করোনার মাঝেই কাজে লাগানো যায় এক নতুন সম্ভাবনা!

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

জীবন মানেই কোন না কোন সময় বিপ’র্যয় আসবে, আবার সেই বিপ’র্যয় কাটিয়ে উঠবে মানুষ, এটা আমরা ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে অহরহ দেখি। এবারও তা দেখছি। প্রতিটি মহামা’রী কোন না কোন সুযোগ বা সম্ভাবনার জন্ম দেয়। করোনা ভাইরাসের এই মহামা’রী কি আমাদের দেশের জনগণের জন্য কি কোন লাভের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা আগে কখনো হয়নি?

করোনা আক্রা’ন্ত প্রায় সব দেশেই খাদ্য পণ্যের মুদি দোকানদার বা সুপার শপ, ওষুধ কোম্পানি আর তাদের খুচরা বিক্রেতা, জীবাণুমুক্ত করার পণ্যসামগ্রী, উপাদান ও সরঞ্জাম, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি, জরুরী পরিবহণ, ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার, ইত্যাদির মত সামাজিক যোগাযোগ কোম্পানির লাভ আকাশচুম্বী।

ঢাকা, মুম্বাই এর মত চরম বায়ু দূষিত শহরে বায়ু দূষণ জনিত অসুখ ও মৃ’ত্যুর হার কমে গেছে, প্রকৃতি তার প্রাণ ফিরে পেয়েছে, যা না দেখা লাভ। মানুষের জীবনাচরণে বড় ধরনের পরিবর্তনের ছোঁয়া, চিন্তা চেতনায় এসেছে অনেক পরিবর্তন, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। খারাপ লোকেরা এর মাঝেও চুরি করছে ত্রাণ বিতরণে, জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কেনাকাটা থেমে নেই।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারী কোষাগারের প্রাপ্য টাকা কোষাগারে ফিরিয়ে আনার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, চুরি, দুর্নীতি, টাকা পাচা’র বন্ধের উদ্যোগ নিয়ে সরকারী রাজস্ব ব্যয় কমিয়ে এনে আমাদের দেশের আর্থিক সচ্ছ্বলতা অনেকটাই ফিরিয়ে আনা সম্ভব; তাতে জনসমর্থনও পাওয়া যাবে প্রায় শতভাগ।

দেশ থেকে অ’স্বাভাবিক হারে টাকা পাচা’র বেড়েছে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে পাচা’র হয়েছে ১ হাজার ১৫১ কোটি ডলার। দেশীয় মুদ্রায় যা ৯৮ হাজার কোটি টাকা। পাচা’রের এ পরিমাণ ২০১৪ সালের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭৫৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার পাচা’র হয়। বর্তমান বাজারদরে (৮৫ টাকায় প্রতি ডলার) এর পরিমাণ ৬৪ হাজার কোটি টাকা।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) গত ৩ মে মঙ্গলবার এ-সং’ক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

বাংলাদেশের ২০২০ – চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। অর্থাৎ দেশের মোট বার্ষিক বাজেটের প্রায় শতকরা ১৯ ভাগ টাকা পাচা’র হয়ে যায়। এর বাইরেও দেশের মধ্যেই নামে বেনামে অনেক অ’বৈধ টাকা নানাভাবে পাচা’র ও বিনিয়োগ হয়, কর ফাঁকি দিয়ে, যা চুরি, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা। এসব ছাড়াও পণ্য আমদানির নামে অধিক মূল্য দেখিয়ে অর্থ পাচা’রের ঘটনা তো বহু পুরনো ও জনপ্রিয় পদ্ধতি।

সরকারের যে কোন উন্নয়ন দপ্তরে যেখানে উন্নয়নের কাজ সব চেয়ে বেশি হয় সেটা নিয়ে একটু আলোচনা শুরু করা যাক। ধারণ করা যাক দুর্নীতির মাধ্যমে কীভাবে টাকা কামানো হয়। সব চেয়ে বেশি দুর্নীতি হয় বিদেশী সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পে। দেশীয় প্রকল্পেও একই ধারায় দুর্নীতি হয়। আসুন সে সম্পর্কে ধারণা নিই।

যে কোন প্রকল্পের মোটা দাগে ৩টা স্তর থাকে, প্রতিটি স্তরের মাঝে থাকে আরও অনেক উপ-স্তর। ১. প্রকল্পের ডিজাইন, ২. টেণ্ডারিং, ৩. বাস্তবায়ন। এর প্রতিটি স্তরেই হয় পুকুর চুরি। ৫০০ টাকার জিনিস একটা শূন্য বাড়িয়ে কী করে ৫,০০০ হয় তার বহু খবর বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা সবাই এখন জানি। এখানে তা না বলে একটু ভিন্ন কথা বলি।

মনে করি, একটা ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপজেলা সড়ককে রিজিওনাল হাইওয়ে করা হবে। প্রথমে করা হয় এর ডিজাইন। তাতে প্রয়োজনে রাস্তা সোজা করার জন্য কিছু জমি অধিগ্রহণের বিষয় থাকে। কোন দিকে জমি অধিগ্রহণ হবে তার তথ্য জেলার এসি ল্যাণ্ড অফিস থেকে আগেই ফাঁ’স করে দেওয়া হয় খুব গোপনে। রাতারাতি সেই জমিতে টিনের ঘর উঠে যায়, গাছ লাগানো হয়। কারণ ঘরের আর গাছ কাটার ক্ষ’তিপূরণ কত তা আমাদের মত সাধারণ মানুষের কল্পনার বাইরে।

