ওয়াসার বিল নিয়ে এমন ‘অনিয়ম-অরাজকতা’ শেষ হবে কবে?

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

এক রিট আবেদনকারীর আবেদনের প্রেক্ষিতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত পানির বর্ধিত দাম আদায় থেকে ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে বিরত থাকতে এই নিষে’ধাজ্ঞা দিয়েছেন মহামা’ন্য আদালত। পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ আইনের ২২ (১) ও ২২ (৩) ধারার বলে পানির প্রকৃত উৎপাদন ও বিতরণ ব্যয়ের সঙ্গে বিক্রয় মূলের সামঞ্জস্য বিধান এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধিজনিত খরচ সমন্বয়ের লক্ষ্যে সরকারের অনুমোদনক্রমে প্রতি ১ হাজার লিটার পানির অভিকর (দাম) আবাসিকে ১১ টাকা ৫৭ পয়সার স্থলে ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা এবং বাণিজ্যিকে ৩৭ টাকা ৪ পয়সার স্থলে ৪০ টাকা নির্ধারণ করে সংশোধিত অভিকর (দাম) ওই আইনের ২৩ ধারা অনুসারে ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হয়েছিলো।

মোট ১১ মডস জোনের মাধ্যমে ঢাকা ওয়াসা ঢাকা মহানগরী ও নারায়ণগঞ্জের কিছু অংশের অধিবাসীদের পানি সরবরাহ করে থাকে। পয়োনিষ্কাশন, যার চার্জ পানির মূল্যের সমপরিমাণ, তা এখনো ঢাকা শহরের সামান্য কিছু এলাকায় আছে মাত্র। তাই সেটা নিয়ে আলোচনা পরে করা যাবে।

করোনা ভাইরাসের কারনে রাজধানীতে মানুষ কমলেও বেড়েছে পানির ব্যবহার। করোনায় মানুষের দৈনন্দিন সূচিতে পরিবর্তন এসেছে। সব স্তর ও শ্রেণির মানুষ নিজেকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। ফলে মহানগরীতে পানির ব্যবহার বেড়েছে। ঢাকা ওয়াসার পরিসংখ্যানও তাই বলছে। তবে পানির অ’পচয় যেন না হয়, সেদিকে নগরবাসীকে সচেতন থাকার অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা ওয়াসা।

রাজধানীতে স্বাভাবিক সময়ে পানির চাহিদা থাকে ২৪০ থেকে ২৪৫ কোটি লিটার। করোনার কারণে নগরীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। অসংখ্য মানুষ রাজধানী ছেড়ে গ্রামে গেছে। তারপরও রাজধানীতে বর্তমানে পানির চাহিদা রয়েছে প্রায় ২৪৮ থেকে ২৫০ কোটি লিটার। ওয়াসার টেকনিক্যাল বিভাগ এরকম দাবি করেছে।

কিন্তু ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, হাত ধোয়াসহ মানুষ নিজে ও বাসাবাড়ি, সড়ক পরিচ্ছন্ন রাখার কারণে এই সময়ে পানির চাহিদা বেড়েছে। ঢাকা থেকে অসংখ্য মানুষ চলে গেলেও পানির চাহিদা কমেনি, বরং বেড়েছে। ওয়াসা বর্তমানে ২৫০ থেকে ২৫২ কোটি লিটার পানি উৎপাদন ও সরবরাহ করছে। ২৬০ কোটি লিটার পর্যন্ত আমাদের উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

ওয়াসার টেকনিক্যাল বিভাগ আর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দেওয়া তথ্যে ২ কোটি লিটার পানির হিসাবের গড়মিল যার বর্তমান ওয়াসার আবাসিক সংযোগের গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত পানির হাজার লিটারের দাম বাজার মূল্য ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা হলে মাসে হিসেবের গড়মিল দাঁড়ায় ৮৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা।

অন্যদিকে ২০১৯ সালের ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অফ গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) -এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, বস্তিবাসী দরিদ্ররা প্রতি হাজার লিটারের পানির আবাসিক মূল্য হারের তুলনায় কমপক্ষে ৭ গুণ বেশি অর্থ প্রদান করেন। এছাড়া অ্যাডভোকেসি এবং যোগাযোগের জন্য ইউএন-ওয়াটার দশকের কর্মসূচি (ইউএনডাব্লু-ডিপিএসি) জানায়, সারা দুনিয়া জুড়ে ৮২৮ মিলিয়ন মানুষ বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক জনবসতিগুলিতে বাস করেন। শহুরে দরিদ্ররা তাদের ধনী প্রতিবেশীদের তুলনায় ১ লিটার পানির জন্য ৫০ গুণ বেশি দাম দেয়, কারণ তাদের প্রায়শই বেসরকারি বিক্রেতাদের কাছ থেকে তাদের পানি কিনতে হয়।

