আবার ফিরে আসছে পাটের সোনালি দিন, নতুন দিক উন্মোচিত

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

এবার পাটের সোনালি দিনকে ফেরানোর পালা। পৃথিবীর ১ নম্বর পাট রাপ্তানিকারক হিসেবে আমাদের আজ খুব বেশি গর্ব করা ঠিক কি না তা ভেবে দেখা উচিত। এ হতে পারে পাটকে সোনালি পণ্য না করতে পারার ব্যর্থতা। সাধারণ পাটপণ্যের দাম কমলেও বহুমুখী ফ্যাশনযুক্ত, নতুন পাটপণ্যের দাম বিশ্ববাজারে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়াও ভবিষ্যতে পলিথিন বর্জনের বিশ্ব-অভিমত আরো জোরালো হলে প্রাকৃতিক তন্তুর মূল্য বহুগুণ বেড়ে যাবে।

সাম্প্রতিককালে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে পাট সাব-সেক্টরের যে ৩টি মূল বাধা চিহ্নিত হয়েছে তা হলো: ১. পাটের আঁশ সংগ্রহের পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা। ২. ছোট ও বড় পাটপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা। ৩. পাটকাঠিকে আরো উন্নত পণ্যে পরিণত করতে না পারা।

ইতোমধ্যে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের নানা উদ্যোগ পাট সাব-সেক্টরের আধুনিকায়ন করে যাচ্ছে। পাটের আঁশের গুণগত মান উন্নয়নই বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। প্রচলিত পাট পচানোর পদ্ধতি শ্রমঘন ও ব্যয়বহুল আর এতে সময়ও ব্যয় হয় অনেক, যার পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রচলিত পদ্ধতিতে পাটকাটা ও পচানোর জন্য একজন চাষীর বিঘা প্রতি ২০০০ টাকা ব্যয় হয় (লালমনিরহাট জেলার তথ্য)।

পাটচাষী ও এ কাজের সাথে সংশ্লিষ্টরা এই পদ্ধতির মধ্যে একটি যুগান্তকারী আমূল পরিবর্তন আনা দরকার বলে মনে করছেন। মূল সমস্যাটির অনেক দিক আছে। যেমন, পাট পচানোর পদ্ধতিটিতে ঝুঁ’কিপূর্ণ ও অ’স্বাস্থ্যকর শ্রম, যা দূর করা জরুরি। এছাড়াও আছে পাট পচানোর পানির স্বল্পতা আর পাটকাঠিকে লাভজনক ইন্ডাস্ট্রি পণ্যে রূপান্তর করতে না পারার ব্যর্থতা। পাটকাঠির মতো একটি অতি মূল্যবান জিনিসকে শুধুমাত্র জ্বালানি ও বেড়া দেয়ার কাজে ব্যবহার করা এক ধরনের বিলাসিতা। কারণ, বিশ্ববাজারে এর বহুমুখী ব্যবহার ও মূল্য আছে।

প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন নামের একটি প্রযুক্তিভিত্তিক আর্ন্তজাতিক উন্নয়ন সংস্থা, ‘কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড’ (যারা পাটপণ্য রপ্তানিতে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত), আরডিআরএস নামের একটি সুপরিচিত জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন সংস্থা এবং রংপুর চেম্বার অব কমার্সের যৌথ উদ্যোগে উত্তরাঞ্চলের ৪টি জেলায় (রংপুর, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম) পাটবস্ত্র ভ্যালুচেইনে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে যাচ্ছে।

শত শত বছর ধরে চাষী যেভাবে পাট কেটে জাক দেয়, লম্বা গোটা পাটকাঠি রাস্তায়, উঠানে শুকাতে দেয়- এবার আর সে রকম নয়। যুগের চাহিদায় তা আজ বদলে ফেলতে হচ্ছে। পুরো পাট গাছের (ছালসহ গোটা পাট গাছ) পরিবর্তে জাক দিচ্ছে শুধু পাটকাঠি থেকে ছড়ানো ছাল যা পরিমাণে ও ওজনে অনেক কম। এ সমস্যা উত্তরণের পথিকৃতরা ধান, গম, ভূট্টার মতো পাটের একটা নতুন সেমি অটোমেটিক ফাইবার এক্সট্রাকশন মেশিনের (আঁশকল) ব্যবহার শুরু করে দিয়েছেন উত্তরবঙ্গসহ সারাদেশে। তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বলছেন, ভালো মানের পাটের আঁশ তৈরি করতে না পারলে ভালো পাটপণ্য তৈরি সম্ভব নয়।