গত ৮ মার্চ দেশের অনেক পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, একটি বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের ২১টি নারিকেল গাছের দাম ১৩ কোটি টাকা, ১টি কলা গাছের দাম ৬ লাখ টাকা ও ২টি টিনের ছাপড়ার দাম দেখানো হয়েছে ৬ কোটি টাকা! এই টাকা কে পান? সাধারণ মানুষ না সেই দপ্তরের কর্তারা! এভাবেই একটা একটা করে উন্নয়ন দপ্তরকে ধরে ধরে আমরা করোনাকালের দুর্যোগকে সম্ভাবনায় রূপ দিতে পারি।

এবার আসি প্রকল্পের টেণ্ডারের কথায়। টেণ্ডারে বাংলাদেশের মত দেশে কীভাবে করা হয় তা কারো অজানা নয়। তথ্য পাচা’রের মাধ্যমে আগেই ঠিক করা ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য কাগজ পত্র তৈরিতে সাহায্য করেন প্রকল্পের কর্তাব্যক্তিরা, কারণ তারা মূল্যায়নের ক্রাইটেরিয়া জানেন। জানেন কোথায় কোন প্যাঁচ লাগাতে হবে।

এবার আসি সয়েল টেস্টের বিষয়ে। মনে করুন ১০০ ফুট পর পরে মাটির অবস্থা বোঝার জন্য এস্টিমেট করতে মাটি পরীক্ষা করা হয়। সেখানে হয় পুকুর চুরি। ১ কিলোমিটার সমান ১ হাজার ৯৪ ফুট অর্থাৎ ২০ কিলোমিটার সমান ২১ হাজার ৮৮৪ ফুট ভাগ ১০০ অর্থাৎ ২২০টা বোরিং করে সয়েল টেস্ট করার কথা। যে স্থানীয় ঠিকাদারকে এই কাজ দেওয়া হয় তাকে বলা হয় সর্বোচ্চ ১০০টা টেস্ট করে বাকিগুলোর জন্য টেবিল মেকিং রিপোর্ট করতে। বাকী ১১০টি বোর হোলের, টেস্টের খরচের টাকা ভাগাভাগি হয় প্রকল্পের কর্তা-বাবুরা আর ঠিকাদারের মাঝে। অনেক সময় সবদিক ঠিকঠাক রাখতে স্থানীয় কাউন্সিলর বা চেয়ারম্যান মেম্বারদেরও কিছুটা ভাগ দেয়া হয়। এর ফলে যা হয়, আসল প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ভুল তথ্যর ভিত্তিতে ডিজাইন করার দরুন সাধারণত প্রকল্পের খরচ বেড়ে যায়। যেমনটি অতীতে বহুবার দেখা গেছে। প্রকল্পের মাঝপথেই অনেক সময় কাজ থেমে যায় আরও বরাদ্দের তাগিদ দিয়ে।

এবার আসি প্রকল্পে ব্যবহারের মালামাল ঠিক করার ক্ষেত্রে। কোয়ান্টিটি সার্ভেয়ারকে সন্ত্রা’সী ঠিকাদারকে দিয়ে ভয় দেখানো হয়। তাই তিনি মালামালের বাজার দর ঠিক রেখে পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। আবার প্রকল্প বাস্তবায়নে নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহের সময় আসে নিম্নমানের সামগ্রী। ফলে সেখান থেকেও বিরাট অংকের টাকা বেঁচে যায়। যার ভাগ পান প্রকল্পের কর্তা-বাবুরা আর ঠিকাদার। নির্মাণ সামগ্রীর মান আর পরিমাণ এতটাই কম থাকে যে, তা খুব অল্প দিনেই ন’ষ্ট হয়ে যায়। দোষ হয় আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মন্ত্রী ও সরকারের। ভাবটা এমন যে, মন্ত্রী ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মত শতাধি স্বত্বায় বিভক্ত হয়ে প্রতিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে রাত দিন সেখানে উপস্থিত থাকবেন। এটা আসলেই যে অ’সম্ভব ব্যাপার, সেটা সবাই জানে। সারাজীবন সততার সাথে রাজনীতি করে তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে এসে মন্ত্রী হওয়া একজন রাজনৈতিক নেতা শুধুমাত্র কিছু দুর্নীতিবাজ আমলার কারনে বদনামের ভাগিদার হন।

এবার আসি এই চুরি বা জনগণের টাকা চুরি বন্ধ করার বা কমিয়ে আনার কৌশল কী হতে পারে। সরকারী দপ্তরসহ দেশের সব মানুষ আছেন করোনা আত’ঙ্কে। এই সুযোগে প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্পের সহায়তায় প্রকল্প বাস্তবায়নে আধুনিক আইটি প্রযুক্তিতে সুসজ্জিত, সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে মিনিমান জ্ঞান থাকা যুবকদের (তারা তুলনামূলকভাবে সৎ) একটা সহায়ক টিম গঠন করে প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়নের প্রতিটি স্তরে নিয়োগ দেওয়া। যাতে প্রকল্পের কোন স্তরে কী কী হচ্ছে তা প্রতি মুহূর্তেই এটুআই প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট মনিটরিং অফিসারের কম্পিউটারে এসে সেভ হয়ে যায়।

দুর্নীতিবাজরা খুব বুদ্ধিমান তাই সব কথা খুলে বলা দরকার নেই, এই ইশারাই এটুআই প্রকল্পের কর্মকর্তাদের জন্য যথেষ্ট। প্রয়োজনে আরও বিস্তারিত জানা যাবে, অভিজ্ঞদের কাছ থেকে। আমাদের দেশে দেশপ্রেমিক মানুষের কমতি নেই। তাই করোনাকালে সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।

লেখক: ক্বারী ইকরামুল্লাহ মেহেদী
পরিচিতি: শিক্ষক ও গণমাধ্যম কর্মী
পেকুয়া, কক্সবাজার

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!