বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মনোনয়ন প্রসঙ্গ

0

মুক্তমঞ্চ ডেস্ক:

সকল নাগরিকেরই গণতান্ত্রিক অধিকার আছে নির্বাচনী মনোনয়নপত্র ক্রয়ের। শুধু সামান্য কিছু শর্ত সাপেক্ষে কিছু যোগ্যতার ভিত্তিতে তা ক্রয় করলেই হয়। ভোট দেয়ার মালিক দেশের জনগণ, তারা আগে থেকেই তাদের পছন্দের নেতা বা নেত্রীকে পছন্দ করে রেখেছেন। আর সেই নেতাই যে বিজয়ী হবেন কেউ বলতে পারে না, তবুও মানসিক শান্তি তাদের পছন্দের মানুষটিকে ভোট দিতে পেরেছেন।

এই নিয়ে বাংলাদেশের ১১তম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এবারের নির্বাচনে মানুষের সর্বাধিক স্বতস্ফূর্ততা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের মানুষ এবার সর্বকালের সবচাইতে সাবলম্বীও বটে, এটা বিগত সরকারের সফলতা। টাকার ছড়াছড়িও কম হবে না এবার। আর সংঘাতও হওয়ার সম্ভবনা সর্বকালের সর্বাধিক পরিমাণও। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো যারা বিগত দিনে রাজনৈতিক ভুলের কারনে মারপ্যাঁচে ধরা খেয়েছেন রাজনৈতিকভাবে ক্ষতি গ্রস্ত হয়েছেন তারা এবার হাত গুটিয়ে বসে থাকার বান্দা নয়, তারাও তাদের সর্বোচ্চ দেখানোর চেষ্টা করবেন। নয়ত তাদের অস্তিত্ব বিলীন হবে কোন সন্দেহ নাই। কর্মী শূন্য হয়ে পড়বে দলটি।

আর সবচাইতে বড় বিষয় আমার দেশের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী আন্তরিকভাবেই চান একটি সর্বদলীয় পার্লামেন্ট, তা না হলে উনি গত নির্বাচনেও এত বড় বড় লোভনীয় প্রস্তাব দিতেন না। শুধু তাদের নেতাদের ভুলের কারনে তারা নির্বাচনের ট্রেন ফেইল করেছিল। এই বারও জননেত্রী শেখ হাসিনা তার উদারতা ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সাথে সৌহার্দপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে বার বার প্রমাণ করছেন তিনি গনতন্ত্রের মানস কন্যা। শুধু বড় বড় বুলি নয় কাজে প্রমাণ দিচ্ছেন।

আমি বাংলাদেশের বয়ঃবৃদ্ধ এবং ঢাকা এবং তার আশেপাশের এলাকাগুলোর মনোনেয়ন আর নির্বাচনী পরিকল্পনার ত্রুটি নিয়ে আলোকপাত করার উদ্দেশেই লিখতে বসেছি। যদিও মনে হয় না এতে কারোর ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবে। তবুও মনের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হলে মানসিক শান্তি পাব। মনে হবে আমার দেশের উচ্চ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকরা চাইলে বিষয়গুলো বিবেচনায় আনতে পারেন।

ঢাকা শহরে বঙ্গবন্ধুকে সহপরিবারে হত্যার পর থেকে আওয়ামী লীগ খুব একটা শক্ত ঘাঁটি তৈরী করতে পারেনি। সেই সাথে আরেকটি বড় ভুল ছিল হায়ার করা বহিরাগত নেতাদের ঢাকা শহরের স্থানীয় রাজনীতিতে স্টাবলিশ করানোর চেষ্টা। বঙ্গবন্ধুর শহীদ হওয়ার পর থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এবং বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে রাজধানী ঢাকাই আওয়ামী লীগের মূল ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। আর তা ধরে রাখতে হলে স্থানীয় যোগ্য নেতৃত্বেকে জায়গা করে দিতে হবে, এর কোনো বিকল্প নাই। এবারে নির্বাচনে লড়াই হবে সমানে সমান। এই লড়াই এ মুজিব সৈনিকেরা জেতার সম্ভবনা ১০০% থাকলেও সাবধানী হওয়া জরুরী।

লোকাল নেতাদের হাতে নেতৃত্ব দিলে তাদের আত্মবিশ্বাস থাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত, অলি গলি আকাশ বাতাস সবই থাকে তাদের দখলে। শুধু তাই না, এই রকম শ’ খানেক পজেটিভ দিক আছে যা শুধু লোকাল নেতৃত্ব দিয়ে সম্ভব। আর আওয়ামী রাজনীতিতে এখন হাজারো যোগ্য নতুন নেতৃত্বের সৃস্টি হয়েছে, যাদের দিয়ে ঢাকা শহর নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। বহিরাগতদের এখন ঢাকা শহরে খাওয়া নাই। যেমন- রাশেদ খান মেনন, কাজী ফিরোজ, কামরুল ইসলাম, নানক ভাই।

নানক ভাইয়ের কেন্দ্রীয় দাপট আর মনোনয়ন নিয়ে গত এক বছর ধরেই মোহাম্মদপুরে আওয়ামী লীগের সাদেক খানের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল এবং তাদের দ্বন্দ্বের জেরে একাধিক সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে। যা দেশে আরো অনেক এলাকায় দেখা গেছে। এই পরিবারের দেশে বিদেশে একটা দুর্নাম রয়েছে। এদের অত্যাচার থেকে দেশবাসী মুক্তি চায়। ঢাকা শহরে ব্যবসায়ীরা অতিষ্ট চাঁদাবাজীর কারনে। ব্যক্তি হিসেবে এদের কোন ক্লিন ইমেজ নেই, এলাকায় জনপ্রিয়তা বা গ্রহণযোগ্যতা নেই। শুধু নৌকা মার্কাই এদের ভরসা।

যেমন- ঢাকা-১৯ (সাভার) এলাকায় এক দূর্ঘটনার কারনে শুধু শুধুই স্থানীয় নেতাকে দোষারূপ করা হল, তার রাজনৈতিক জীবন থেকে মূল্যবান কয়েকটি বছরের সেবা থেকে বঞ্চিত হল এলাকার জনগণ। কোথায় মুরাদ জং আর কোথায় চরিত্রহীন ড: এনাম! তার দোষ- সে তার কর্মীকে ফেলে দিতে পারেনি।

ঢাকা-১৮ এলাকায় সাহারা খাতুনের দুর্বল নেতৃত্বের কারনে আওয়ামী লীগের রাজনীতি এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হত, যদি না স্থানীয় শক্তিশালী নেতা হাবিব হাসান শক্ত হাতে হাল না ধরতেন। সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে লোকবল নিয়ে উত্তরার রাজনীতি চাঙ্গা রেখেছেন। সাহারা খাতুন শারীরিকভাবে খুবই দুর্বল বার্ধক্যজনিত কারনে। এলাকার কোনো উন্নয়ন অগ্রগতি নাই-জনগণও আস্থাহীনতায় ভুগছেন।

দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক দলগুলোর যে সকল নেতা দেশের জন্য সেবা দিতে দিতে আজ দুর্বল হয়ে গেছেন, তাদেরও স্বেচ্ছায় বিদায় নেয়া দরকার। তাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে দল-দেশ প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন উপদেশ নিতে পারে। আমি কাউকে অসম্মান করছি না, সেই ধৃষ্টতা আমার নেই- তারপরও অনুরোধ করব যারা বার্ধক্যজনিত কারনে দুর্বল হয়ে পড়েছেন, অক্ষম হয়ে পড়েছেন- তারা আল্লাহ্‌র ওয়াস্তে তরুণদের জায়গা করে দিন। আপনারা সম্মান আরো বেশী পাবেন, শুধু বিবেক খাটানো প্রয়োজন।

অনেকেই আছেন নিজের নাম ভুলে যান, একজন বলেই বসেছেন আযান শোনা ফরজ না আমার বক্তৃতা শোনেন। বয়সকালে এসব হতেই পারে। বর্তমানে এলাকায় রাজনীতি করতে হাঁটুতে বাহুতে পকেটে জোর থাকতে হয়, কৃপণতা মানুষ একদম পছন্দ করে না। আমি আমাদের প্রিয় আপা সাহারা খাতুন, আবুল মাল আব্দুল মুহিত, সাজেদা চৌধুরী, রহমত আলীসহ অনেক সম্মানিত রাজনৈতিক নেতাকে রিটায়ারমেন্টে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। এনারা দলের জন্য অনেক করেছেন, এদেরকে সুন্দর সুস্থ্য দুনিয়ার আলো বাতাস নিয়ে বাঁচার সুযোগ করে দিতে হবে। দুনিয়াটাকে উপভোগ করার সময় তারা পাননি, সারাজীবন দেশ ও জাতির জন্য করে গেলেন। আবার বিশিষ্ট জনদের হঠাৎ করে আসমান থেকে জমিনে ফেললে অর্থাৎ একজন উচ্চপদস্থ রাজনৈতিক নেতাকে তার পদ পদবী কেড়ে নিলে তার মৃত্যু অবধারিত হয়ে যায়। সেটা না করে উপদেষ্টা হিসেবে থাকতে পারেন তারা।

বিগত দিনে আমরা তাই দেখেছি। ব্যতিক্রম হয়েছিল বিএনপির বদররুদ্দোজা চৌধুরীর ক্ষেত্রে। কারন উনি চিকিৎসক মানুষ, তারপরও উনি বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তাদেরকে অবসরে পাঠানোর পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিনোদন আর কার্যক্রমে ব্যস্ত রাখতে হবে।

মনে পড়ে? বিএনপির মহাসচিব মান্নান, সাইফুর রহমান, আওয়ামী লীগের বাঘা নেতা আব্দুর রাজ্জাক, জলিল ভাই, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত যারা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন তাদের ইতিহাস বলতে চাইনা। বর্তমান আওয়ামী লীগকে যিনি শক্তিশালী করতে বিশেষ ভুমিকা রেখেছেন সেই পরীক্ষিত আমার শ্রদ্ধাভাজন নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ভাই যিনি সততার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছেন। তার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি পরম করুণাময় যাতে ওনাকে দ্রুত সুস্থতা দান করেন।

মহিলা সংরক্ষিত আসনের দাবী করে নারী জাতিকে অনেক ছোট করা হয়- নারীদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হয় তারা নারী, তারা ছোট, দুর্বল, করুণার পাত্র। নারী পুরুষের ভারসাম্যতাহীনতার ব্যবস্থা আমার দেশের সংবিধানেই আছে। এটা একটা মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। এ থেকে যথাশীঘ্র বের হয়ে আসতে হবে। প্রয়োজনে সংসদীয় আসন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। নারীরা মোটেও দুর্বল নন। এই সংরক্ষিত আসনের মাধ্যমে নারীদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হয়। তারা যে পুরুষদের চেয়ে কোন অংশে কম না, তা প্রমাণের কোনো সুযোগই রাখা হচ্ছে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য নেতৃত্বে বহু বছর আগে থেকেই নারীরা আর দুর্বলের সারিতে নেই। আমার দেশে নারীরা অনেক সবল, পুরুষরাই বরং দুর্বলের সারিতে দাঁড়িয়ে আছে।

যারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক সম্রাট বলে খ্যাত এদের একটা তালিকা আমাদের দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আছে। তারা ইতিমধ্যেই নিজেদের মহা ক্ষমতাশালী মনে করতে শুরু করছে। কালো টাকার দাপটে এলাকার স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবেশ বিঘ্নিত করছে। আল্লাহ্ চাহেন তো এই সুযোগেই তাদের কাটছাঁট করে দিতে হবে। মাননীয় নেত্রী চাইলে সবই পারেন। বিগত দিনে উনি রাজনৈতিক কারিশমা তো কম দেখাননি।

নেতা আর অভিনেতা এক বিষয় নয়। একটি সাজানো লিখিত ইতিহাসকে মানুষের সামনে সুন্দর করে উপস্থাপন করা অভিনেতা বা শিল্পীর কাজ। তার সুক্ষ্ম শিল্পগুণের মাধ্যমে তারা মানুষকে বিনোদন দিবেন এইটাই বাস্তব। আর নেতারা হচ্ছেন স্বপ্নের ফেরীওয়ালা। তাদের মিথ্যা স্বপ্নকে জনগণের কাছে ফুটিয়ে তুলে তাদেরকে কনভিন্স করাই এদের কাজ। দুইটা ভিন্ন বিষয়। নেতারা রাজনীতি করে নেতা হয়েছেন, আর অভিনেতারা আপাদমস্তক কসমেটিক। বাংলাদেশে সিনেমা জগতে এখনও দেশের সেরা মাপের যোগ্য লোকেরা যায় না বলেই আমার ধারণা। শুধু তা নয়, সে অন্য প্রতিভার বিষয়। মানুষের ছোট্ট এক জীবনে দুইটা চরিত্রে অভিনয় করার মত বিষয়।

বিগত দিনে নায়িকা কবরী সারোয়ারকে দিয়ে আমরা কোন সুফল পাইনি। তাছাড়া তারানা হালিম একজন ভাল মেধাবী নেতা, কিন্তু তেমন পারফর্ম করতে পারছেন বলে আমার মনে হয় না। আর ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে তারানা হালিমের চেয়ে কেউ বেশী টেলেন্ট আমার চোখে পড়েনি। তবে খেলোয়াড় ২/৪ জন আসতে পারে। রাজনীতিতে স্টার খেলোয়াড়দের যুক্তি বুদ্ধি সাধারণত ভালই থাকে। ফুটবল বা ক্রিকেট দলের নেতৃত্ব দানকারী লোকেরা রাজনীতিতে আসলে জাতিকে কিছুটা হলেও ডিসিপ্লিন দিতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে ফুটবলার জয়কে এতটা গুরুত্ব দেয়া কতটুকু সঠিক ছিল বা উনি উপ-মন্ত্রী হিসাবে কতটুকু সফল দেখার বিষয়।

সেনাবাহিনী বা পুলিশের সাবেক উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের ডিসিপ্লিনের কারনে নিজের জীবন মানুষের তরে বিলিয়ে দিতে পারেন। সাবেক সেনা অফিসারদের অনেক উদাহরণ আছে যারা রাজনীতিতে ভাল করেছেন। তারা দেশ পরিচালনায় যোগ্য। যেমন আমাদের কর্নেল ফারুক ভাই। কী অসাধারণ পারফর্মমেন্স। তাছাড়া বিএনপিতেও কম নাই। মেজর হাফিজ, প্রয়াত হান্নান শাহ, কর্নেল অলি, জেনারেল মাহাবুবরা ভালই করেছেন। পুলিশের দু/চারজন সাবেক কর্মকর্তাকে রাজনীতিতে আনলে মন্দ হয় না। যেমন পুলিশের সাবেক প্রধান নূর মোহাম্মদ ভালই করবেন বলে আমার ধারণা। তবে সবারই ব্যক্তি জীবন খতিয়ে দেখতে হবে, কর্ম জীবনে এরা কতটুকু সৎ নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন।

লেখক: মোহাম্মদ আতিকুজ্জামান সিকদার
পরিচিতি: ফ্রান্স প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতা

** মুক্তমঞ্চ বিভাগে প্রকাশিত লেখার সম্পূর্ণ দায়ভার লেখকের।

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply