২১টি অ্যাম্বুলেন্স কিনতেই বছর পার করে দিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর!

0

সময় এখন ডেস্ক:

বৈশ্বিক করোনা ভাইরাসের (কোভিড-১৯) মহামা’রির সময়ে বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া সম্ভব হয়নি। এ খাতে বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নেই তাই সম্ভব হয়নি। সক্ষমতা না থাকার নমুনা পাওয়া যায় ২১টি অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ের ক্ষেত্রেও।

চলতি (২০১৯-২০) অর্থবছরের এডিপিতে ২১টি অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ে ৯ কোটি ২৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু অর্থবছরের শেষ মাস জুন পর্যন্ত এসব অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করতে পারেনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অর্থ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তবে অর্থবছরের শেষ মাসে অর্থাৎ গত ৮ জুন এসব অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ে সম্মতি চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই একটি বিষয় দিয়েই বোঝা যায় দেশের স্বাস্থ্যসেবা কতটা উ’পেক্ষিত। কোভিড-১৯ আক্রা’ন্ত রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড অ্যাম্বুলেন্স দরকার। সেটা বিবেচনা করলেও তারা গত জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারি মাসে অ্যাম্বুলেন্সগুলো কেনার ব্যবস্থা করতে পারত। সেটাও করেনি। তাই এক্ষেত্রে দুর্নীতি থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, চলতি অর্থবছর শেষ হতে বাকি আছে আর মাত্র ১৪ দিন। এ অল্প সময়ের মধ্যে কোনো কিছু কেনাকাটা করা হলে সেগুলোর গুণগত মান ঠিক রাখা সম্ভব নয়। এছাড়া তাড়াহুড়া করে কোনো কিছু কেনা হলে সেক্ষেত্রে দুর্নীতিরও সুযোগ থাকে। তাই সম্মতি প্রদানে অর্থ বিভাগ দ্বিধায় আছে।

এদিকে গত ৮ জুন অর্থ সচিব বরাবর চিঠি পাঠিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ২০১৯-২০ অর্থবছরে আরপিএ জওবি খাতের প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানের (গুডস) আওতায় ২১টি অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ে সম্মতি প্রদানে নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানায়।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব হাসান মামুদ স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্টের (এইচএসএম) প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত ওপির ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে আরপিএ (জিওবি) খাতের প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানের (গুডস) আওতায় ২১টি যানবাহন (সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স) ক্রয়ে অর্থ বিভাগের সম্মতি গ্রহণের জন্য পত্র প্রেরণ করা হয়। অর্থ বিভাগ কর্তৃক চাহিত তথ্যাদিও হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট (এইচএসএম) কর্তৃক প্রেরণ করা হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অধীনস্থ এইচএসএমের লাইন ডাইরেক্টর কর্তৃক প্রেরিত তথ্যাদি এর সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। এমতাবস্থায় হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্টের প্রেরিত তথ্য ও প্রস্তাব মোতাবেক উক্ত ওপির ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে আরপিএ (জিওবি) খাতের প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানের (গুডস) আওতায় ২১টি যানবাহন (সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স) ক্রয়ের প্রস্তাবে সম্মতি প্রদানের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো।

এ সম্মতিপত্রের সঙ্গে এ সম্পর্কিত হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্টের (এইচএসএম) লাইন ডাইরেক্টর ডা. মো. খুরশী আলমের একটি চিঠিও সংযুক্ত করা হয়। এ চিঠিতে খুরশী আলম বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নাধীন ৪র্থ এইচপিএনএসপি’র আওতায় “হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট” অপারেশনাল প্ল্যানের ২০১৯-২০ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে প্রাপ্ত বরাদ্দ অনুযায়ী বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (গুডস) অনুমোদিত হয়।

ওই অনুমোদনে “গাড়ি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিতে হবে” এমন শর্ত ছিল। তাই নির্ধারিত ছক পূরণপূর্বক ব্যাখ্যাসহ প্রেরণ করা হয়েছিল। তারই ধারাবাহিকতায় চাহিদা অনুযায়ী নিম্নোক্ত তথ্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নিম্নে প্রদান করা হলো।

স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা খাত কর্মসূচিতে (এইচপিএনএসডিপি) অপারেশন প্লানের (ওপি) আওতায় বরাদ্দকৃত ৭১টি সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সের সংস্থান ছিল। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৫টি ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ২৫টি, মোট ৫০টি অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করা হয়েছে। অবশিষ্ট ২১টি অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। ওপিতে সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স ৭১টি–এর ক্রয়ের সংস্থান আছে।

প্রকল্পটির ওপিতে গাড়ি ক্রয়বাবদ বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ হচ্ছে ৩৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। প্রস্তাবিত গাড়ি চলতি অর্থবছরের বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনার মধ্যে আছে। প্রস্তাবিত গাড়ি ক্রয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের বিভাজন ও সংযুক্ত আছে। প্রস্তাবিত ২১টি গাড়ি ক্রয়বাবদ ছাড়কৃত অর্থের পরিমাণ হচ্ছে ৯ কোটি ২৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অতএব এইচএসএম ওপি’র আনুকূলে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২১টি সাধারণ অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ের প্রশাসনিক অনুমোদন প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হলো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের উপসচিব হাসান মামুদ বলেন, এসব ক্ষেত্রে আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্টের চাহিদা পেলেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করি। গত ৩ জুন আমরা চাহিদাপত্র পেয়েছি। তারপরও ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ে দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাওয়ার জন্য হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্টের লাইন ডাইরেক্টর ডা. মো. খুরশীদ আলমের মুঠোফোনে কয়েকবার যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে এসএমএস দিলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

এ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ড. ফয়জুল হাকিম বলেন, গত বছরের ১ জুলাই এ অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে অথচ তারা অর্থবছর শেষ হয়ে গেলেও অ্যাম্বুলেন্স কেনেনি। এটা দিয়েই বোঝা যাচ্ছে জনস্বাস্থ্যের ব্যাপারে তারা কতটা গুরুত্ব দেয়। বিশেষ করে কোভিড-১৯ আক্রা’ন্ত রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড অ্যাম্বুলেন্স দরকার। সেটা বিবেচনা করলেও তারা গত জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারি মাসে অ্যাম্বুলেন্সগুলো কেনার ব্যবস্থা করতে পারত। সেটাও করেনি।

তিনি আরও বলেন, সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে যে, বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের দিক সম্পূর্ণ অব’হেলিত এবং উ’পেক্ষিত। দেখা যাবে, হয়ত এর সাথে দুর্নীতিও সম্পৃক্ত। হয়ত লেনদেনের কোনো হিসাব-নিকাশ মেলেনি তাই কেনা হয়নি। কিংবা তাদের অ’দক্ষতা, দুটো দিকই এখানে রয়েছে।

গত ১১ জুন সংসদে আগামী (২০২০-২১) অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট উত্থাপন করার সময় অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের বক্তব্যেই স্পষ্ট ছিল যে, চলমান করোনা ভাইরাস মহামা’রির এই সময়ে একটি ভিন্ন ধরনের বাজেট তৈরি করতে হয়েছে এবার। তারপরও স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়নি।

আগামী (২০২০-২১) অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য মোট ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে ছিল ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের তুলনায় যা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। শীর্ষ বরাদ্দের ৫ম অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে গত ১২ জুন বাজেটোত্তর অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, এখানে (স্বাস্থ্য খাত) আরও বরাদ্দ করা গেলে আরও ভালো হতো। টাকা বরাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দুটো জিনিস দেখতে হয়- এক. এই টাকা ব্যয়ের সক্ষমতা কতটুকু, দুই. সরকারের যে কাঠামো, তাতে আমরা ইচ্ছা করলেই বা চাইলেই একটা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ হঠাৎ করে বাড়িয়ে দিতে পারি না। কিংবা হঠাৎ করে কমিয়ে দিতে পারি না।

তিনি আরও বলেন, আমরা যদি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের গত ৫ বছরে কত টাকা খরচ করছে তা দেখি, সেখানে আমরা দেখতে পাব, প্রতি বছর বরাদ্দের চেয়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি খরচ তারা করতে পারেনি। এটা সক্ষমতার অভাব।

অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, এ বছর শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জন্য সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছি। আমরা আশা করি তারা এ বরাদ্দ যথাযথভাবে খরচ করতে পারবে। এজন্য তারা যথাযথ সক্ষমতাও অর্জন করবে।

পরে এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের টাকার অভাব হবে না, তাদের কার্যকর সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া এ খাতের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যদি এই টাকা খরচ করতে পারে, তারা যদি আরও কার্যক্রম নিয়ে আসতে পারে, কোভিড-১৯ মোকাবিলার জন্য যে কোনো সময় এই ১০ হাজার কোটি টাকা থেকে বরাদ্দ দেয়া যাবে।

জাগোনিউজ

শেয়ার করুন !
  • 928
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!