মেশিনটির প্রথম স্বল্পপরিসরে পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করে ‘কারুপণ্য’ ২০১৫ সালে। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ (ফেব্রুয়ারি) সালে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের অর্থ জোগানে এটিকে পাটচাষীর উপযোগী করে তোলার জন্য মেশিনটির ফেব্রিকেশন, টেকনিক্যাল ইম্প্রুভমেন্টের কাজ করেছে ‘করুপণ্য’, আরডিআরএস ও প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন এটিকে উত্তরাঞ্চলের ৪টি জেলায় পাট চাষীদের কাছে নিয়ে গেছে বাস্তবে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে।

আমরা দেখেছি আগাম বন্যা নদীতীরবর্তী এলাকায় পাটচাষীকে আগাম পাট কাটতে বাধ্য করে, যা আঁশের গুণাগুণের ওপর নে’তিবাচক প্রভাব ফেলে। এছাড়া অনেক পাটের জাক ভেসে গিয়ে চাষীর ক্ষ’তি হয়। পাটক্ষেতে পানির গভীরতা বেশি হলে পাট কাটতে অ’সুবিধা হয়, যা কষ্টসাধ্য। (এক্ষেত্রে ভবিষ্যতে ছোট কোনো পাট কাটার যন্ত্রের কথা ভাবা যেতে পারে)।

অতীতে পাটচাষীরা পাটের আঁশের মান উন্নয়নের নানা বিষয়ের উপর গুরুত্ব দেননি কারণ বস্তা, দড়ি বানানোর জন্য তো বেশি উন্নত আঁশ দরকার ছিল না। কিন্তু পাটের পণ্য নিয়ে যখন তাকে বিশ্ববাজারে ল’ড়তে হচ্ছে ভারত, থাইল্যান্ড, মায়ানমার, চীন এসব দেশের সাথে, তখন তাকে অবশ্যই উন্নত পদ্ধতিতে উন্নত মানের আঁশ সংগ্রহের কথা ভাবতেই হচ্ছে। পাটের আঁশের মান উন্নয়ন ছাড়াও আরও একটি বিষয় এখন গুরুত্বের সাথে ভাবা দরকার; আর তা হলো পাটকাঠি এবং পাটের পাতার বহুবিধ ব্যবহার ও এদেরকে ইন্ডাস্ট্রির মূল্যবান কাঁচামালে পরিণত করা। পাটকাঠিকে শুধুই চুলা জ্বালানো আর ঘরের বেড়া দেয়ার কাজে ব্যবহার করা যাবে না।

চাষীরা বুঝতে পারছে, এটি চলে যাবে পার্টিক্যাল বোর্ড ইন্ডাস্ট্রিতে পার্টিক্যাল বোর্ড তৈরির জন্য। পাটকাঠি ব্যবহার করা হয় গাড়ি ও নভোযানের বডি, ঢেউটিন তৈরির উপাদান হিসেবে। আর পাটকাঠির ছাই থেকে তৈরি হয় কম্পিউটার প্রিন্টার ও ফটোকপি মেশিনের কালি, ব্যাটারির কার্বন ইত্যাদি। এছাড়াও পাটপাতা দিয়ে পানীয় এবং পাটপাতা পচিয়ে জৈবসার তৈরি করা যায়। পাটগাছ থেকে পলিমার ব্যাগ ইত্যাদিও তৈরি শুরু হয়েছে, যা বিশ্ববাজারে পাটকে কেবল সোনালি আঁশ নয়, একটি বহুমূল্যবান ‘গ্রিনপণ্য’ প্রোডাক্ট হিসেবে নতুন করে পরিচিত করছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে এই বিষয়গুলোর উপর নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নের তাগিদ দেখা যাচ্ছে। যা পাটের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনতে মাইলস্টোন হিসাবে কাজ করবে।

উত্তরাঞ্চলে ১৫টি ছোট ও মাঝারি ফ্যাক্টরির সাথে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন এই কাজ শুরু করেছে। যারা ৭০-৮০ জন লোকের কর্মসংস্থান করছে এবং পাটপণ্য স্থানীয় ও বিদেশের বাজারে রপ্তানি করছে। এই ফ্যাক্টরিগুলোর মূল সমস্যা হচ্ছে তারা বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার জন্য সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত নয়। বড় ফ্যাক্টরি ও রপ্তানিকারকদের সাথে এই ফ্যাক্টরিগুলোর এক ধরনের বিচ্ছি’ন্নতা এদের বিকাশের অন্তরায়। তাই জুটমিল, বড় পাটপণ্য উৎপাদনকারী, ছোট ও মাঝারি ফ্যাক্টরি, পাটপণ্য বহুমুখীকরণ সংস্থা, পাট ও পাটপণ্য ক্রেতা, খুচরা বিক্রেতা, রপ্তানিকারকের সাথে একটি কার্যকর যোগাযোগ খুবই জরুরি।

আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের মতো পাটের বাণিজ্য সম্প্রসারণের সাথে সাথে এতে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়টি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু হতে পারে। একটি বিষয় আবারো জোর দিয়ে বলতে হয়, তা হলো আমাদের জাতীয় পর্যায় থেকে পরিবেশবান্ধব বহুমুখী পাটপণ্য তৈরির প্রতি অগ্রাধিকার নির্ধারণ জরুরি। এবং যেটি বাস্তবায়নের জন্য পাটের তন্তু ও দড়ি/বস্তা রপ্তানির উপর মনোযোগ কমানো উচিত।

সরকারি নীতিমালাকে পাটের আঁশের মান উন্নয়ন, উন্নত প্রযুক্তিতে স্পিনিং, উন্নত ধরনের উইভিং এবং বহুমুখীপণ্য তৈরিতে আরও সহায়ক করতে হবে এবং এজন্য কার্যকরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। নতুন আঁশকল, নতুন স্পিনিং মেশিন বসানো, নতুন পাটপণ্য তৈরিতে কারখানাগুলোতে প্রণোদনা দেয়া জরুরি। ছোট ও মাঝারি ফ্যাক্টরিগুলোর ব্যবস্থাপনার জ্ঞান ও দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ আজ খুবই জরুরী।

পাটের বৃহৎ প্রেক্ষাপট: পাট সাব-সেক্টরের সাথে জড়িত আছে বাংলাদেশের ৩ কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা। ২ লক্ষ লোক পাটকলে বা পাটপণ্য শিল্পে কাজ করে। ১ লক্ষ লোক জড়িত আছে পাটের ব্যবসার সাথে। সারাদেশে প্রায় ৭-৮ লক্ষ হেক্টর জমিতে পাট আবাদ করেন ৩৫ লক্ষ পাট চাষী (৩.৫ মিলিয়ন চাষী)। বিশ্বে আমরা পাট উৎপাদনকারী হিসেবে ২য়, তবে পাট ও পাটতন্তু রপ্তানিতে প্রথম। বর্তমান সরকারের নতুন পাট নীতিমালা যে ৩টি কার্যকর বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিয়েছে তা হলো: ১. পাট উৎপাদন বাড়ানো। ২. বহুমুখী মানসম্পন্ন পাটপণ্য উৎপাদনের ক্ষমতা। ৩. রপ্তানি আয় বাড়ানো।

পাট সাব-সেক্টরের আছে এক বিপুল সম্ভাবনা, যা বর্তমান আকার থেকে ৩০০% বৃদ্ধি পেতে পারে। ২০১৪-১৫ সালে বাংলাদেশ ৮৬৮ মিলিয়ন ডলার আয় করেছে পাট থেকে, যা কমছে না বরং বাড়ছে। সরকারের অগ্রাধিকারের সাথে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশ পাট গবেষণাকেন্দ্র (বিজেআরআই), প্রাইভেট সেক্টর অনেক উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিচ্ছে যেমন- কেনাফ জাতের পাটের উপর গবেষণা, বীজ বিতরণ, পাটের ছাল ছড়ানোর মেশিনের উন্নয়নের উপর কাজ করা, চারকোল উৎপাদন, পলিমার ব্যাগ, গৃহসামগ্রী উৎপাদনে পাট ব্যবহার ইত্যাদি।

বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন দক্ষ কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি পাটশিল্প কারখানাকে সহায়তা করে যাচ্ছে ‘প্রিজম’ নামে একটি প্রকল্পে অর্থয়ানের আওতায়। এটি পাটবস্ত্র ভ্যালুচেইনকে বিশ্ববাজারমুখী করে তুলবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

পাট মৌসুমের অভিজ্ঞতা: পাট গবেষণা ও পণ্য উৎপাদনকারী, উন্নয়ন সংস্থারা পাটের উন্নত ছাল ছাড়ানো ও পচানোর পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে (বিজেআরআই, সিআইজিআর ২০১৫)। যদি আমরা বর্তমানে স্বলপমেয়াদি জরুরি পদক্ষেপ বিবেচনা করি তা হলে ৪টি বিষয় অগ্রাধিকার পায়: ১. অধিক উৎপাদনশীল ও সাদা রংয়ের পাট জাতের সম্প্রসারণ (যেমন- কেনাফ)। ২. সেমি-অটোমেটিক শক্তি চালিত আঁশ ছাড়ানোর যন্ত্র গ্রহণ (এডাপশন), সম্প্রসারণ ও বিতরণ (ডিস্ট্রিবিউশন)। ৩. পাট জাক দেয়ার পদ্ধতির মধ্যে পরিবর্তন আনা। ৪. বহুমুখী পাটপণ্যের রপ্তানিবাজার সম্প্রসারণ, পাটের গ্রেড সচেতনতা বাড়ানো ও পাটকাঠির বহুমুখী বাজার নিশ্চিত করা।

যে বড় সমাধানটি বর্তমানে মাঠে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা হলো ১৪৪টি সেমি-অটোমেটিক পাটের আঁশ ছাড়ানোর (আঁশকল) মেশিন ৪টি জেলায় বিতরণ করা হয়েছে, যা ২৫,০০০ চাষীকে সুফল দিচ্ছে। একটি মেশিন দিয়ে ১ মাসে ১৫০-১৭০ জন চাষীকে সেবা দেয়া সম্ভব। মেশিনটি দিনে ৭-৮ ঘণ্টা চালানো যায় এবং কমপক্ষে ৩ বিঘা জমির পাটছাল ছাড়াতে পারে। মেশিন মালিক চাষীদের কাছে বিঘা প্রতি ১,৫০০ টাকা সার্ভিসিং চার্জ নিচ্ছে। এটি প্রচলিত নিয়মে চাষীর এই কাজের খরচের চেয়ে বিঘাপ্রতি ৬০০-৮০০ টাকা সাশ্রয় করছে। ৭-৮ ঘণ্টায় জ্বালানী বা ডিজেল লেগেছে ৪-৫ লিটার। আর ২ জন মালিকসহ ৪ জন লোক দিয়ে মেশিনটি চালানো যায়। ৩ বিঘা জমির পাটছাল ছাড়াতে ৪,৫০০ টাকা সার্ভিস চার্জ পাওয়া যায় যা থেকে জ্বালানি খরচ, শ্রমমূল্য বাদ দিলেও কমপক্ষে ১,৭০০-২,০০০ টাকা লাভ থাকে। যদি মেশিনটির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তাহলে মেশিনটির ক্রয়মূল্য রিকভার করে ১ বছরের মধ্যে এটিকে একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করা সম্ভব।

পাটের ছাল ছড়ানো ছাড়া সারা বছর মেশিনটির নানাবিধ বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। মেশিনটি দিয়ে সেচ প্রদান, ছোটখাট পরিবহণ কাজ ও ভুট্টার কাণ্ড ক্রাশিং করা যেতে পারে। আশা করা যাচ্ছে, যে এই মেশিনটি যেমন গ্রামে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে তেমনি পাটচাষীকে ১০% অধিক পাটের মূল্য পেতে সহায়তা করবে। প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন পাটকাঠির বহুমূখী ব্যবহারের জন্য ৪টি চারকোল মেশিনের ইম্প্রুভমেন্ট করেছে। যার সাহায্যে পাটকাঠির টুকরো, কিছু চিটাধান, তুষ অথবা কুঁড়ার সাথে মিশিয়ে স্মার্ট ফুয়েল বা চারকোল তৈরি করা হয়।

লালমনিরহাট জেলার পাটচাষী নুরুল হক ২০১৮ সালে ৯৪ শতক জমিতে কেনাফ ও তোষা দুই জাতের পাট চাষ করেছিলেন। ১৫-১৬ ফুট লম্বা, মোটা সতেজ কেনাফ পাটগাছগুলো দেখে খুবই খুশি নুরুল হক জানালেন, এই জাতের ফলন বেশি আর আঁশগুলো বেশি সাদা। এবার গ্রামে আনা নতুন আঁশকলে তিনি পাটকাঠি থেকে পাটের ছাল থেকে ছাড়িয়েছেন। তারপর এক নতুন পদ্ধতিতে বাঁশের মাচা করে অল্প জায়গায় পাটছালগুলো পুকুরে জাক দিয়েছেন। এর আগে কখনো তিনি এ পদ্ধতি প্রয়োগ করেননি। এ এক নতুন অভিজ্ঞতা।

তিনি বললেন, ১০-১২ দিনেই পাটের আঁশ পচে যায়। আর মেশিন ব্যবহার করার ফলে শ্রম ও সময় খুব কম লেগেছে। বিঘাপ্রতি খরচও কমেছে। ৯৪ শতকে দুই জাত মিলিয়ে এবার গত বছরের চেয়ে ২৮০ কেজি পাট বেশি পেয়েছেন। সবচেয়ে নতুন অভিজ্ঞতা হলো মেশিন ব্যবহারের ফলে পাটকাঠিগুলো এবার আর গোটা নেই, ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে গেছে। সেই ভেজা টুকরা ৫৫ মণ পাটকাঠি তিনি এক স্থানীয় ট্রেডারের কাছে বিক্রি করেছেন ৪,৪০০ টাকায়। ভাঙা পাটকাঠি এখন অন্য এক ধরনের বিকল্প পণ্য। পাটের অতিরিক্ত ফলন, শ্রম সাশ্রয় আর পাটকাঠির মূল্যসহ তিনি এবার ১৪,০০০ টাকা বেশি লাভ আশা করছেন।

নতুন এ-পদ্ধতির বিশেষ দিক হলো, কম শ্রম, কম সময়, কম পানি দূষণ, পাটের ভালো আঁশ ও বেশি লাভ। পাটকাঠি ভাঙা নিয়ে চাষীর নে’তিবাচক মনোভাব আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে। কারণ, এটি একটি নতুন পণ্য হিসেবে বাজারে স্থান করে নিচ্ছে। কৃষি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেছেন, কোনো কৃষক চাইলে মোট পাটজমির ৪-৫ শতকের পাটআঁশ প্রচলিত নিয়মে ছাড়িয়ে প্রাপ্ত গোটা পাটকাঠি জ্বালানি ও অন্য কাজে ব্যবহার করতে পারেন। জেলায় কৃষি বিভাগের অনেক পাটচাষী দল আছে, তারাও আগামী বছর এই মেশিন ও জাক দেয়ার এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করবেন বলে কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করছেন।

লেখক: ড. ফারুক উল ইসলাম
পরিচিতি: কৃষিবিদ, প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন নামক যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি আর্ন্তজাতিক সংস্থা (কৃষি ও অন্যান্য উন্নয়ন কাজের সাথে ২৪ বছর যাবত সম্পৃক্ত)

শেয়ার করুন !
  • 176
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply