ভারত-চীনের সমঝোতা এবং শেখ হাসিনার কূটনৈতিক অবস্থান

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

শেষ পর্যন্ত চীনের সঙ্গে সমস্যা মিটিয়ে ফেলতেই হলো ভারতকে। একে তো করোনা, অন্যদিকে এই সময়ে বৃহৎ প্রতিবেশী চীনের সঙ্গে নতুন করে উত্তে’জনা ছড়িয়ে দেওয়ার নীতি যে তাদের জন্য লাভজনক হবে না, এটা বুঝতে ভারত খুব বেশি সময় নেয়নি। যদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি হাঁকডাক কম করেননি। চীনকে তিনি দেখে নেওয়ার হুম’কি পর্যন্ত দিয়েছিলেন। কিন্তু এসবই যে রাজনৈতিক বাগাড়াম্বর ছাড়া আর কিছু না তা বুঝতে সময় লাগলো না।

দুই দেশই দীর্ঘ বৈঠকের পরে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সীমান্ত থেকে তারা সৈন্য প্র’ত্যাহার করবে এবং উত্তে’জনা প্রশমন করবে। দুই দেশের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, তারা শান্তিপূর্ণ এবং আন্তরিক পরিবেশে বৈঠক করেছে এবং ভবিষ্যতে যেন এরকম ঘটনা না ঘটে সেজন্য দুই পক্ষই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিবে।

চীনের সঙ্গে দ্রুত সমস্যা মিটিয়ে ফেলার মধ্য দিয়ে ভারত একটি বিষয় প্রমাণ করলো, চীন- পাকিস্থান নয়, চীনের সঙ্গে চাইলেই যু’দ্ধ করা যায় না। অথচ দীর্ঘদিন ধরেই এরকম একটি কূটনৈতিক ধারণা দেওয়া হচ্ছিল, চীন এবং ভারতের মধ্যে তীব্র বৈ’রিতা রয়েছে। চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে ভারত না-খোশ হবে। বাংলাদেশেও অনেক কূটনৈতিক পণ্ডিত এরকম একটি ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। আর তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন চীন এবং ভারত উভয় দেশের সাথেই সমানতালে সম্পর্ক উন্নয়নের কূটনীতি নিয়ে এগোচ্ছিলেন, তখন অনেকে হায় হায় করে উঠেছিলেন। অনেকে বলেছিলেন এটা ভুল নীতি, এ জন্যে মাশুল দিতে হবে।

বাংলাদেশে ছোটখাটো কিছু হলেই অনেক কূটনীতিককে বলতে শোনা যায়, চীনের সঙ্গে বেশি মাখামাখির কারণে ভারত বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। ভারত মুখ ফিরিয়ে নিলে অনেক সমস্যা হবে। কিন্তু শেখ হাসিনার কূটনীতির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে দেশপ্রেম, দেশের ভালো, দেশের মঙ্গল। সত্যিকার অর্থেই তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যে কূটনৈতিক নীতি, সেই নীতিকে ধারণ করেন, লালন করেন। সেই নীতির মূল কথা হলো- সকলের সঙ্গে মিত্রতা, কারো সঙ্গে বৈ’রিতা নয়।

শেখ হাসিনা খুব ভালো করেই জানেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে অবশ্যই চীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব লাগবে, সহযোগিতা লাগবে। এজন্য চীনের সঙ্গে দুরত্বের নীতি তিনি পরিত্যাগ করেন। চীনের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে এসেছিলেন, এখন বাংলাদেশে যে উন্নয়নগুলো হচ্ছে তার সবগুলোতেই চীন কোন না কোনভাবে যুক্ত। আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এও জানেন, বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু হলো ভারত, বিশেষ করে ১৯৭১ এর মুক্তিযু’দ্ধে ভারতের যে অবদান, তাকে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা কখনো অ’স্বীকৃতি জানান না। শেখ হাসিনা যতবারই ক্ষমতায় এসেছেন ততবারই ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন, সফলও হয়েছেন।

প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে তিনি পার্বত্য শান্তিচুক্তি করেছিলেন, গঙ্গার পানি চুক্তি করেছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে টানা ৩ বারের মতো ক্ষমতায় রয়েছেন এবং এই সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। বিশেষ করে ছিটমহল সমস্যার সমাধান ছিল এক ঐতিহাসিক সাফল্য। একইসাথে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ট্রানজিট সুবিধা তৈরি করা, সমুদ্রসীমার নি’ষ্পত্তিসহ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান তিনি করেছিলেন। শেখ হাসিনার যে অবদানের জন্য ভারত সবসময় শেখ হাসিনাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে তা হলো- জ’ঙ্গিবাদের সাথে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি। বাংলাদেশের ভূমি ভারতের বিচ্ছি’ন্নতাবাদীদের জন্য ব্যবহার করা হতো, এটা সবাই জানে। কিন্তু শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে এটা বন্ধ করেন। জ’ঙ্গিবাদ ও বিচ্ছি’ন্নতাবাদীদের সঙ্গে কোন আপোস নয়- নীতিতে অটল থাকেন।

ভারত খুব ভালো করেই জানে, আজকে যদি বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা না থাকেন, ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ সরকারও যদি থাকে, তবুও এভাবে আর কেউ বিচ্ছি’ন্নতাবাদীদের জন্য বাংলাদেশের দরজা বন্ধ করে দেবে কি না সে ব্যাপারে ভারতের মধ্যেও সংশয় রয়েছে। এই বিবেচনা থেকে শেখ হাসিনাকে সবসময় সম্মান এবং শ্রদ্ধা করে চলার নীতি গ্রহণ করেছে মোদি সরকার।

কংগ্রেসের হাত থেকে মোদি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করার পর অনেকে মনে করেছিল যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সম্পর্কের টানাপোড়েন হবে। কিন্তু বিচ্ছি’ন্নতাবাদীদের ব্যাপারে শেখ হাসিনার আদর্শিক অবস্থানই ক’ট্টরপন্থি বিজেপি সরকারকেও শেখ হাসিনার প্রতি অনুরক্ত করেছে।

আর এখন ভারত-চীনের এই সমাঝোতার মধ্যে দিয়ে শেখ হাসিনার কূটনৈতিক দূরদৃষ্টির আরেকটি প্রমাণ হলো। বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে চীন যে একটি বড় ফ্যাক্টর এবং চীনকে উ’পেক্ষা করে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে অসম্ভব, তা প্রমাণিত হলো ভারত-চীনের এই সমাঝোতার মধ্যে দিয়ে। এতে আরেকটি বিষয় প্রমাণিত হলো, শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টি, তাঁর কূটনৈতিক সাফল্য এবং প্রজ্ঞা। কারণ তিনিই প্রথমে বুঝেছিলেন, উন্নয়নের জন্য চীন-ভারত দুই দেশকেই দরকার।

বাংলাইনসাইডার

শেয়ার করুন !
  • 2.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!