আধুনিক শিক্ষা ছুঁড়ে ফেলে মৌ-মেঘলা যেভাবে জঙ্গিবাদে জড়ায়

0

সময় এখন ডেস্ক:

জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়া প্রসঙ্গে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ইসরাত জাহান ওরফে মৌসুমী ওরফে মৌ নিজের জঙ্গিবাদে বলেছে, ‘২০১৩ সালে আমি মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হই। সেই সুবাধে আকলিমা ওরফে মনি ও খাদিজা পারভীন ওরফে মেঘলার সঙ্গে পরিচয় হয়। আকলিমা কোরানে অনেক পারদর্শী ছিল। সে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতো। আমি নিজেও আকলিমার কাছে ইসলাম সম্পর্কে অনেক কিছু জানার আগ্রহ প্রকাশ করি। এভাবেই ধীরে ধীরে আকলিমা আমাকে বদলে দিতে থাকে। তার হাত ধরে নব্য জেএমবিতে যোগ দেই।’

মৌসুমীর মতো আদালতে প্রায় একই রকম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে খাদিজা পারভীন মেঘলা। এই নারীও ২০১৩ সালে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর আকলিমা ওরফে মনির মাধ্যমে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে।

গত ১৬ অক্টোবর নরসিংদীর মাধবদীর ভগিরথীপুর এবং গাংপাড় এলাকায় কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের ‘অপারেশন গর্ডিয়ান নট’-এ দুই নারী জঙ্গি মৌসুমী ও খাদিজা পারভীন ওরফে মেঘলা আত্মসমর্পণ করে। সম্প্রতি নরসিংদীর জেলা জজ আদালতে এই দুই নারী জঙ্গি নিজেদের জঙ্গিবাদে জড়ানো ও কার্যক্রমের বর্ণনা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

ওই মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা নরসিংদীর মধাবদী থানার ওসি আবু তাহের দেওয়ান বলেন, ‘ওই অপারেশনে আত্মসমর্পণকারী দুই নারী জঙ্গি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। জবানবন্দিতে তারা কীভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়েছিল এবং তাদের সহযোগী কারা সেসব তথ্য জানিয়েছে। মামলাটির তদন্ত চলছে। তাদের সহযোগীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।’

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ইসরাত জাহান ওরফে মৌসুমী বলে, ‘আকলিমার কাছ থেকে ধারণা নিয়ে আমি নব্য জেএমবির অনুসারী হই। নব্য জেএমবির কার্যকলাপ বিশ্বাস করতে শুরু করি। আমরা তিনজন মানহাজে বিশ্বাসী। তখন থেকেই আমরা তিনজন গ্রুপ স্টাডি করতাম। ২০১৬ সালে ধানমন্ডির একটি বাসায় শাহপাড় আন্টি নামে এক মহিলার বাসায় ‘হালাকা’ (হালাকা অর্থ একসঙ্গে বসে জিহাদ নিয়ে আলোচনা করা) করতাম। সেখানে আমরাসহ বিভিন্ন বয়সের প্রায় ১০০ জন মহিলা আসতো।’

পটুয়াখালীর বাউফল থানাধীন বিলবিলাস এলাকার বাসিন্দা ইসরাত জাহান জবানবন্দিতে বলে, ‘২০১৬ সালের ১৫ আগস্ট আমাকে, আকলিমা, খাদিজা ও ডা. ঐশিকে র‌্যাব নব্য জেএমবির সদস্য হিসেবে গ্রেফতার করে। এরপর মিরপুর থানায় আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। সাড়ে ৭ মাস জেলখানায় থাকার পর ২০১৭ সালের ৪ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পাই। জামিনে আসার পর ৯ মাস বাসায় থাকি। তারপর ১৭ই ডিসেম্বর মানারাত ইউনিভার্সিটিতে আবারও ভর্তি হই। তখন আবার সবার সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আমি, আকলিমা, খাদিজা আবার গ্রুপ স্টাডি শুরু করি। বিশেষ করে জিহাদ নিয়ে আলোচনা ও নব্য জেএমবির বিভিন্ন ভিডিও দেখতাম। এসময় আমরা বিভিন্ন আইডি ব্যবহার করতাম ও টেলিগ্রাম আইডি ব্যবহার করতাম।’

‘মারিয়া কিবিতি’ ছদ্মনামের মৌসুমী তার জবানবন্দিতে বলে, ‘আমাদের গ্রুপের একজন ‘ইমর্টাল সোলজার’ নামে সদস্য ছিল, তার আসল নাম মোস্তফা। তার সঙ্গে আকলিমার বিয়ে হয়। এছাড়া ‘প্রতিনিধি থমাস ওরফে আর্তুগাল’ নামে একটি আইডির মাধ্যমে খাদিজার সঙ্গে রকিবুল ইসলামের পরিচয় হয়। পরে তাদের বিয়ে হয়। আমাদের গ্রুপে ‘জুন্দুলাহ সাফওয়ান’, ‘ইউরো ফাইটার’, ‘টাইপন’, ‘এলেক্স উইলিয়াম গিবসন’ নামে কয়েকটি আইডি ছিল। আমরা সবাই মিলে জিহাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতাম।’

মৌসুমী জবানবন্দিতে জানায়, ‘আমাদের টেলিগ্রাম গ্রুপের নাম ছিল ‘উই আর…’। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে শাহনাজ নামে আমাদের গ্রুপের একজন সদস্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হয়। শাহনাজ আমাদের নাম বলে দিলে আমরা আত্মগোপনে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। খাদিজার স্বামী রকিবুল হাসান ও আকলিমার স্বামী মোস্তফা আবু আব্দুল্লাহ আমাদের জন্য নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় বাসা ভাড়া করে। সেখানে আমরা বসবাস করতে থাকি। আমি একা (অবিবাহিত), তাই খাদিজাকে বলি আমার জন্য একজন ছেলে দেখতে। খাদিজা তার স্বামী আর্তুগাল ওরফে রকিবুল হাসানকে বললে সে আমার জন্য ‘গ্রীন’ নামে আমাদের এক গ্রুপ সদস্যের সঙ্গে বিয়ে ঠিক করে। কিন্তু বিয়ের আগেই পুলিশ আমাদের আস্তানায় অভিযান চালায়।’

ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘ডন’ সাংগঠনিক নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে নব্য জেএমবি নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে এই গ্রুপের আরও বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান চলছে। এই গ্রুপে একাধিক নারী সদস্যও রয়েছে।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থানের শুরুর দিকে নারীদের জড়িত হওয়ার প্রবণতা কম দেখা গেলেও ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে। প্রথম দিকে শীর্ষ জঙ্গিদের স্ত্রীরাই সহযোগী হিসেবে কাজ করতো। পরবর্তীতে পরিবারের সদস্য বা নিকটাত্মীয় অনেক নারী তাদের পরিচিতদের দ্বারা জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে। তবে গত কয়েক বছরে নারীদের মধ্যে নিজ থেকেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এমনকি জঙ্গিবাদে জড়িয়ে আত্মঘাতী হওয়া, ইরাক-সিরিয়া গিয়ে আইএস এর হয়ে যুদ্ধ করার চেষ্টা বা বিদেশে গিয়ে হামলা করতেও দেখা গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে কাজ করে আসা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ধারার জঙ্গিবাদে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণীদের জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ আত্মসমর্পণের পর গ্রেফতার হওয়া দুই তরুণী মৌসুমী ও মেঘলা জঙ্গিবাদে জড়িয়েছিল। ঐশী নামে তাদের একজন সহযোগী রয়েছে, সে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে।

নরসিংদীতে মৌসুমীর সঙ্গে আত্মসমর্পণকারী আরেক নারী জঙ্গি খাদিজা পারভীন ওরফে মেঘলা তার জবানবন্দীতে বলেছে, ‘আমি ২০১১ সালে ক্যামব্রিয়ান কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি। তবে ভর্তি কোচিং করেও বিশ্ববদ্যিালয়ে ভর্তি হতে না পেরে ২০১৩ সালে মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হই। সেখানে আকলিমা ও মৌসুমীর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। আমরা ইসলামিক বিষয়ে একসঙ্গে গ্রুপ স্টাডি করতাম। তখন থেকেই নব্য জেএমবি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতাম। আমরা মানহাজ বিশ্বাস করতাম। তখন থেকেই আমাদের জিহাদি মনোভাব সৃষ্টি হয়।’

‘আনাতিয়া অ্যাঞ্জেল’ সাংগঠনিক নামে পরিচিত মেঘলা তার জবানবন্দিতে বলে, ‘আমার বান্ধবী আকলিমার ঘনিষ্ঠ ছিল শাহনাজ। আমরা সবাই মিলে ধানমন্ডির শাহপাড় আন্টির কাছে কোরআনের তাফসির বিষয়ে ক্লাস করতাম। ২০১৬ সালের ১৫ আগস্ট অন্যদের সঙ্গে আমিও র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হই। বেশ কয়েকমাস কারাগারে থাকার পর ২০১৭ সালের ১৯ মার্চ জামিনে মুক্তি পাই।’

শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী পশ্চিম বেলতৈলের বাসিন্দা মেঘলা তার জবানবন্দিতে বলে, ‘‘জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর আমি ৭/৮ মাস বাসায় থাকি। পরে আবার ভার্সিটিতে ভর্তি হই। সেখানে আবার আকলিমা, মৌসুমী ও শাহনাজের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। আমরা সবাই মিলে ফেসবুক ও টেলিগ্রাম আইডির মাধ্যমে ‘উই আর…’ নামের একটি গ্রুপে আলোচনা করতাম। সেখানে ‘প্রতিনিধি থমাস’ নামে এক আইডির সঙ্গে পরিচয় হলে পরিবারের সম্মতি ছাড়াই আমি তাকে বিয়ে করি।’’

মেঘলা বলে, ‘ধীরে ধীরে আমাদের জিহাদের প্রতি মানসিকতা গভীর হয় এবং আমাদের গ্রুপের সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু গত সেপ্টেম্বর মাসে আমাদের এক গ্রুপ সদস্য গ্রেফতার হলে সে আমাদের নাম পুলিশের কাছে বলে দেয়। তখন আমি, মৌসুমী, আমার স্বামী প্রতিনিধি থমাস ওরফে আর্তুগাল ওরফে রাকিবুল হাসান, আকলিমা, আকলিমার স্বামী মোস্তফা ওরফে আবু আব্দুল্লাহ মিলে মাধবদী এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা শুরু করি।’

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply