দুদকের চিঠি যেতেই চমেক থেকে ‘উধাও’ ২ বছরের টেন্ডার রেকর্ড!

0

সময় এখন ডেস্ক:

দুর্নীতি অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) বিভিন্ন টেন্ডারের নথি চেয়ে দুদকের চিঠি যাওয়ার পর হঠাৎ করেই সেখানে থাকা অনেক রেকর্ডপত্র ‘উধাও’ হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত এরকম উধাও হয়ে যাওয়া ৩১টি নথি সম্পর্কে জানা গেছে। এই নথিগুলো ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের। এদিকে নথি উধাওয়ের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে টেন্ডার শাখার সাবেক এক কর্মচারীকে চমেক আনসার ক্যাম্পে ২ দিন ধরে আটকে রাখা হয়েছে। নথি গায়েবের মূল হোতারা ওই কর্মীকে ‘বলির পাঁঠা’ করার চেষ্টা করছে— এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে।

দুই বছরের রেকর্ডপত্র উধাও হওয়ার পাশাপাশি এদিকে প্রচার করা হচ্ছে, পুরনো নথি ধ্বং’সের অংশ হিসেবে চমেক হাসপাতালের স্টোররুমে থাকা ২০০৮ থেকে ২০১১ সালে হওয়া টেন্ডার সংক্রান্ত কাগজপত্র ইতিমধ্যে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। একেও দুর্নীতির আলামত সরিয়ে ফেলার অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গত রোববার (৪ অক্টোবর) চট্টগ্রামের দুই প্রধান হাসপাতাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে গত ১২ বছরের বিভিন্ন তথ্য চেয়ে চিঠি দেয় দুদক। এতে ২০০৮ সাল থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়িত সবগুলো প্রকল্প ও ক্রয় করা সরঞ্জামের নথি তলব করা হয়। এছাড়া গত ১১ বছরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে দুই হাসপাতালে নিয়োগকৃত জনবলের তালিকা চাওয়া হয়। অন্যদিকে চমেক হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ ও স্টোরের সব নথিও তলব করেছে দুদক। এই সময়ে কেবল চমেক হাসপাতালেই ৫০০ কোটি টাকারও বেশি টেন্ডার হয়েছে।

দুদকের পক্ষে চট্টগ্রাম জেলা সমন্বিত কার্যালয়-২ এর উপ-সহকারী পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন অনুসন্ধানের দায়িত্বে রয়েছেন।

রোববার চিঠি গেলেও গত আগস্ট থেকেই চট্টগ্রামের স্বাস্থ্যখাতে ‘চাঁদাবাজি, সরকারি-বেসরকারি ঠিকাদারি, বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য, কমিশন-ক্লিনিক বাণিজ্য’ নিয়ে অভিযোগ অনুসন্ধানে নেমেছে দুদক। এর কেন্দ্রে রয়েছেন বিত’র্কিত চিকিৎসক নেতা ডা. ফয়সাল ইকবাল চৌধুরী। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদকের পদ ছাড়াও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন তিনি। দুদক ডা. ফয়সাল ইকবালের জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের খোঁজও নেওয়া শুরু করেছে।

এই চিকিৎসক নেতার বিরু’দ্ধে ২০০৯ সাল থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসক নিয়োগ ও বদলি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, চমেক হাসপাতালে কোটি কোটি টাকার খাবার সরবরাহ ও আউটসোর্সিং ব্যবসাসহ বিভিন্ন সরবরাহ কাজের নিয়ন্ত্রণ, মামার প্রতিষ্ঠান জমজম এন্টারপ্রাইজসহ অন্তত ৩টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেনামে টেন্ডারের কাজ হাতিয়ে নেওয়াসহ নামে-বেনামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। চমেক হাসপাতালে শুধু ২০১৯-২০২০ অর্থবছরেই প্রায় ৪২ কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগও রয়েছে ফয়সল ইকবালের বিরু’দ্ধে।

জানা গেছে, টেন্ডারের তথ্য চেয়ে দুদকের চিঠি চমেক হাসপাতালে পৌঁছার পর থেকে স্টোররুমে থাকা বিভিন্ন রেকর্ডপত্র সরিয়ে নিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে অ’নিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। চমেক হাসপাতালের রেকর্ডকিপার ও টেন্ডার শাখার প্রধান মঈনুদ্দীন আহমদ এর অন্যতম প্রধান হোতা বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।

জানা গেছে, দুদকের চিঠি যাওয়ার পরদিন টেন্ডার শাখার প্রধান মঈনুদ্দীন স্টোররুমে ঢোকেন। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্র রাখা হয়। এরপর গত বুধবার (৭ অক্টোবর) তিনি আবার স্টোররুমে যেতে চাইলে নথি গায়েবের তৎপরতা আঁচ করতে পেরে সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্তরা তাকে ঢুকতে বাধা দেন। এই মঈনুদ্দীন ১০ বছর ধরে টেন্ডার শাখার প্রধান হিসেবে কাজ করে আসছেন। এই সময়ে অন্তত ৫০০ কোটি টাকার টেন্ডার হয়েছে চমেক হাসপাতালে। মঈনুদ্দীনের বিরু’দ্ধে টেন্ডার নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে শুরু থেকেই।

এদিকে জানা গেছে, দুদকের চিঠি আসার পর বুধবার (৭ অক্টোবর) টেন্ডার শাখার সাবেক কর্মচারী কাউছার আহমদকে হাসপাতালে ডেকে আনা হয়। চমেক হাসপাতালের পরিচালক এ সময় তার কাছ থেকে ২০১৭ সাল থেকে ২০১৯ সালের টেন্ডার সংক্রান্ত ফাইলের হদিস জানতে চান। এ সময় কর্মচারী কাউছার ৩ মাস আগে স্টোর অফিসারকে সবকিছু বুঝিয়ে দেওয়ার কথা জানালে পরে তাকে চমেক হাসপাতালে কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের হেফাজতে দেওয়া হয়। সেই থেকে তিনি আনসার ক্যাম্পে আটক অবস্থায় রয়েছেন। কাউছার ৩ মাস আগে চমেক হাসপাতাল থেকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ে বদলি হয়ে যান।

জানা গেছে, দুর্নীতিবাজ চিহ্নিত একটি চক্র টেন্ডারের সেনসিটিভ রেকর্ডপত্রগুলো কৌশলে নিজেরা সরিয়ে সাবেক কর্মচারী কাউছার আহমদকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর চেষ্টা করছে। মঈনুদ্দীন যে টেন্ডার শাখার প্রধান, সেই শাখার সহকারী কীভাবে রেকর্ডপত্র লুকাবে— এমন প্রশ্নও উঠেছে। চট্টগ্রাম প্রতিদিন।

শেয়ার করুন !
  • 190
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply