কাগজে ছাপা পত্রিকার কি দিন শেষ হয়ে গেল?

0

ফিচার ডেস্ক:

মানব সভ্যতায় ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক বাহক হিসেবে ছাপা পত্রিকায় ভূমিকা অনন্য অসাধারণ। কিন্তু ইন্টারনেট সহজলভ্য হওয়ার পর বিজ্ঞাপনের বলয় সংকুচিত হওয়ায়, ছাপা পত্রিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই শ’ঙ্কা প্রকাশ করেন। কিন্তু তারপরেও পাঠকপ্রিয়তার কারণে এখনো বের হচ্ছে কিছু ছাপা পত্রিকা।

যদিও করোনার কারণে এই প্রশ্ন আবার নতুন করে দেখা দেয়। কাগজের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস ছড়াতে পারে, অনেকেই এমন আশ’ঙ্কা করেন। আর এতে করে গ্রাহকেরা বাসা, অফিসে ছাপা কাগজ রাখা বাতিল করা শুরু করেন। আর এতে করে শুধু ঢাকা শহরেই সংবাদপত্র বিক্রি ৫০ শতাংশ কমে গেছে। এমনটা জানান, ঢাকাভিত্তিক হকারদের সংগঠন সংবাদপত্র হকার্স কল্যাণ বহুমুখী সমবায় সমিতি। অনেকে ফোন দিয়ে পত্রিকা রাখা একদম হুট করেই বন্ধ করে দেন।

সংগঠনটির সদস্যরা আগে দিনে ৩০ লক্ষ টাকার পত্রিকা বিক্রি করতেন। কিন্তু করোনার কারণে পত্রিকা বিক্রি ১৫ লক্ষ টাকায় নেমে যায় বলে জানান। আর এতে করে ঢাকায় থাকা ৩০ থেকে ৩৫ হাজার পত্রিকা হকারের মধ্যে, অনেকের হাতে এখন কোনো কাজ নেই বলে জানান। একই রকম অবস্থা চলছে ঢাকার বাইরেও। করোনার কারণে বেশ বড় অংশের একটি পাঠক বন্ধ করে দেয় পত্রিকা রাখা। যদিও এখন অনেক অফিস খুলেছে। এতে করে অবস্থার কিছুটা হয়ত পরিবর্তন ঘটবে। কিন্তু এখনো বন্ধ রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট থেকে শুরু করে দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছাপা পত্রিকার অনেক বড় গ্রাহক। সেখানে লাইব্রেরিগুলোতে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকাগুলো রাখা হয় নিয়মিত। এছাড়াও শিক্ষকদের কমনরুম, হলগুলো তো আছেই।

ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য ইন্ডিপেনডেন্টসহ বিশ্বজুড়ে আরও অসংখ্য সংবাদপত্র তাদের প্রিণ্ট ভার্সন প্রকাশ বন্ধ করে দিয়েছে। আবার অনেকেই ক্ষ’তি কমাতে সার্কুলেশন কমিয়ে দিয়েছে। অ’ব্যাহত গতি থমকে যাওয়া, বিজ্ঞাপন কম, সেইসাথে পাঠকরাও অনলাইনে ভাগ হয়ে যাওয়ায় এমনটা ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিস্টিয়ান সায়েন্স মনিটর সংবাদপত্রটি শতবর্ষের ঐতিহ্যও বয়ে নিতে পারছে না। পরে শেষভাগে বন্ধ হয় সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন নিউজউইকও। ৮০ বছরের দীর্ঘ সাফল্যের ইতিহাস টেনে এনে ছাপার ইতি টানে ম্যাগাজিনটি। স্যাটায়ারধর্মী সংবাদপত্র দ্য ওরিয়নের ছাপাকপির পাঠক ছিল ঈর্ষা করার মতো। কিন্তু ব্যাপক জনপ্রিয় এই পত্রিকা এখন শতভাগ ডিজিটাল রূপ নেয়। একইপথে রাজনৈতিক ম্যাগাজিন ন্যাশনাল জার্নাল। সেইসাথে প্রাপ্তবয়স্কদের ম্যাগাজিন পেন্টহাউজও পুরোপুরি ডিজিটাল হয়ে ওঠে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমেরিকান ম্যাগাজিন জগতে ছাপা ভার্সন বন্ধ করে দিয়েছে এক্সএক্সএল, অ্যামেরিকান ফটো ম্যাগাজিন, ভাইব, স্মার্টমানি ম্যাগাজিন ও অটো ট্রেডার। কানাডায় প্রিন্ট ভার্সন বন্ধ করে দেয় লা প্রেসি। সেইসাথে গুলেফ মারকারি তার দীর্ঘ দেড়শ’ বছরের ইতিহাসের ইতি টানে। ফ্রান্সে গত কয়েক বৎসরে ৩টি ছাপা সংবাদপত্রের ইতি ঘটেছে। কয়েক বৎসর আগে টিএফওয়ান দৈনিক মেট্রো নিউজ ছাপানো বন্ধ করে দেয়।

২০১১ সালে ফ্রান্সের সংবাদপত্র ফ্রান্স সোইর বড় কঠিন সময় পার করে। ৭০ বছরের পুরোনো পত্রিকাটি ইন্টারনেট ভার্সনে ভর করে এখনো চলছে। পরের বৎসরের জানুয়ারিতে বাণিজ্য বিষয়ক দৈনিক লা ট্রিবিউনও একই সিদ্ধান্ত নেয়। ট্রিবিউনের ২৬ বৎসরের গৌরবময় ইতিহাস। এই পত্রিকাটিও ডিজিটালে রূপে তাদের নামের ঐতিহ্যটি টিকিয়ে রাখতে পারছে। এখনো ঐতিহ্যের ভাবনায় ছাপা পত্রিকা রেখে দিচ্ছে তাদেরও কমবেশি ক্ষ’তি গুনতে হয়। আর তাই নতুন করে উঠছে পুরনো প্রশ্ন। ছাপা পত্রিকার দিন কি তাহলে শেষ!

পৃথিবীর কল্যাণের কথা ভাবলে পত্রিকা ছাপা বন্ধ দেখতে চান অনেকেই। কারন পত্রিকা ছাপতে প্রয়োজন বিপুল কাগজ, যার উৎস গাছ বা বাঁশ। বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়া থেকে অনেকটা রেহাই পাবে পত্রিকা ছাপা বন্ধ হলে। সেই সাথে রয়েছে ছাপার কালি। যার উৎস কার্বন। পরিবেশ দূষণের বড় একটি অনুষঙ্গ এটি। এই পরিবর্তনকে শুভ বলে মেনে নিতেই হবে।

শেয়ার করুন !
  • 48
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!