দাদারাই এখন ‘দাদাগিরি’র চক্করে!

0

বিশেষ প্রতিবদেন:

দক্ষিণ এশিয়ায় ‘দাদাগিরি’র ক্ষেত্রে এতদিন ভারত ছিল সর্বেসর্বা। তুলনামূলক কম শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পানিবন্টন, পারস্পারিক বাণিজ্য, সীমান্ত সমস্যা, বাঁধ নির্মাণসহ নানা ইস্যুতে ভারতের সিদ্ধান্তই যেন ছিল শেষ কথা। সবসময়ী এটা দেখা গেছে, ভারত খরার সময় প্রতিবেশী দেশগুলোতে পানি দেওয়া বন্ধ রেখেছে। আর বৃষ্টির খুলে দিয়েছে বাঁধ। ফলে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ভারতের এমন এক তরফা সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিবেশি দেশগুলোকে বিপা’কে পড়তে হয়েছে। কিন্তু দাদারাই এবার পড়েছে ‘দাদাগিরি’র চক্করে। তাও আবার এমন দুই প্রতিবেশি ভারতকে চোখ রাঙাতে শুরু করেছে, যেটা রীতিমতো অভাবনীয়।

অভিন্ন নদীগুলোর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচের কাজে পানির ব্যবহার নিয়ে ভারতের সঙ্গে বিরো’ধে জড়িয়ে পড়েছে নেপাল ও ভুটান। নেপাল-ভারত সীমান্তে গন্ডক নদীর ওপর যে ব্যারাজ আছে, তার রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নেপাল বারবার বাধা দেওয়ার পর বিহার সরকার এ ব্যাপারে দিল্লির জরুরি হস্তক্ষেপ চেয়েছে। পাশাপাশি, আসামের বাকসা জেলার হাজার হাজার চাষী অভিযোগ করছেন, মিত্র দেশ ভুটান তাদের সেচের পানি আটকে দিয়েছে।

পাকিস্থান ও চীনের মতো দুই শক্ত প্রতিপক্ষকে নিয়ে যখন চরম বি’পাকে ভারত, তখন এই নেপাল ও ভুটানের মতো ক্ষুদ্র দুই প্রতিবেশিও ভারতের অ’স্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে।

নেপালের দাদাগিরি

লিপুলেখ, কালাপানি ও লিম্পুয়াধারার মতো সীমান্তের বিত’র্কিত এলাকাগুলোকে নেপাল নিজেদের মানচিত্রে অন্তর্ভুক্ত করার জেরে দিল্লি ও কাঠমান্ডুর মধ্যে ঠান্ডা ল’ড়াই চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। এখন তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে গন্ডক ব্যারাজ নিয়ে দু’দেশের বিরো’ধ।

বহু বছরের সমঝোতা অনুসারে সীমান্তবর্তী এই ব্যারাজটি ভারতই বরাবর রক্ষণাবেক্ষণ করে এসেছে। কিন্তু এই মৌসুমে টানা ১০ দিন চেষ্টা চালানোর পরও ভারতীয় প্রকৌশলীরা সে কাজে সফল হননি, বুধবারও তাদের ব্যারাজ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে।

বিহারের বাল্মীকিনগর জেলায় গন্ডকের ওপর যে ব্যারাজ আছে তাতে মোট ৩৬টা গেট আছে। এর ১৮টা ভারতের দিকে, ১৮টা নেপালের দিকে। নেপালের দিকে যে ১৮ নম্বর বা শেষ গেট, সেখানে তারা হঠাৎ প্রাচীর তুলে দিয়েছে। ফলে বন্যা মোকাবেলার সরঞ্জাম নিয়ে ভারতের ইঞ্জিনিয়ার ও শ্রমিকরা ওদিকে যেতেই পারছেন না। বাঁধের ডানদিকের অংশ বা অ্যাফ্লাক্সটা বিরাট ঝুঁ’কিতে পড়েছে। গন্ডক দিয়ে রোজ রাতে এখন দেড় লাখ কিউসেক জল প্রবাহিত হচ্ছে। এমন অবস্থায় ভারত যদি মেরামত আর মনিটরিংয়ের কাজই না করতে পারে, তাহলে পুরো উত্তর বিহারই বন্যায় ভেসে যাবে। উদ্বিগ্ন বিহার সরকার এই সং’কটে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়ে বুধবার দিল্লিতে জরুরি বার্তা পাঠিয়েছে।

ভুটানের চোখ রাঙানি

নেপালকে নিয়ে যখন ঘোরতর বি’পাকে ভারত, তখন ভুটানের কাছ থেকেও এলো চাপ। ভুটান সীমান্তবর্তী আসামের বাকসা জেলাতেও ২৫টি গ্রামের বেশ কয়েক হাজার চাষী বিক্ষো’ভ দেখাতে শুরু করেছেন। তাদের অভিযোগ, ভুটান সরকার তাদের অভিন্ন নদীগুলোর সেচের জল ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধা দিচ্ছে, যে ধরনের ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটা আসলে লকডাউনে ভুটান সীমান্ত সিল করে দেওয়ার কারণেই হয়েছে। ভারতের চাষীরা এতদিন অবাধেই সীমান্ত পেরিয়ে ভুটানের দিকে চলে যেতেন, তারপর ছোট ছোট নদীর ধারাগুলো সুবিধেমতো চ্যানেল কেটে নিজেদের চাষের ক্ষেতে সেচের জন্য নিয়ে আসতেন। সীমান্ত এখানে শিথিল, দু’দিকের স্থানীয় লোকজন বিনা বাধাতেই এপার-ওপার যাতায়াত করেন, কাজেই কোনও অসুবিধা হত না। কিন্তু এখন সীমান্তে কড়াকড়ি। ফলে বি’পাকে পড়েছে ভারত।

বিশ্লেষকরা বলেন, নেপাল বা ভুটানের সঙ্গে ভারতের এই ধরনের বিরো’ধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে আসলে দু’পক্ষেরই দায় আছে। বিহার সরকার বাঁধ মেরামতের কাজ এই জুন মাসে, এত দেরিতে শুরু করল কেন? এটা তো অনেক আগে, সেই শীতেই করা দরকার ছিল। ফলে তারা যেমন শুধু নেপালকে দোষ দিতে পারে না, তেমনি নেপাল ও ভুটানেরও আরেকটু পরিণতিবোধ দেখানো উচিত ছিল।

পরিবেশকর্মীরা বলছেন, নদী, জলধারা বা হিমবাহ তো কখনও একটা দেশ বা জাতির নিজস্ব সম্পত্তি হতে পারে না, সেখানে সবার আগে দাবি মানুষের। সেটা ভুলে গিয়ে যদি আমরা সেই মানুষগুলোকেই কোণঠাসা করি, সেটা খুবই অ’ন্যায়। যা এতদিন করে এসেছে ভারত। আর এবার তাদের সঙ্গেই সেই অ’ন্যায়টা হচ্ছে।

লেখক: অর্চি হক
সূত্র: বিবিসি

শেয়ার করুন !
  • 195
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!