করোনায় নাস্তানাবুদ বাংলাদেশ, অব্যবস্থাপনার জের!

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

করোনা মোকাবেলায় বাংলাদেশ কি পথ হারিয়ে ফেলেছে? একের পর পর সিদ্ধান্তহীনতা, ভুল সিদ্ধান্ত এবং সমন্বয়হীনতার কারণে করোনা সং’ক্রমণ মোকাবেলা নিয়ে বাংলাদেশের এখন কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য স্পষ্ট নয়। কোন পথে যাচ্ছে বাংলাদেশ তা জানেনা কেউ। বিশেষজ্ঞরা একেকজন একেক রকম মতামত দিচ্ছেন, কিন্তু আসলে বাস্তব পরিস্থিতি কী বা করোনা সং’ক্রমণ কতদিনে যাবে, মানুষ কবে স্বাভাবিক জীবনে যাবে, কীভাবে করোনা মোকাবেলা করা হবে এবং করোনা সং’ক্রমণকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে এই নিয়ে কোন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই।

নিউজিল্যান্ড নিজেদেরকে করোনামুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। করোনা সং’কট শুরুর সাথে সাথে নিউজিল্যান্ড সরকারের তরফ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল এবং ধাপে ধাপে সেই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে তারা করোনা সং’ক্রমণ থেকে দেশকে মুক্ত করেছে।

কিন্তু বাংলাদেশে এখন করোনা মোকাবেলার জন্য একের পর এক যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হচ্ছে, সেই পদক্ষেপগুলো আদৌ কতটুকু কাজ করছে বা করছে কি না তা যাচাই বাছাই করা হচ্ছে না। এমনকি করোনা মোকাবেলার এক্সিট প্লান কী- তাও সুস্পষ্ট নয়। একেকবার একেকরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে করোনা মোকাবেলায়। আর এর ফলে এই প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশ কি পথ হারিয়ে ফেলেছে?

টেস্ট নিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক কোন পরিকল্পনা নেই

বাংলাদেশে করোনার সং’ক্রমণের তুলনায় পরীক্ষার হার খুবই কম। গত ১ মাসে বাংলাদেশে মোট পরীক্ষার ২০ থেকে ২১ শতাংশ হারে করোনা পজেটিভ হিসেবে শনাক্ত হচ্ছে। অথচ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনার পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ৪ লক্ষের কিছু বেশি। ১৬ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত একটি দেশে ৪ লক্ষ পরীক্ষা কোন পরীক্ষাই নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরীক্ষার হার বাড়ানো নিয়ে সবসময় বলা হচ্ছে। কারো মতে, বাংলাদেশে এখন র‍্যাপিড টেস্টের দিকে যাওয়া উচিৎ। কারণ প্রচুর নমুনা জমা পড়ছে, মাত্র ৫৫টি ল্যাবে এত পরীক্ষা করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দীর্ঘসূত্রিতার কারণে করোনা পরীক্ষার ঝুঁ’কি বাড়ছে। অথচ কীভাবে সামনের দিনগুলোতে পরীক্ষা করা হবে, পরীক্ষার বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা কী- এই সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কোন পদক্ষেপ নেই।

[এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, চীনেই করোনা ভাইরাসের উৎপত্তি হলেও সুষ্ঠু কর্ম পরিকল্পনার মাধ্যমে তারা করোনা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পেরেছে দ্রুত। অন্যান্য অনেক দেশের মত চীনও র‌্যাপিড টেস্ট কিট ডেভেলপ করেছিল। চীনের তৈরি এন্টিবডি টেস্ট নির্ভর ৯০% সেন্সিটিভ ও স্পেসিফিক। এন্টিজেন নির্ভর rapid test পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবুও কয়েকটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ছাড়া তারা এন্টিবডি টেস্ট ব্যবহার করছে না। শুধুমাত্র কোন নির্দিষ্ট এলাকার রোগের প্রা’দুর্ভাব সম্পর্কে ধারণা পেতে, রোগীর লক্ষণ আছে কিন্তু পিসিআর টেস্টে নেগেটিভ ও কনভালেসেন্ট প্লাজমা থেরাপি দেয়ার ক্ষেত্রে তারা এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে।]

চিকিৎসা পরিকল্পনা অস্পষ্ট

করোনা চিকিৎসা কী- এটা নিয়ে এখনো অ’স্পষ্টতা রয়েছে। বলা হচ্ছে বাড়িতে বসে চিকিৎসা নিতে, মনোবল শক্ত রাখতে বা গরম চা খেতে। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসার পদ্ধতি কী- এই ব্যাপারে একেক হাসপাতালে একেক রকম পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। সবথেকে বড় কথা হচ্ছে, কখন একজনকে আইসিইউতে নিতে হবে বা কখন একজনকে অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে হবে- সেই বিষয়গুলো নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছেনা।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ত্রু’টিপূর্ণ

এখন পর্যন্ত হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ত্রু’টি বের করতে পারেনি সরকার, অথচ করোনা সং’ক্রমণের আমরা ৩ মাস পার হয়েছে। সরকারী হাসপাতালগুলোতে যাচ্ছেতাই অবস্থা। করোনার চিকিৎসা লাভজনক মনে করে এখন বেসরকারী হাসপাতালগুলো করোনা চিকিৎসায় মনোযোগ দিয়েছে। ফলে অন্যান্য চিকিৎসাতে ঝুঁ’কি বেড়েছে, অন্যান্য চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম। করোনা চিকিৎসাও যে খুব একটা কার্যকরভাবে হচ্ছে- এমন বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছেনা কোন রোগীর কাছ থেকে।

ওষুধ এবং চিকিৎসা সামগ্রীর মূল্যের লাগামহীন উর্ধ্বগতি

এই সুযোগে কিছু অ’সাধু ব্যবসায়ী ওষুধ, অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনা সং’কটের সময় এদের মুনাফার লোভ মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। এই পরিস্থিতি যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখনই নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে তাহলে এটা আরেকটি দুর্ভাগ্যজনক অধ্যায়ের সূচনা করবে।

করোনা নিয়ে নিরীক্ষা

করোনা নিয়ে শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর একের পর এক এক্সপেরিমেন্ট করছে। সেই এক্সপেরিমেন্টে মানুষকে ব্যবহার করা হচ্ছে গিনিপিগ হিসেবে। প্রথমে বলা হলো, বাড়িতেই আইসোলেশনে থাকতে, এখন আবার আইসোলেশন সেন্টার বানানো হচ্ছে। এরপর প্রথমে বলা হলো, সাধারণ ছুটি, এখন আবার সেই ছুটি শিথিল করা হলো। এখন আবার এলাকাভিত্তিক লকডাউন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ক্ষণে ক্ষণে সিদ্ধান্ত পাল্টাচ্ছে। তাই ভোগা’ন্তি বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনা নিয়ে এখনই একটি সুনির্দিষ্ট রূপপরিকল্পনা দরকার।

শেয়ার করুন !
  • 60
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!