করোনা বিষয়ে রাজনৈতিক জোত্যিষীরা সবাই ভুল?

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

বাংলাদেশে করোনাকালে অনেক জ্যোতিষী তৈরি হয়েছে, আমরা তাদেরকে বিশেষজ্ঞ বলতে চাইনা। কারণ বিশেষজ্ঞরা কথা বলেন বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে এবং বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ দ্বারা। কিন্ত আমাদের বাংলাদেশে করোনাকালে এমন ব্যক্তিরা বিভিন্ন কথাবার্তা বলছেন, যাদের এ বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতাই নেই, বিশেষজ্ঞ হওয়া তো দূরের কথা। তারা এখন করোনার সময়ে পণ্ডিত হয়েছেন। তারা যে কথাগুলো বলছেন, ঠিক যেন জ্যোতিষীদের ভাগ্য গণনার মতোই।

এমন অনেকেই করোনা নিয়ে বক্তব্য রাখছেন যারা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তো ননই, অনেকে চিকিৎসক হলেও অন্য ঘরানার। পেশাগত দায়িত্বও তারা পালন করেন না। যেমন- (ড্যাব) মহাসচিব ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। আবার অনেকে রাজনৈতিক কারণেও বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছেন, যেমন- বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কিংবা সিনিয়র যুগ্ন মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তারা করোনা নিয়ে মানুষকে নানা উপদেশ দিচ্ছেন এবং ভবিষ্যৎবাণী করছেন। যেন জ্যোতিষী!

আর এই জ্যোতিষশাস্ত্রে নেতৃত্ব দেওয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এখন জনগণের স্বাস্থ্য-সুরক্ষা নিশ্চিতের পরিবর্তে জ্যোতিষশাস্ত্রের দিকে মনযোগী। শুরু থেকেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একের পর এক ভবিষ্যৎবাণী করছে, যা করোনাকালে সাধারণ মানুষের জন্য কৌতুকের খোরাক দিচ্ছে। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, এ সময় আরো কিছু জ্যোতিষীর উদ্ভব হয়েছে, যারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম ভবিষ্যৎবাণী করছেন। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে কিছু আলোচিত ভবিষ্যৎবাণীর দিকে যদি আমরা দৃষ্টি দেই-

১. বাংলাদেশে করোনার ব্যাপক বিস্তৃতি হবেনা

করোনা সংক্র’মণের শুরুতেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছিলেন, নানা কারণে বাংলাদেশে করোনা সংক্র’মণের ব্যাপক বিস্তৃতি হবেনা। বাংলাদেশ তরুণ প্রধান দেশ এবং আবহাওয়া ও নানাবিদ বাস্তবতার কারণে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি মা’রাত্মক আকার ধারণ করবে না- এই বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, করোনা মোকাবেলায় কোন প্রস্তুতি দরকার নেই। কিন্তু পরে এই বক্তব্য যে ভুল প্রমাণ হয়েছে সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

২. সাধারণ ছুটি তুলে দেওয়ার পর ব্যাপক সংক্র’মণ হবে

করোনা নিয়ে দ্বিতীয় যে ভবিষ্যৎবাণীটি করা হয়েছিল তা হলো- সাধারণ ছুটি তুলে দেওয়ার পর ব্যাপক সংক্র’মণ হবে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে বাংলাদেশে করোনার ব্যাপক সংক্র’মণ হয়েছে কিছু এলাকাব্যাপী। বাকি এলাকায় করোনা সংক্র’মিত হলেও তা ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি পায়নি বা ভ’য়াবহ আকার ধারণ করেনি। শুধুমাত্র ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের মতো এলাকাগুলোতে দেশের মোট সংক্র’মণের ৭০ ভাগ বিস্তৃত হয়েছে। এ কারণে সাধারণ ছুটি তুলে নিলে সারাদেশে করোনা ছড়িয়ে পড়বে- এই ভবিষ্যবাণীও টিকলো না।

৩. লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে করোনা

বাংলাদেশে অনেক করোনা বিশেষজ্ঞ (জোতিষ্যী) মন্তব্য করেছিলেন, এখন বাংলাদেশে করোনা শনাক্তের হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়বে। অর্থাৎ ২ হাজার থেকে ৩ হাজার, সেখান থেকে ৪ হাজার এভাবে বাড়তে থাকবে। বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে বিদেশি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গণমাধ্যম বাংলাদেশে ৭ লাখ করোনা রোগী আছে বা ১ কোটি করোনা আক্রা’ন্ত হবে এরকম প্রক্ষেপণ করেছিল। যদিও এসবের ভিত্তি কী ছিল তা জানা যায়নি। তবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে করোনা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে না। বরং গত সপ্তাহ ধরে ৩ হাজারের আশেপাশে করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে। শতকরা হার দেখলে দেখা যাবে, ২০ থেকে ২৩ শতাংশের মধ্যেই শনাক্তের হার কয়েক সপ্তাহ যাবত অবস্থান করছে। কাজেই লাফিয়ে লাফিয়ে শনাক্তের হার বাড়ার যে তত্ত্ব, তা সঠিক নয়। এই তত্ত্বের ভিত্তিতে অনেকেই ভেবেছিলেন, বাংলাদেশ হার্ড ইমিউনিটির দিকে চলে যেতে পারে। সাধারণত ৬০ কিংবা ৭০ শতাংশ মানুষ আক্রা’ন্ত হলে সেটাকে হার্ড ইমিউনিটি বলে, তবে সেরকম পরিস্থিতিও হয়নি।

৪. বাংলাদেশে ২-৩ বছর বা তার বেশি সময় করোনা থাকবে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ করোনা আক্রা’ন্ত হওয়ার পর সিএমএইচ-এ চিকিৎসা নিয়েছিলেন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে তিনিও জ্যোতিষীতে পরিণত হন। বাংলাদেশে ২-৩ বছর বা তার বেশি সময় করোনা থাকবে বলে তিনি ভবিষ্যৎবাণী করেন। এই তথ্য কোথা থেকে, কীভাবে পেলেন, তা কেউ জানেনা। অবশ্য পরবর্তীতে তিনি তার মন্তব্যের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছেন। কিন্তু ভবিষ্যৎবাণী বলে কথা! তার এই বক্তব্য জাতিকে উদ্বিগ্ন করলো এবং পরে এই জ্যোতিষীর বক্তব্য আমরা যত্ন করে তুলে রেখেছি।

৫. মাসে ১ লাখ করোনা আক্রা’ন্ত হবে

করোনা নিয়ে সর্বশেষ ভবিষ্যৎবাণীটি করেছেন স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি চীনা বিশেষজ্ঞ দলের বিদায়ী অনুষ্ঠানে বলেন, যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না যায় তাহলে বাংলাদেশে প্রতি মাসে ১ লাখ পর্যন্ত করোনা আক্রা’ন্ত হতে পারে। যখন মানুষকে আশ্বস্ত করার কথা, তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেন আত’ঙ্ক ছড়ানোর কাজ নিয়েছে! এসব কথা বলে করোনা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে- সেটা এক বড় প্রশ্ন। তবে করোনাকালে বাংলাদেশের একটি লাভ হয়েছে, জ্যোতিষীদের ভবিষ্যৎবাণীর ওপর মানুষের অ’বিশ্বাস ও অরুচি তৈরি হয়েছে।

লেখক: ক্বারী ইকরামুল্লাহ মেহেদী
পরিচিতি: শিক্ষক ও গণমাধ্যম কর্মী
পেকুয়া, কক্সবাজার

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!