পদ্মাসেতুর কাজ আর মাত্র ১১ শতাংশ বাকি

0

অর্থনীতি ডেস্ক:

করোনা ভাইরাস সং’ক্রমণের মধ্যেও পদ্মা সেতুর কাজ থেমে থাকেনি। এটি দেশবাসীকে আশান্বিত করেছে। এখন থেকে সব প্রকল্পের কাজ পুরোদমে চলবে। পদ্মা সেতুর কাজ আর প্রায় ১১ শতাংশ বাকি আছে। এমনটাই জানালেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

শেষের দিকে পদ্মা সেতুর স্প্যান বসানো। আর বাকি রয়েছে ১১টি স্প্যান। এর মধ্যে আগামী ১১ জুন মাওয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌ-র‌্যুটের চ্যানেলে বসানো হবে ৩১ তম স্প্যান। এ কারণে এদিন মাওয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌ-র‌্যুটে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখতে বিআইডব্লউটিএ’কে জানিয়েছে সরকারের সেতু বিভাগ। এরপর শুধু মাওয়ার মাটি স্পর্শ করতে বাকি থাকবে ১০টি স্প্যান।

সেতু বিভাগ জানায়, ৩১ তম স্প্যান বসিয়ে দিয়ে জাজিরা অংশের কাজ শেষ করা হবে। এরপর মুন্সিগঞ্জের মাওয়ার দিকে প্রস্তুত থাকা বাকি ৯টি খুঁটিতে ১০টি স্প্যান বসিয়ে দিলে দৈর্ঘ্যে ৬ কিলোমিটার পেরিয়ে যাবে পদ্মা সেতু। যে ২৫ ও ২৬ নম্বর খুঁটিতে বসবে ৩১ তম স্প্যান, সেগুলোর অবস্থান শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌ চ্যানেলের মাঝ বরাবর। এ কারণে এ নৌ-র‌্যুটে সব ধরনের নৌযান বন্ধ রাখার পদক্ষেপ নিতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ অনুরোধ জানিয়েছে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডাব্লিউটিএ’কে।

পদ্মা সেতুর ২০টি স্প্যানের অবস্থান শরিয়তপুর অংশে, বাকি ২০টির অবস্থান মুন্সিগঞ্জের মাওয়ার দিকে। আরেকটি স্প্যানের অবস্থান মাদারীপুর জেলায়। এর মধ্যে নদীর মধ্যে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য ৬.১৫ কিলোমিটার। দুই পাড়ে সংযোগ সড়কের সঙ্গে যুক্ত অংশ মিলিয়ে সেতুটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ৯ কিলোমিটার।

পদ্মা সেতুর একজন প্রকৌশলী জানান, বাংলাদেশের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ বঙ্গবন্ধু সেতু ৩২টি স্প্যানের। অর্থাৎ আরও দু’টি স্প্যান বসানোর পর স্প্যানের দিক থেকে যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতুকে ছাড়িয়ে যাবে স্বপ্নের পদ্মা সেতু।

পদ্মা সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রকৌশলীরা জানান, মাওয়া কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে স্প্যান ক্রেনে তুলে নিয়ে জাজিরায় পৌঁছাতে ৬ কিলোমিটার পাড়ি দিতে হয়। এভাবে গত ৩ বছর ধরে স্প্যান বসানো হয়েছে। এখন জাজিরা প্রান্তে শেষ হতে চলছে স্প্যান বসানোর কাজ। শুধু বাকি ৩১ তম স্প্যান বসানো, যা বর্ষা মৌসুমের আগে বসানো সম্ভব হবে। এরপরে মাওয়া প্রান্তের একেরর পর স্প্যান বসিয়ে মুন্সিগঞ্জের সঙ্গে সেতুবন্ধন হলেই শেষ হবে পদ্মা সেতুর কাজ।

মাওয়া প্রান্ত ঘুরে দেখা গেছে, মাওয়া প্রান্তে স্প্যান বসানোর জন্য খুঁটিগুলো শতভাগ প্রস্তুত। আর মাওয়ার প্রথম খুঁটি থেকে থেকে দ্বিতীয় খুঁটিতে স্প্যান বসানোর জন্য ক্রেন প্রবেশের ড্রেজিং করে নদী প্রশস্ত করা হয়েছে।

পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, পদ্মা সেতুর ৪১টি স্প্যানের ৩০টি পর্যন্ত বসানো শেষ হচ্ছে। বাকি ১১টি স্প্যানের মধ্যে ১০টি বসবে মাওয়া প্রান্তে। চলতি বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে এগুলো বসানোর কাজ শেষ হবে। একইসঙ্গে সড়কপথ সেতুর ভেতরে রেলপথের কাজও এগিয়ে চলছে।

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী বছরের জুনে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে কাজে কিছুটা ধীরগতি রয়েছে। এ কারণে কাজ আরও অন্তত ৬ মাস পিছিয়ে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সে হিসাবে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হতে পারে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতু দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলাকে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সড়ক ও রেলপথে যুক্ত করবে। দেশের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে স্বপ্নের এই প্রকল্প এখন অনেকটাই বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

পদ্মা সেতুর দুই পাড়ের মাঝে সংযোগ বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণের জন্য মোট ২৯৮টি পাইল বসানোর (ড্রাইভ) প্রয়োজন হয়। সেতুর পাইলগুলো ১২৮ মিটার (সর্ব্বোচ্চ) এবং বিদ্যুৎ লাইনের পাইলগুলো ১০৯ মিটার। প্রতিটি পাইলের ব্যাস (ডায়া) ৩ মিটার ও স্টীল ওয়াল থিকনেস ৬২-৮০ মিলিমিটার।

পাইলগুলো ড্রাইভ করা খুব সহজ ব্যাপার নয়। পৃথিবীর একটি মাত্র রাষ্ট্রই এ বিশাল পাইলগুলো ড্রাইভ করতে পারে। তাদের কাজই শুধু পাইলগুলো ড্রাইভ করা। ড্রাইভিং হ্যামার বা কন্ট্রোল ইউনিট এরা বিক্রয় করে না। এমনকি এগুলো কেউ কিনে পরিচালনা করার সাহসও পায় না। পাইলগুলো ড্রাইভ করার জন্য ১৪ জন জার্মান নাগরিক সাড়ে ৪ বছর ধরে পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় কাজ করেছেন। প্রজেক্ট শেষ করে তারা দেশে ফিরে গেছেন।

এই বিশাল হ্যামার তৈরির দক্ষতা রাখে একমাত্র জার্মানি। এই হ্যামারগুলো তৈরি হয় জার্মানির বিখ্যাত শহর মিউনিখে। জার্মান ব্র্যান্ড এ হ্যামারগুলোর নাম মেংখ (MENCK)।

পদ্মা সেতুর ২৯৮টি পাইল ড্রাইভ করার জন্য মোট ৩টি হ্যামার আনা হয় জার্মানি থেকে। যাদের ক্ষমতা ছিল ১ হাজার ৯০০ কিলোজুল, ২ হাজার ৪০০ কিলোজুল ও ৩ হাজার ৫০০ কিলোজুল। কোম্পানিটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭০০ কিলোজুল শক্তির হ্যামার তৈরি করেছে। তবে সেটি এখন সচল নাই। ৩টি হ্যামারের দুটিই মূল সেতুর কাজ শেষ হওয়ায় জার্মানি ফিরে গেছে। বাকি ২ হাজার ৪০০ কিলোজুল শক্তির হ্যামারটি বিদ্যুৎ লাইন পাইল ড্রাইভিংয়ের কাজ শেষ করে গত ১ জুন।

১ তারিখ রাত পর্যন্ত মাওয়া সার্ভিস এরিয়াতে বসে তার গর্জন শুনতে পান সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুল কাদের। শিমুলিয়া ফেরিঘাট থেকেও এর শব্দ শোনা যায়। মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মাওয়া ও শরিয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সেতুর আশপাশের লোকজন অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল এই দৈত্যাকৃতির হ্যামারের শব্দে।

হ্যামারটির কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সও শেষ হয় ২ জুন। তারপর প্রকল্প হতে ছাড়পত্র পেয়ে হ্যামার এবং পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ১৪ জন জার্মান স্কিলড অপারেটর ও প্রকৌশলী জার্মানির উদ্দেশে রওনা দেন। আর সেই সাথে হারিয়ে গেল গেল পদ্মা সেতুর আশপাশের লোকজনের অতিপরিচিত হ্যামারের আছড়ে পড়ার সেই আওয়াজ।

শেয়ার করুন !
  • 6K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!