটের জন্য Sun Bath করা।

সূত্র: ব্রাইট সাইড

শেয়ার করুন !
  • 124
  •  
  •  
  • 0
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply