বিএনপি-জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল বুঝে ফেললেন শেখ হাসিনা!

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

যারা সকালে জয় বাংলা বলে রাস্তায় মাতম করে আবার সুযোগ পেলে বিকেলেই পাকিস্থান জিন্দাবাদ বলার জন্য ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে কথা বলে, তারা এখন বড় আওয়ামী লীগার। তাদের আছে অঢেল টাকা, ক্ষমতার সীমা পরিসীমা নেই। তারা অনেক সময় প্রধানমন্ত্রীর আদেশ অ’মান্য করে, নানাভাবে তাকে বোঝান। মুচকি হেসে প্রধানমন্ত্রী তার মনের ডায়রিতে লিখে রাখেন এসব কথা আর নাম, থাকেন সময় ও সুযোগের অপেক্ষায়।

করোনা ভাইরাস নিয়ে যত কাণ্ড হয়েছে তা থেকেও আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত এখন ভালো ফল দিচ্ছে বলে অনুমিত হচ্ছে। অনেকেই তার সিদ্ধান্তে খুশি ছিলেন না; এক- নিজেদের অভিজ্ঞতার অভাবে, দুই- অন্য দেশ কী সমস্যায় পড়েছে, তা থেকে কীভাবে উতরে গেছে তার বিস্তারিত খবর না জানা, করোনা ভাইরাস সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের অ’জ্ঞতা, সুনির্দিষ্ট ওষুধ না থাকা, ভাইরাস ঘন ঘন তার চরিত্র বদলে ভ্যাক্সিন তৈরির জন্য বিশ্বের তাবৎ বিজ্ঞানীদের প্রাণান্ত চেষ্টা সফল না হওয়ায় তৈরি অনিশ্চয়তা থেকে হ’তাশা, ইত্যাদি নানা কারণে।

সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি শেষে মানুষ ঢাকায় এসে নগর পরিবহণে, দূর পাল্লার বাস, বিমান যাত্রীর অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ কিছুটা হলেও সচেতন হয়েছেন। অবশ্য এর আগেই আমাদের দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তাদের সহযোগী জামায়াত, চৈনিক বাম, চ্যুত বাম আর সুবিধাবাদীরা নানাভাবে সরকারকে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। গত ২৭ মে বুধবার দুপুরে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘করোনা ভাইরাস মাহামা’রির সং’ক্রমণ ঠেকাতে সরকার লকডাউন ঘোষণা না করে বড় ভুল করেছে’।

মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা বারবার বলেছি, সরকার তো লকডাউনই ঘোষণা করেনি। সরকার কোনো লকডাউন না করে সাধারণ ছুটি দিয়ে দিয়ে এই সমস্যাটা সৃষ্টি করেছে। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো তারা খুলে দিল, আবার বন্ধ করল, আবার খুলে দিল। গণপরিবহন ২ দিন চলল। অ’মানবিকভাবে নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশুরা কীভাবে হেঁটে হেঁটে অথবা ট্রাকে গেছেন তা আপনারা দেখেছেন। সবচেয় বড় সমস্যা হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ভেঙেই গেছে। এখনও কোনো হাসপাতালে গেলে চিকিৎসা পাওয়াটা খুব দুরূহ ব্যাপার হয়ে গেছে।

আমরা সবাই জানি, ভারতের পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে সাপে-নেউলে সম্পর্ক। তার পরেও করোনা নিয়ে মোদির সমস্ত ঘোষণা বিনা বাক্য ব্যয়ে মমতা মেনে নিয়ে নিজ রাজ্যে তা প্রতিপালনের আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, যা তার দলের রাজনীতির জন্য খুব সুখকর নয়, তবুও। অন্য দিকে ভারতের প্রধান বিরো’ধী দল কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধী লিখিতভাবে সেদেশের প্রধানমন্ত্রীকে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের নানা উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজের কথা জানিয়েছেন, কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশের বিএনপি, বামেরা সেটি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বাংলাদেশেও মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার জন্যই প্রধানমন্ত্রী ২৬ মার্চ থেকে ঘোষিত সাধারণ ছুটি মে মাসের পরে আর প্রলম্বিত করেননি। কারণ আমাদের দেশ একটি খেটে খাওয়া মানুষের দেশ। এখানে মাসের পর মাস সবকিছু বন্ধ করে রাখা সম্ভব নয়। ইউরোপের উন্নত দেশগুলোও পারেনি, সেখানে প্রতিদিন এখনও বহু মানুষের মৃ’ত্যু হচ্ছে, প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আক্রা’ন্ত হচ্ছে, তারপরও তারা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে রাজধানীর মহাসড়কগুলো একেবারে ফাঁকা থাকলেও, রাজধানীর অলিগলি, পাড়া মহল্লায় একেবারেই ভিন্ন চিত্র ছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বাড়িতে থাকার অনুরোধ জানানো হলেও শহরের মহল্লার গরীব মানুষ ঘরে থাকেননি। গ্রামাঞ্চলে এ নিয়ে সচেতনতা এত কম, অনেকে করোনা আছে বলে বিশ্বাস করতেই চান না। তাই বাড়িতে থাকার নির্দেশনা একেবারেই মানছেন না।

তুরস্কে করোনা ভাইরাস সং’ক্রমণের অস্তিত্ব জানা গিয়েছিল ১১ মার্চ। এরপর থেকে বেশ দ্রুত দেশের প্রতিটি জায়গায় সং’ক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। একমাসের মধ্যেই তুরস্কের সবগুলো প্রদেশ আক্রা’ন্ত হয়। চীন এবং ব্রিটেনের তুলনায় বেশ দ্রুত গতিতে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে তুরস্কে। অনেকে আশ’ঙ্কা করেছিল, দেশটিতে মৃ’তের সংখ্যা অনেক বাড়বে। তুরস্কের অবস্থা হয়তো ইতালির মতো হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু প্রায় ৩ মাসের মাথায় এসেও সেটি ঘটেনি। এমনকি তুরস্কে পুরোপুরি লকডাউনও দেয়া হয়নি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী তুরস্কে মৃ’তের সংখ্যা ৪ জুন পর্যন্ত ৪ হাজার ৬৩০ জন। কিন্তু অনেক চিকিৎসক মনে করেন প্রকৃত অর্থে মৃ’তের সংখ্যা এর দ্বিগুণ হতে পারে। কিন্তু তারপরেও করোনা ভাইরাস সং’ক্রমণে তুরস্কে মৃ’তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। কারণ তারা মোটামুটি দ্রুততার সাথে টেস্ট করেছে। গণ পরিবহনসহ বিভিন্ন জায়গায় বাধ্যতামূলক মাস্ক ব্যবহার, রেস্টুরেন্ট ও কফি-শপ বন্ধ করা, জনবহুল জায়গায় শপিং বন্ধ রাখা এবং মসজিদে জমায়েত বন্ধ করা। যাদের বয়স ৬৫ বছরের বেশি এবং ২০ বছরের কম তাদের পুরোপুরি বাসায় আটকে রাখা, আর ছুটির দিনগুলোতে কারফিউ দেয়া হয়। পাশাপাশি বড় শহরগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়।

জেনে বা না জেনে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরের মানুষ আমাদের দেশে কারফিউ বা কঠোর লকডাউন দিতে বলেছিলেন। সরকারের প্রধান বিরো’ধীরা তো এটাই চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তা করেননি। কারণ তিনি জানেন এবং বোঝেন, ক্ষুধা কোন আইনের তোয়াক্কা করে না। সাধারণ ছুটির সময় আমরা দেখেছি, সরকারের আহ্বান, পুলিশ আর সেনা সদস্যদের বারংবার বিনীত অনুরোধ উ’পেক্ষা করে জীবনের ঝুঁ’কি নিয়ে মানুষ গ্রামের গেছেন এসেছেন আবার গেছেন আবার এসেছেন। এরা কারা? এরা মূলত খেটে খাওয়া মানুষ। যাদের কাছে না খেয়ে ম’রার চেয়ে কিছু খেয়ে ম’রা অনেক শ্রেয় মনে হয়েছে, তাই তারা এমন করেছেন। আর যারা শ্রমঘন শিল্পের মালিক, রপ্তানি যাদের অন্যতম ব্যবসা, তারাও চেয়েছেন শ্রমিকরা ঢাকায় এসে কারখানায় কাজ শুরু করুক, পৃথিবীর আর অন্য সব দেশের মত। কিন্তু উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণি যাদের ঘরে ৬-১২ মাস চলার মত সঞ্চয় আছে তারা কঠোর লকডাউন, কারফিউ চেয়েছিলেন। এসব উচ্চ মধ্যবিত্ত মানুষের সাথে সাধারণ মানুষের কোন যোগাযোগ নেই, তাই তারা গরীবের ক’ষ্ট সম্পর্কে অবহিত নন অথবা সরকারকে বিপদে ফেলতে চান।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এক সমীক্ষায় বলেছে, করোনার কারণে দেশে ২২.৯ শতাংশ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। তার ফলে এখন আগের গরিব এবং নতুন গরিব মিলিয়ে জনসংখ্যার ৪৩ শতাংশ এখন দারিদ্রসীমার নিচে। ওই দুই প্রতিষ্ঠানের হিসাবে গ্রামে ৪ কোটি ২৯ লাখ ৯৪ হাজার ১২৭ জন এবং শহরে ২ কোটি ৭০ লাখ ২৮ হাজার ৭১৯ জন অভাবগ্রস্ত।

অভাবী মানুষকে আইনকানুন প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। অভাবের তাড়নায় তারা যে কোনো বে-আইনি কাজ করতে পারে। অবর্ণনীয় ক’ষ্ট করে আবেগী গরীব বাঙালী নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশুরা কীভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে হেঁটে অথবা ট্রাকে লুকিয়ে গ্রামের বাড়ি গেছেন, তাদের সেই আবেগ কি আমরা সবাই বুঝি! মার্কেট খুলে দেওয়ার পরে ঈদের বাজারে গেছেন যারা তাদের ৮০ ভাগ দরিদ্র বা প্রান্তিক মানুষ, তাদের আবেগ আলাদা। তাদের কাছে লকডাউন তো দুরের কথা, কারফিউ দিলেও তারা কারফিউ অ’মান্য করে ঢাকায় আসতেন কাজের ও খাবারের সন্ধানে।

এমন হলে সরকারবিরো’ধী বিএনপি জামায়াত, যারা সরকার উৎখাতের ষড়’যন্ত্রে লিপ্ত তাদের একটা সুযোগ আসতো সরকার পত’নের আন্দোলন জোরদার করার, যা এখন সবচেয়ে করোনা আক্রা’ন্ত আমেরিকায় চলছে। তাই বিএনপি জামায়েত ও তাদের পালিত বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে দেশে কঠোর লকডাইউন বা কারফিউ দেবার সরকারী ঘোষণার ফাঁ’দ পেতেছিল, যাতে জনদরদি কিছু ভালো মানুষ সায় দিয়েছিলেন না বুঝে। শেখ হাসিনা কিন্তু সেই ফাঁ’দে পা দেন নি। লা’শের রাজনীতির ধারক বিএনপি-জামায়াত, মান্না-কামালদের ঐক্যফ্রন্টেরের রাজনৈতিক চালাকিতে কোন কাজ হলো না!

লেখক: সায়েদুল আরেফিন
পরিচিতি: রাজনীতি বিশ্লেষক এবং উন্নয়নকর্মী

শেয়ার করুন !
  • 888
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!