শহীদ নূর হোসেনের মৃত্যুর আগে তোলা সেই ছবির নেপথ্যে

0

ফিচার ডেস্ক:

প্রখ্যাত আলোকচিত্রী পাভেল রহমান। ইতিহাসের বহু ঘটনার ছবি উঠে এসেছে তার ক্যামেরায়। বাংলাদেশের বহু ঘটনা-দুর্ঘটনা-দুর্যোগের সাক্ষী তিনি। উপকূলের ঘুর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়া মানুষ, ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের ঘরোয়া পরিবেশে পাইপ মুখে লুঙ্গি পরা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি- এভাবে তার ক্যামেরায় ধরা পড়া অনেক ছবিই এখন ইতিহাসের অংশ।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা নূর হোসেনের বিখ্যাত ছবিটিও এই গুণী আলোকচিত্রীরই তোলা। আজ (১০ নভেম্বর) নূর হোসেন দিবস। তাই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনের সেই বিখ্যাত ছবি তোলার স্মৃতিচারণ করে ফেসবুকে স্টাটাস দিয়েছেন পাভেল রহমান।


ছবি: পাভেল রহমান। তার ফেসবুক থেকে নেওয়া

এতে তিনি লিখেছেন-

“নূর হোসেন, গণতন্ত্র মুক্তি পাক আর আমি।
১০ নভেম্বর, ১৯৮৭ সাল।

সন্ধ্যার পর দৈনিক ইত্তেফাকের ডার্ক রুমে মহাব্যস্ত বিখ্যাত দুই ফটোগ্রাফার রশিদ তালুকদার, মোহাম্মদ আলম। সারাদিনের উত্তপ্ত ঢাকার রাজনৈতিক আন্দোলনের ছবি ডেভেলপ করছিলাম আমি আর মোহাম্মাদ আলম। এনলারজারে ছবি প্রিন্ট করছেন রশিদ তালুকদার। আমাদের তিন জনের তোলা ১২টা ৩৫ মিলিমিটারের ফিল্ম। ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা- প্রায় ১২ ঘণ্টায় ঢাকার রাজপথে আমরা ছিলাম সবাই ক্লান্ত।

প্রেস ফটোগ্রাফির এই এক বড় চ্যালেঞ্জ। ছবি তোলার পর সারাদিন যতো ক্লান্তি আসুক না কেন, ছবি প্রিন্ট করে ক্যাপশন লিখে সাবমিট করতে হবে, তারপর ছুটি। আর আজ তো কথাই নাই। রশিদ তালুকদার দেখে শুনে বুঝে ছবি প্রিন্ট করছেন। আজ অনেক ঘটনা। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ছবি যেন মিস না যায় সেই দিকে আমাদের সজাগ দৃষ্টি। আমরা দু’জনই রশিদ ভাইকে সহযোগিতা করছি। এমন সময় ডার্ক রুমের কড়া নড়ে উঠলো।

‘কে, কে’, রশিদ ভাই জানতে চাইলেন। বাইরে নিউ নেসানের জুনিয়র রিপোর্টার তারেকের আওয়াজ। ‘পাভেল ভাই, আপনি যে ছেলেটার কথা বলেছিলেন, শরীরে লিখে এসেছিলো, সেই ছেলেটি মারা গেছে। ছবিটা অবশ্যই প্রিন্ট করবেন তো। তারেকের কথায় রশিদ ভাই চমকে উঠলেন, আলম ভাইও, ‘কোন ছেলেটা মারা গেছে পাভেল?’

আমি অন্ধকারে নিজেকে লুকাতে চেষ্টা করি। আমি ভাবছিলাম, ওটা আমার এক্সক্লুসিভ ছবি। তাই কাউকে বলতে চাইনি। যদিও আমরা একই গ্রুপের কাগজ। ইত্তেফাক আর নিউ নেসান। তারপরও আমার ছবিটি ইংরেজি দৈনিকে এক্সক্লুসিভ থাকুক ভেবেছিলাম। কিন্তু তারেক একি করলো? এমনভাবে হাটে হাড়ি ভাঙল! রশিদ ভাইকে কি উত্তর দেই? আমতা আমতা করে বললাম, ‘ঐ যে একটা ছেলে শরীরে লিখে এসছিলো, আমি ছবি তুলছিলাম। ও নাকি মারা গেছে। তারেক তাইতো বলল।’ আমি খুব সতর্ক হয়ে দায়সারাভাবে বললাম ব্যাপারটা। রশিদ ভাই বললেন, ‘সে যাই হোক, নেগেটিভ কোথায়?’ বললাম, ‘এখানেই আছে। আপনি ছবি প্রিন্ট করতে থাকেন, আমি দিচ্ছি।’

আমার মাথায় তখন ছবিটাকে বাঁচানোর চিন্তা। ইত্তেফাক যেন না পায়। ওটা আমার নিউ নেসানের এক্সক্লুসিভ! ১০/১২ মিনিট কেমিক্যালে কাজ করার পর আমি বললাম, ‘আমি একটু ওয়াসরুমে যেতে পারি?’ রশিদ ভাই বিরক্ত হলেন, বললেন, ‘এতো কাজ আজ, তোমার আবার ওয়াসরুমে যাবার সময় হলো?’ আমি বললাম, ‘যাবো আর আসবো।’ রশিদ ভাই বললেন, ‘তাড়াতাড়ি আয়।’ আমি ছুটলাম ৩ তলায় নিউ নেসানের নিউজরুমে।

তারেককে সামনেই পেলাম, ‘তারেক আপনি তো আমার এক্সক্লুসিভের বারোটা বাজিয়েছেন। ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ ছবিটা তো ইত্তেফাকে চলে যাচ্ছে! রশিদ ভাই আপনার কথায় জেনে গেছেন, ঐ ছবিটা আমি তুলেছি।’ তারেক লজ্জিত হলেন, বললেন, ‘কী করা যায়?’ আমি বললাম, ‘আপনি একটু অভিনয় করতে পারবেন? আপনি আবার আসেন ডার্ক রুমে এবং জোরে জোরে বলবেন, ‘ঐ ছেলেটা মরেনি, খবরটা ভুল ছিল।’

তারেক আমি ফিরে যাবার পরই এলেন ডার্ক রুমে, আর জোরে জোরে আওড়ে চললেন আমার বানানো বুলি। তাঁর কথা শুনে রশিদ ভাই হাফ ছেড়ে বললেন, ‘থাক আর লাগবে না। আজ এতো ছবি। ছেলেটা না মরে থাকলে বাদ দে। দরকার নাই।’

রশিদ ভাই যত না বাঁচলেন তার চেয়ে যে আমি বাঁচলাম! রাতে একটু পরের দিকে আমি একা ডার্ক রুমে এসে ছবিটা প্রিন্ট করে নিউজরুমে নিয়ে এলাম। সে সময়ের বার্তা সম্পাদক ছিলেন আমানউল্লাহ কবীর। পুরো অফিস স্টাফ ছবিটির সামনে ভিড় জমিয়ে তুলল। স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ছবিটি ছাপা হবে কিনা- এই নিয়ে বাধার সম্মুখীন হলো বেশ কিছু সময়।

কোনভাবেই ছাপানো যাবে না- এমনই যখন পরিস্থিতি তখন আকস্মিক রাত ১টার দিকে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ছবিটি প্রকাশে সম্মতি দিলেন। তবে প্রথম পাতার ফোল্ডার নিচে। মাত্র দুই কলামব্যাপী ছাপার অনুমতি মিলল। লিড করা যাবে না।

১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর ছবিটি ঢাকায় নিউ নেসান পত্রিকায় এক্সক্লুসিভ ছবি হিসেবে (এককভাবে) ছাপা হলো। ছাপার পর একটি ছবি লক্ষ শব্দের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠলো। বিদ্যুৎ গতিতে সেই বার্তা সারাদেশে ছড়িয়ে গেল এবং স্বৈরাচারের পতনের ঘণ্টা বেজে উঠেলো।

আর আমি নিজেকে বাঁচাতে পালিয়ে বেড়িয়েছিলাম ঘর থেকে ঘরে। কারণ স্বৈরাচার আর তাঁর গোয়েন্দা বাহিনী খুঁজছিল আমাকে। প্রচার করছিলো ছবিটি ‘বায়নোয়াট’

আমার এই ছবি এখন জীবন্ত কিংবদন্তি!”

[সমকাল]

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply