মুক্তিযোদ্ধার কবরের জন্য কোদাল দেয়নি কেউ, এগিয়ে এল ছাত্রলীগ

0

সীতাকুণ্ড প্রতিনিধি:

করোনা উপসর্গ নিয়ে মা’রা গেলেন বীর মুক্তিযো’দ্ধা জালাল আহমেদ (৮০)। করোনা রোগী শুনে দাফনে এগিয়ে আসেননি কেউ। শেষ পর্যন্ত এগিয়ে এলেন উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়কসহ দুই ছাত্রলীগ নেতা। সাথে যোগ দেন জালাল আহমেদ এর একমাত্র ছেলে সদ্য করোনা জয় করা পুলিশ সদস্য। ৩ জন মিলেই গোসল দিয়েছেন। পরে কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর সহযোগিতায় দাফন করেছেন।

গত রবিবার রাতে ঘটনাটি ঘটেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের উত্তর বগাচতর গ্রামে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই গ্রামের বাসিন্দা বীর মুক্তিযো’দ্ধা জালাল আহমেদ জ্বর-সর্দিতে ভুগছিলেন। রবিবার সকালে শ্বাসক’ষ্ট শুরু হয়। এ সময় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবার জন্য সিএনজি অটোরিক্সা খবর দেওয়া হলেও করোনার ভয়ে আসেনি কোনো গাড়ি। পরে তাকে কোলে করেই বেশ কিছুটা পথ নিয়ে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে তুলে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

সেখানে দুপুর আড়াইটায় তার মৃ’ত্যু হয়। মাগরিবের সময় গ্রামে ডেডবডি এসে পৌঁছায়। কিন্তু একজন বীর মুক্তিযো’দ্ধার জন্যও প্রতিবেশিরা কেউ এগিয়ে আসেননি। এমনকি কবর তৈরীর জন্য একটি কোদাল দিতেও রাজি হয়নি কেউই।

উপজেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক মো. শায়েস্তা খান বলেন, আশপাশে কেউ আসছিলেন না। এতই নিঃস্ত’ব্ধ পরিবেশ যে দিনদুপুরেও যেন ভূতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিলো! একজন বীর মুক্তিযো’দ্ধা মা’রা গেছেন, অথচ তার দাফনে কেউ সহযোগিতা করছিলেন না। এমনকি একটি কোদাল দিতেও আপ’ত্তি সবার। আমি তার ব্যবস্থা করলাম। তারপর ছাত্রলীগের সহপাঠীসহ কয়েকজনকে নিয়ে কবর তৈরী করলাম। কিন্তু গোসল দেয়ার জন্য নেই কেউ!

তিনি বলেন, আমি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম যে, হয়তো এসব কাজ আমাকেই করতে হবে। এজন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন রায় ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুর উদ্দিন রাশেদের কাছ থেকে গাইডলাইন ও ইউএনওর কাছ থেকে পিপিই নিয়ে সৈয়দপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি মেজবাহ উদ্দিন রানাকে ডেকে নিই। উনাকে গোসল দেয়ার জন্য নিয়ম কানুন জানেন, এমন একজনকে পূর্ব থেকে প্রস্তুত রেখেছিলাম। তিনিও আসেননি। পরে জানলাম, তার বাড়ির লোকজন তাকে আসতে দেয়নি। বাধ্য হয়ে আমি, রানা ও বীর মুক্তিযো’দ্ধার পুত্র সদ্য করোনা জয় করে আইসোলেশনে থাকা পুলিশ সদস্যকে নিয়ে ৩ জনে গোসল দিই।

ছাত্রলীগ নেতা মো. শায়েস্তা খান আরো বলেন, সকাল থেকে রাত অবধি তার দাফন সম্পন্ন করা পর্যন্ত সিএনজি না আসা, কবরের জন্য কোদাল না দেওয়া, তাকে গোসলের মানুষটি না আসা, দাফন করতেও ভয়- এমন চিত্র আমি আগে কখনোই দেখিনি। তবে দাফনের আগে অল্প কয়েকজন নিয়ে জানাজা পড়ানো হয়েছে। তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটি আমার জীবনে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন রায় বলেন, ছাত্রলীগ নেতা শায়েস্তা খানসহ এ কয়েকজন যা করেছেন তা কল্পনাতীত। কেউ যখন বীর মুক্তিযো’দ্ধার গোসলে এগিয়ে আসছিলেন না তখন করোনার সমস্ত ভয়কে জয় করে তারা যেভাবে দাফন সম্পন্ন করেছেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নুর উদ্দিন রাশেদ বলেন, আসলে তিনি করোনায় আক্রা’ন্ত কি না তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবুও ভয়ে কেউ গোসল করাতে যাননি। এ ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ নেতা শায়েস্তা খানসহ কয়েকজন যে ভূমিকা রেখেছেন তার জন্য কোনো প্রশংসাই যথেষ্ট নয়।

শেয়ার করুন !
  • 547
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!