বাংলাদেশে বস্তিগুলোতে পানির সংযোগ দেওয়া হয় যে মালিকের জমিতে বস্তি সেই মালিক তার জমির হালনাগাদ করা কাগজপত্র দিয়ে আবেদন করলে, যা বাস্তবে হয় না বললেই চলে। সাধারণত বস্তির মধ্যে বিভিন্ন মতলবে গঠন করা সিবিএদের মাধ্যমে আবেদন করে। এখানেই আছে শুভঙ্করের ফাঁকি। বস্তিবাসীকে চড়া মূল্য দিতে হয় ওয়াসার পানির, যা গরীব শো’ষণের ফাঁদ। ২০১৪ সালে বস্তি শুমারি অনুযায়ী ঢাকা শহরের দুই সিটি কর্পোরেশনে মোট ৩ হাজার ৩৯৪টি বস্তি রয়েছে, যাতে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭৫ জন লোক বসবাস করছেন। ৬ বছর আগের এই সংখ্যা এখন অনেক বেশি বলে অনুমান করা যায় সহজেই।

বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, ঘনবসতির এলাকায় প্রতিদিন মাথাপিছু ১০০ থেকে ১৫০ লিটার পানি ব্যবহার করে থাকেন। সেই হিসাব ধরা হয় গোসল, টয়লেট ফ্লাশ, কাপড় ধোয়া, ঘর ধোয়া মোছা, রান্না ঘরের বাসনপত্র ধোয়া, রান্না, পানীয় জল সব মিলিয়ে এই হিসাব। ঢাকা শহরের বস্তি বা টিনশেড বাসার সবখানে কী ফ্লাশ করার মত টয়লেট সুবিধা বা প্রতিদিন ঘর মোছার ব্যবস্থা আছে! অভিজ্ঞরা এই প্রশ্ন করেছেন এই কারণে যে, প্রতিবার প্রতিবার টয়লেট ব্যবহার করলে কমপক্ষে ১০ লিটার করে পানি খরচ হয়। তাই বাস্তবে দৈনিক মাথাপিছু গড়ে ১০০ লিটারের বেশি নয় বরং কম পানি খরচ হয়।

অবসরপ্রাপ্ত কিছু সরকারী কর্মকর্তা তাদের অবসরকালীন সময়ে প্রাপ্ত টাকায় নগরীর উপকণ্ঠে ২ বা ২.৫ কাঠার উপর ৫ তলা বাড়ি করে সেই বাড়ি ভাড়া টাকায় জীবিকা নির্বাহ করেন এমন ৭/৮ জনের সাথে কথা বলা হয়। তারা জানান, তাদের বাসায় ভাড়াটিয়ার পরিবারের জনসংখ্যা গড়ে সর্বোচ্চ ৪০ জন। তাদের বিশ্বাস প্রতি মাসে তাদের পানির যে বিল আসে তা সত্যকার বিলের চেয়ে কম করে হলেও ১৫/২০ শতাংশ বেশি। বেশিরভাগ ওয়াসার কর্মীরা মিটার রিডিং নিতে আসে না বা ২/৩ মাস পরে আসে। প্রায়ই আন্দাজে বিল করে। কোন প্রতিবাদ করে লাভ হয় না, কারণ সমাজের বিশেষ প্রভাবশালীরা অজ্ঞাত কারণে তাদের পক্ষে।

বিভিন্ন জোনে ঢাকা ওয়াসা “Program for Performance Improvement (PPI) নামে প্রকল্প চালাচ্ছে বলা জানা গেছে। এই কর্মসূচীর অধীন বিভিন্ন জোনে মিটার রিডিং কালেকশন, বিলিং, বিল পৌঁছে দেওয়া, ইত্যাদি কাজের জন্য টেণ্ডারের মাধ্যমে আউটসোর্সিং করা হয়। অভিযোগ আছে, যারা এই কর্মসূচীর অধীনে চাকরি নেন তারা মোটা অংকের টাকা দেন এই চাকরি নিতে। তার বিনিময়ে ওভার রিডিং দিয়ে পানির বিল করে তা থেকে একটা কমিশন পাওয়া যায় চুক্তির শর্ত অনুযায়ী। এতে ঠিকাদার কর্মচারী দুজনেরই লাভ হয়।

বিভিন্ন জোনে ঢাকা ওয়াসা PPI এতোই জনপ্রিয় হয়েছে, বাংলাদেশের একটা বড় কোম্পানি যাদের দেশে বিদেশে ভোগ্য পণ্যের ব্যবসা আছে তারাও ওয়াসার একাধিক জোনে PPI কর্মসূচীর অধীনে ঠিকাদারি কাজ নেওয়ার প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়ে গেছে।

বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ওয়াসার বিরু’দ্ধে যে সব অভিযোগ মিডিয়ায় প্রচারিত/ প্রকাশিত হয় তা নিয়ে কথা না বলে ভিক্টিমরা আশা প্রকাশ করেন, লক্ষ লক্ষ নিম্ন আয় আর নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের উপর পানির বিল নিয়ে ঢাকা ওয়াসার জু’লুম আর শো’ষণের এবার একটা সুরাহা হতে পারে আদালতের মাধ্যমেই।

লেখক: সায়েদুল আরেফিন
পরিচিতি: সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মী

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!