চুনোপুঁটি ধরে রাঘব বোয়ালদের বাঁচাচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর?

0

বিশেষ প্রতিবেদন:

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট বন্ধের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৎপর হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিন্ডিকেট ভাঙার তোড়জোর শুরু হয়েছে। তখন হঠাৎ করেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এক নতুন কৌশল অবলম্বন করলো। ১৪টা চুনোপুঁটি কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। অথচ এই কোম্পানির একটাও মাস্ক কেলে’ঙ্কারি, সুরক্ষা সামগ্রী দেওয়া কিংবা পিপিই কেনার নামে হরিলুট করেনি।

গত কিছুদিন ধরেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি বন্ধের জন্য ব্যাপক পরিবর্তন এনেছেন। একের পর এক সেখানকার কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করা হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই চুনোপুঁটি ১৪টি কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করলো বলে মনে করা হচ্ছে।

মজার ব্যাপার হলো, সেখানে জেএমআই নেই। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে তাদের দুর্নীতির কথা বলেছেন। তিনি সেখানে স্পষ্ট করে বলেছেন, কীভাবে মাস্ক নিয়ে দুর্নীতি হচ্ছে। করোনা ভাইরাসে আক্রা’ন্ত অথবা সন্দেহভাজন রোগীদের চিকিৎসা করার জন্য ডাক্তার-নার্স এবং অন্যান্যদের সুরক্ষায় এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের জন্য জেএমআই গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে জেএমআই গ্রুপ এন-৯৫ মাস্ক নামে ২০ হাজার ৬০০ মাস্ক সরবরাহ করে। পরবর্তীতে দেখা যায় ওই মাস্কগুলো প্রকৃতপক্ষে এন-৯৫ মাস্ক নয়, একটি সাধারণ মাস্ক সাপ্লাই দেওয়া হয়। এখন পর্যন্ত এ প্র’তারণা ও অ’বৈধ কর্মকাণ্ডের জন্য কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিধায় জেএমআই গ্রুপের বিরু’দ্ধে তদন্ত কমিটি এবং এর সঙ্গে জড়িতদের সাজা তথা জেএমআই গ্রুপের মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট সাপ্লাইয়ের এবং ম্যানুফ্যাকচারিং লাইসেন্স সাসপেন্ড করা এবং তাদের বিরু’দ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহল বলছে। কিন্তু কিছুই হয়নি এতদিনে।

আরো আশ্চর্যের বিষয়, স্বাস্থ্য খাতে মাফিয়া ডন বলে খ্যাত ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর কোন কোম্পানির নাম নেই এই কালো তালিকায়। তার লাগামহীন দুর্নীতি ও জালিয়াতির তদন্ত নিয়ে কোন কথাও নেই। ৪ বছর ধরে এ বিষয়ে টুঁ-শব্দটি নেই। চুনোপুঁটিদের ‘কালো তালিকায়’ রেখে কার ছত্রছায়ায় বারবার বেঁচে যাচ্ছেন মিঠু তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সর্বমহলে। মিঠুর অঙ্গুলি হেলনেই চলছে স্বাস্থ্য খাতের যাবতীয় টেন্ডার, সরবরাহ ও কেনাকাটার কাজ। বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়েছে। সারাদেশের মানুষ এখন এই মিঠুকে এক নামে চেনে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা মন্ত্রণালয় কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ২০১৬ সালে বিশ্ব তোলপাড় করা পানামা পেপারস কেলে’ঙ্কারি সংশ্লিষ্টতায় বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থপাচা’রকারী হিসেবে যে ৩৪ বাংলাদেশির নাম এসেছিল, এই মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু তাদের একজন।

মিঠুর লেক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ এবং টেকনোক্র্যাট লিমিটেড নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া যন্ত্রপাতি সরবরাহ না করেও কোটি কোটি টাকার বিল তুলে নেওয়ার অসংখ্য ঘটনাও ঘটেছে। কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের (সিএমএসডি) বিদায়ী পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শহীদউল্লাহ গত ৩০ মে জনপ্রশাসন সচিবের কাছে লেখা এক চিঠিতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির কিছু তথ্য তুলে ধরেন। তাতে তিনি স্পষ্টভাবেই ঠিকাদার মিঠুর নাম উল্লেখ করেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে ঠিকাদার মিঠু কীভাবে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সেই তথ্যও চিঠিতে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ওষুধাগারের (সিএমএসডি) বিদায়ী পরিচালক।

মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু সিন্ডিকেট টানা বছরের পর বছর ধরে গোটা স্বাস্থ্য খাতে শক্ত জাল বিস্তার করে আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিএমএসডি, স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরো, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ, ওষুধ প্রশাসন, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, নার্সিং অধিদপ্তর, প্রতিটি মেডিকেল কলেজ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানসমূহে আছে মিঠুর বিশ্বস্ত এজেন্ট। তাহলে এই মিঠুকে বাদ দিয়ে কীভাবে কালো তালিকাভুক্ত করা যায় কাউকে? মিঠু ছাড়া বাকি কী থাকে? যারা এই করোনাকালীন দুঃসময়ে অ’বৈধ ব্যবসা চালিয়ে গেল তাদেরকে কালো তালিকাভুক্ত না করে মিঠু সিন্ডিকেট না ভেঙে চুনোপুঁটিদের ধরে লাভ কী হবে?

উল্লেখ্য, কালো তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো হলো- রহমান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল ও রূপা ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী ও দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেরানী আবজাল হোসেনের স্ত্রী রুবিনা খানম, মেসার্স অনিক ট্রেডার্সের মালিক আবদুল্লাহ আল মামুন, মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজের মালিক মুন্সী ফররুখ হোসাইন, মেসার্স ম্যানিলা মেডিসিন অ্যান্ড মেসার্স এসকে ট্রেডার্সের মালিক মনজুর আহমেদ, এমএইচ ফার্মার মালিক মোসাদ্দেক হোসেন, মেসার্স অভি ড্রাগসের মালিক মো. জয়নাল আবেদীন,

মেসার্স আলবিরা ফার্মেসির মালিক মো. আলমগীর হোসেন, এসএম ট্রেডার্সের মালিক মো. মিন্টু, মেসার্স মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. আবদুস সাত্তার সরকার ও মো. আহসান হাবিব, বেঙ্গল সায়েন্টিফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোংয়ের মালিক মো. জাহের উদ্দিন সরকার, ইউনিভার্সেল ট্রেড করপোরেশনের মালিক মো. আসাদুর রহমান, এএসএলের এমডি ও সিইও আফতাব আহমেদ ও বেয়ার এভিয়েশনের মালিক মো. মোকছেদুল ইসলাম।

বাংলাইনসাইডার

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!