আমদানি বন্ধে ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণের লক্ষ্যে উদ্ভাবন হলো পেঁয়াজ গুঁড়ো

0

বগুড়া প্রতিনিধি:

বগুড়া মশলা গবেষণা কেন্দ্র ‘পেঁয়াজের পাউডার’ উদ্ভাবন করেছে। সঠিকভাবে বাজারজাত করা গেলে পেঁয়াজ সংরক্ষণজনিত পচন এবং লস কমে যাবে তেমনি পেঁয়াজের অভাবও দূর হবে। হলুদ, মরিচ ও ধনিয়ার মত রান্নায় ব্যবহার হবে পেঁয়াজের পাউডার (গুঁড়ো)। মশলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্দ্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মাসুদ আলম এই পাউডার উদ্ভাবন করেছেন।

কাঁচার চেয়ে গুঁড়ো পেঁয়াজ বেশি সাশ্রয়ী ও সংরক্ষণও করা যাবে দীর্ঘদিন। এতে দেশে পেঁয়াজ আমদানির ওপর চাপ কমবে সেই সাথে অর্থনীতির নতুন দ্বার উন্মোচন হবে। এই গুঁড়ো দিয়ে রান্না করলে কাঁচা পেঁয়াজের মতই স্বাদ থাকছে বলে জানান পাউডারের উদ্ভাবক। যদি কোনো কোম্পানী বা উদ্যোক্তা এটি বাজারজাতকরণে এগিয়ে আসেন তো এর সুফল জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যাবে।

গত কয়েক বছরে দেখা গেছে, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা পেঁয়াজ রপ্তানিকারক দেশগুলোর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে মূল্য বৃদ্ধি ঘটে। যার প্রভাব পড়ে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে। পেঁয়াজের দাম বাড়তে বাড়তে সীমা ছাড়িয়ে যায়। চাপ সামাল দিতে সরকারকে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আর মাঝখানে সিন্ডিকেট হাতিয়ে নেয় বিপুল অর্থ। পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে হলে প্রয়োজন প্রচুর হিমাগার। কিন্তু এত হিমাগার নেই দেশে। আর সেসবের রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্টোরেজ ভাড়া নিতে হলেও খরচ যাবে বেড়ে। এই সব সমস্যার সমাধান হতে পারে পেঁয়াজ গুঁড়ো। এতে লম্বা সময় পর্যন্ত গুণগত মান ঠিক রেখে পেঁয়াজ গুঁড়ো দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা সম্ভব।

মশলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্দ্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. মাসুদ আলম জানান, ২০০৯ সালের দিকে পেঁয়াজের পাউডার প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি নিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন। সফলতা আসতে তার সময় লেগেছে ৫ বছর। প্রক্রিয়াজাতকরণ খুব সহজ হওয়ায় ঘরেই বসেই পেঁয়াজের পাউডার তৈরি করতে পারবেন যে কেউ। তার দেখানো পদ্ধতিতে পেঁয়াজের পাউডার বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করা গেলে পেঁয়াজের সং’কট দূর হবে আবার সংরক্ষণজনিত লসও কমবে। যান্ত্রিকভাবে শুকিয়ে পাউডার তৈরী করতে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা আর প্রাকৃতিকভাবে কিছু সময় বেশি লাগবে।

তার দেওয়া তথ্যমতে, মাঠ থেকে সংগৃহীত হয়ে খাদ্যে ব্যবহার করার আগে পেঁয়াজের প্রায় ৩০ শতাংশই পচে যায়। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের ক্ষেত্রে এই সংরক্ষণজনিত লসের হার আরও বেশি; প্রায় ৭০-৮০ শতাংশই পচনের কবলে পড়ে। ৪-৬ জনের একটি পরিবারে মাসে গড়ে ৫ কেজি পেঁয়াজ লাগে। এ হিসাবে একটি পরিবারে বছরে পেঁয়াজের মোট চাহিদা গড়ে ৬০ কেজি। তবে ৬০ কেজি পেঁয়াজ কোনো পরিবারের চাহিদা থাকলে বাজার থেকে কিনতে হয় ৮০ কেজির মতো। কারণ পেঁয়াজ কিনে রাখলে পচে যায়। কিন্তু পেঁয়াজ পাউডার করে রাখলে পচার কোনো সম্ভাবনা নেই। পাউডার বা গুঁড়ো করে ভালভাবে সংরক্ষণ করলে তা থাকবে প্রায় ২ বছর। আর পেঁয়াজ প্রক্রিয়াজাতকরণে গুঁড়ো করলে এর গুণগত মান, খাদ্যে ব্যবহারের পরিমাণ কোনোটাই কমে না। ১ কেজি পেঁয়াজ শুকিয়ে পাউডার পাওয়া যায় ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম।

জানা গেছে, এই প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে প্রয়োজন পেঁয়াজ কাটার যন্ত্র (স্লাইসার), প্লাস্টিকের পাত্র, লবণ, সোডিয়াম মেটা বাইসালফাইড, ড্রায়ার মেশিন (শুকানোর যন্ত্র), পলি ব্যাগ। কয়েকটি ধাপে কাজগুলো শেষ হয়। প্রথমে পেঁয়াজ সংগ্রহ করে বাছাই করতে হয়। বাছাই করা পেঁয়াজ পরিস্কার করে খোসা ছাড়িয়ে নিতে হবে। পরে সেগুলো স্লাইস করে কেটে নিয়ে ভাপ দিতে হয়। ভাপ দেয়া হলে পেঁয়াজগুলো সোডিয়াম মেটা বাইসালফাইড দ্রবণে ডুবিয়ে রাখতে হবে। এরপরের ধাপে পেঁয়াজ শুকাতে হয়। শুকিয়ে গেলে সেগুলো ব্লেন্ডিং (গুঁড়ো) করলেই কাজ শেষ। এখন এই গুঁড়ো মোড়কে ভরে সংরক্ষণ অথবা বাজারজাতকরণ করা যাবে।

পেঁয়াজের গুঁড়ো বা পাউডার সূর্যের তাপে ও যান্ত্রিক পদ্ধতি দুভাবেই করা যায়। দুটোতেই খরচ খুবই সীমিত। খুব সাধারণভাবে যে কোনো উদ্যোক্তারা ঘরে বসেই এই পেঁয়াজের গুঁড়ো উৎপাদন ও সংরক্ষণ করতে পারবেন। এটি ছড়িয়ে দিতে পারলে পেঁয়াজ সং’কট আর থাকবে না।

বগুড়ার শিবগঞ্জে অবস্থিত মশলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ড. মো. মাসুদ আলম জানালেন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কিত গবেষণা করতে গিয়ে তার পেঁয়াজের পাউডার উদ্ভাবনে আগ্রহ জন্মে। পেঁয়াজের পাউডার এখন বাজারজাত করার পর্যায়ে রয়েছে বলে জানান এই কৃষি বিজ্ঞানী।

মশলা গবেষণা কেন্দ্রের এই গবেষক জানিয়েছেন, পেঁয়াজ পচনশীল হওয়ার কারণে বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায় না। তবে পেঁয়াজের পাউডার ২ বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। পাউডার প্রক্রিয়াজাতকরণ করে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ পেঁয়াজের পচন রোধ করাও সম্ভব।

ড. মাসুদ জানান, একটি পরিবারে ১ কেজি মাংস রান্না করতে সাধারণত কাঁচা পেঁয়াজ লাগে ২৫০ গ্রাম। আর এই ২৫০ গ্রাম পেঁয়াজ পাউডার করলে পাওয়া যাবে ২৫ গ্রাম। মাংস রান্নাতে ওই ২৫ গ্রাম পাউডার দিলেই হবে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে কাঁচা পেঁয়াজের চেয়ে রান্নায় পাউডারে খরচও বেশি নয়।

কৃষি গবেষক ড. মাসুদ বলেন, জাপান, চীন, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বহু দেশেই এ ধরনের প্রকিয়াজাতকরণ খাদ্য বা মশলার ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। আমাদের দেশের অধিকাংশ কোম্পানি পণ্য তৈরিতে এসব পাউডার ব্যবহার করে। এ হিসেবে উদ্যোক্তারা দেশে পেঁয়াজের পাউডারের বাজার তৈরি করলে ব্যাপক আয়ের সম্ভবনা রয়েছে।

মশলা গবেষণা কেন্দ্রর দেওয়া তথ্য মতে, বছরে দেশে মোট পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৩৫ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে দেশীয় উৎপাদন ২৩.৭৬ লাখ মেট্রিক টন। আর বাকি ১১ লাখ থেকে ১২ লাখ মেট্রিক টন আমদানি করতে হয়। তবে পেঁয়াজের পাউডার পদ্ধতিতে আমদানি ব্যয় কমবে। এতে সাশ্রয়ী হবে রাষ্ট্রীয় অর্থ।

ড. মাসুদের পেঁয়াজ পাউডার পদ্ধতি প্রসঙ্গে গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হামীম রেজা বলেন, দেশে সব ধরনের মশলাই আমদানি নির্ভর। এজন্য আমরা যত এর চাষ ও বাজারজাতকরণ বৃদ্ধি করতে পারব; ততই লাভ। ড. মাসুদের তৈরি পেঁয়াজের গুঁড়ো পদ্ধতি যুগান্তকারী উদ্ভাবন। এটি বাণিজ্যিকভাবে যদি না-ও কার যায়, ঘরোয়াভাবে করলেও লাভ। এতেও দেশে পেঁয়াজের আমদানির দৌড়াত্ম কমবে।

ড. হামীম আরো বলেন, তবে উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু করতে হলে আমাদের সাথে সমঝোতা স্বাক্ষর চুক্তি (এমওইউ) করতে হবে। কারণ এই গবেষণা আমাদের তথা রাষ্ট্রের। এমওইউ থাকলে আমরাও বিভিন্ন সময়ে তাদের দিকনির্দেশনা দিতে পারব।

শেয়ার করুন !
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply

error: Content is protected !!