বালিশকাণ্ডের হোতা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শাহাদাতের দেশত্যাগে বাধা

0

পাবনা প্রতিনিধি:

বহুল আলোচিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বালিশ কেলে’ঙ্কারির অন্যতম হোতা শাহাদাত হোসেনের দেশত্যাগে নিষে’ধাজ্ঞা চেয়েছে দুদক। এ ব্যাপারে দুদক যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নজর রাখার অনুরোধ করেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর আদালত থেকে জামিন পেয়ে একই দিন কাশিমপুর জেল থেকে ছাড়া পান শাহাদাত হোসেন।

কৃষকের ১০ বস্তা পেঁয়াজ চুরির অভিযোগে সালিশি বৈঠক করে গ্রামের লোকজন তাকে পি’টুনি দিয়েছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বিএনপি সমর্থিত এমপির ব্যক্তিগত গাড়িও চালিয়েছেন তিনি। আর ওই এমপির বদৌলতে হয়েছিলেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি। আওয়ামী লীগের আমলে মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে ঠিকাদারিসহ নানা ব্যবসার মাধ্যমে হয়ে যান হাজার কোটি টাকার মালিক।

রূপপুরে রাশিয়ানদের আবাসস্থল গ্রিন সিটি নির্মাণের অন্যতম শীর্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের মালিক শাহাদাত হোসেন আবাসিক ভবনে আসবাবপত্র সরবরাহে ব্যাপক অ’নিয়মের অভিযোগে গত বছরের ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতে যান।

তার বিরু’দ্ধে পাবনার দুদক কার্যালয় দুটি আলাদা দুর্নীতির মামলা করে। এতে বলা হয়, রূপপুর প্রকল্পে আসবাবপত্র সরবরাহে অ’স্বাভাবিক দর দিয়ে তারা প্রায় ১৬ কোটি টাকা তছরূপ করেছে। মামলাটি এখনও তদন্ত করছে দুদক পাবনা কার্যালয়।

এ কার্যালয়ের উপপরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, শাহাদাতের আইনজীবীরা গত ৩১ আগস্ট পাবনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে তার জামিনের জন্য আবেদন করেন। শুনানি শেষে পাবনা জেলা ও দায়রা জজ মকবুল আহসান তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। তড়িঘড়ি করে জামিনের আদেশ গাজীপুরের কাশিমপুর জেলে পাঠালে ওই রাতে কাশিমপুর জেল থেকে তিনি ছাড়া পান।

দেশের অন্যতম আলোচিত ওই দুর্নীতিতে রূপপুর প্রকল্পে একটি বালিশ কিনতে ৫ হাজার ৯৫৭ টাকা এবং তা ফ্ল্যাটে তুলতে আরও ৭৬০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। এছাড়া একটি চুলা ক্রয়ে ৭ হাজার ৭৪৭ টাকা এবং তা ফ্ল্যাটে তুলতে ৬ হাজার ৬৫০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। একটি ইস্ত্রি কিনতে ৪ হাজার ১৫৪ টাকা এবং তা তুলতে ২ হাজার ৯৪৫ টাকা ব্যয় দেখানো হয়।

এভাবে রূপপুর প্রকল্পে কেনাকাটায় পুকুর চুরির সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে দুদক তদন্ত শুরু করে। এসব ঘটনায় ইঞ্জিনিয়ার, ঠিকাদারদের বিরু’দ্ধে একাধিক মামলা করে দুদক। দুদকের পক্ষ থেকে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে ঠিকাদার শাহাদাত হোসেন যেন দেশত্যাগ করতে না পারেন সেই ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে।

এ ছাড়া উচ্চ আদালতে শাহাদাতের জামিন বাতিলের জন্য দুদকের পক্ষ থেকে রিভিউ পিটিশন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাবনা জেলা দুদকের সমন্বিত কার্যালয়ের উপপরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন।

প্রসঙ্গত, শাহাদাতের পুরো পরিবার বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তার দুই ভাই সাজ্জাদ হোসেন ও সাখাওয়াত হোসেন বিএনপির আঞ্চলিক নেতা। সাজ্জাদ হোসেন পাবনা জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক। সুজানগর থেকে গত নির্বাচনে ধানের শীষের প্রতীক পেতে মাঠে প্রচারণাও চালিয়েছিলেন সাজ্জাদ।

বালিশ-শাহাদাতের হাজার কোটি টাকার সম্পদের খতিয়ান:

গ্রামে টিনের ঘরের পরিবর্তে এখন হেলিপ্যাডসহ আলিশান বাড়ি। পাশাপাশি পাবনা সদর ও ঢাকার মিরপুরেও রয়েছে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাটসহ বিপুল পরিমাণ জমি। জেলে থেকেও নিজের সাজিন কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের নামে বাগিয়ে নিয়েছেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের ৮৭ কোটি টাকার কাজ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮ সালে পাবনার মানিকহাট ইউনিয়নের উলাট গ্রামের পৈতৃক জমিতে ৮ কোটি টাকায় হেলিপ্যাডসহ নির্মাণ করেছেন আলিশান বাড়ি। ওই বাড়ি থেকে ৫০০ গজ দূরেই কিনেছেন ৩০ বিঘা জমি। ওই জমির বিঘাপ্রতি মূল্য ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা হলে ৩০ বিঘার দাম প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। একই গ্রামে কিনে ও দখ’লবাজি করে ৫৫ বিঘা জমির ওপর ৮টি মাছের খামার করেছেন। জমি কেনা এবং মাছের খামারে বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি। পাবনা শহরের রাধানগর মহল্লায় সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে কয়েকশ গজ দূরে শহরের সবচেয়ে দামি এলাকায় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকায় কিনেছেন ১৯ কাঠা জমি। সেই জমিতে প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন ২০১৭ সালে। এই বাড়ির ছাদের ওপরেও আছে হেলিপ্যাড, আছে নান্দনিক সুইমিং পুলসহ আধুনিক বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা। এ ছাড়া ঢাকার মিরপুরে বিআরটিএর কার্যালয়ের পেছনে আছে একটি ৬ তলা ও একটি ১০ তলা অ্যাপার্টমেন্ট। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় শত কোটি টাকা। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আরো একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়িসহ উত্তরা, গাজীপুর, সাভারেও রয়েছে কয়েকশ কোটি টাকার সম্পদ।

পাবনার সুজানগরের মানিকহাট ইউনিয়নের উলাট গ্রামের রমজান শেখের ছেলে শাহাদাত একসময় উলাট-সুজানগর সড়কে সিএনজিচালক ছিলেন। ২০০০ সালের দিকে মানিকহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সুজানগর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শফিউল আলমের বাবার ক্ষেত থেকে ১০ বস্তা পেঁয়াজ চুরি করতে গিয়ে ধরাও পড়েছিলেন শাহাদাত। শফিউল আলম এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘চুরির পর তার মামার উপস্থিতিতে বিচার হয়েছিল। জমি দখ’লসহ বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে বেশ কয়েকবার আমরা থানায় বসেছিলাম, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।’

শাহাদাত ২০০১ সালে বিএনপি থেকে নির্বাচিত এমপি সেলিম রেজা হাবিবের গাড়িও চালাতেন। হাবিব বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর শাহাদাত আমার সঙ্গেই ছিল। সুজানগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ আসার পর এখন ঠিকাদারি করে কয়েকশ কোটি টাকার মালিকও বনে গেছে।’

মানিকহাট ইউনিয়নের গাবগাছি গ্রামের আব্দুল জলিল, আব্দুল আলীম, ওহাব মিয়া, খন্দকার আব্দুল মোমেন, মো. ইউনুস, মোহনসহ অনেকেই অভিযোগ করেছেন, তাদের জমি জোরপূর্বক দখ’লে নিয়ে শাহাদাত মাছের খামার করেছেন। থানা, পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন কার্যালয়ে অভিযোগ করেও সেই জমি ফিরে পাননি। আব্দুল ওহাব বলেন, ‘আমাদের ১ একর ৬০ শতাংশ জমি দখ’লে নিয়ে গেছে শাহাদাত। সেই জমিতে মাছের খামার করছে। প্রতিবাদ করায় আমার ওপর গু’লিও চালায়, অল্পের জন্য বেঁচে যাই। সুজানগর থানায় গিয়ে মামলার জন্য অনেকবার ঘুরলেও পুলিশ মামলা নেয়নি। একসময় চুরির কারণে মানুষ ধরে পি’টাইছিল, সেই শাহাদাত হেলিকপ্টার নিয়ে এলাকায় আসে। আমরা গরিব মানুষ তাদের ক্ষমতার সঙ্গে পারি কীভাবে?’ আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি আমলে এমপির গাড়ি চালাত, মানুষকে খুব অত্যা’চার করত। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়, এখনো সে আমাগো জমি দখ’লে নেয়, অত্যা’চার করে।’

উলাট গ্রামে শাহাদাতের বাড়ির পাশেই হযরত আলীর বাড়ি। ৯ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত বাড়িতে ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে থাকছে তার পরিবার। সেই বাড়ি কিনে নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালায় শাহাদাত। না পেরে পুলিশের সহযোগিতায় জোর করে দখ’লে নিয়েছিল শাহাদাতের লোকজন। হযরত আলী বলেন, ‘পুলিশ দিয়ে দখ’লে নেওয়ার পর আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় অনেক চেষ্টার পর বাড়িটি পুনরুদ্ধার করি। এখন আত’ঙ্কে আছি জেল থেকে বেরিয়ে আবার বাড়ি দখ’লে নিয়ে যায় কি না।’

শাহাদাত ৪৫ বিঘা ফসলি জমিতে মাছের খামার করায় আশপাশের প্রায় সাড়ে ৩০০ বিঘা জমির মালিক রয়েছেন বিপা’কে। মাছের খামারের কারণে তাদের জমিও ১২ মাসই পানিতে ডুবে থাকে। ধান, পেঁয়াজ চাষ করা যাচ্ছে না। থানা পুলিশ, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন স্থানে আবেদন করেও প্রতিকার পাচ্ছেন না কৃষকরা। তাদের অভিযোগ, এভাবে পানিতে ডুবিয়ে কম দামে ওই জমি কেনার পাঁয়তারা করছে শাহাদাতের লোকজন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে ছাত্রলীগের সাবেক জিএস খন্দকার জাহাঙ্গীর কবীর রানা বলেন, ‘শাহাদাত হোসেনের মাছের খামারের জন্য আমার ১০ বিঘা জমিতে সব সময় পানি জমে থাকে। কয়েকশ কৃষক আর ফসল ফলাতে পারে না। অনেকের জমি দখ’ল করে মাছের খামার করলেও তার ভয়ে গ্রামের নিরীহ মানুষ কিছু বলতে পারে না।’

জানা গেছে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শাহাদাত ঠিকাদারি ব্যবসায় নামে। ঢাকায় এসে পরিচয় হয় মির্জা আব্বাসের ডানহাত খ্যাত যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে শামীমের সঙ্গে। জি কে শামীম ও গণপূর্তের ক্ষমতাধর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিল্লুর রহমানের হাত ধরে এগিয়ে যান তরতর করে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের ‘গ্রিন সিটি’ প্রকল্পে তার সাজিন এন্টারপ্রাইজ ৭টি বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ পায়।

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!