শেখ হাসিনার জীবন রক্ষাকারী সেই গাড়িটিই বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ গাড়ি

0

প্রতিরক্ষা ডেস্ক:

সামরিক বাহিনীর কোনো সাঁজোয়া যান নয়। সাধারণ চেহারার একটি গাড়ি, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বাঁচিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন বিরো’ধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার প্রাণ।

বু’লেট কিংবা গ্রেনেড, অথবা মাটির নিচের মাইন। সবকিছুই যেন‌ দু’র্ভেদ্য মার্সিডিজ কোম্পানির তৈরী G63 AMG মডেলের জিপ গাড়িটির কাছে। কীভাবে বাংলাদেশে এলো বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের এ ২/৩ নম্বরে থাকা এই গাড়িটি? জেনে নিই শুরুর কথা।

সময়টা ২০০১ সাল। বিএনপি জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন বিরো’ধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তা প্রটোকল তুলে নেয়া হয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্র’ত্যাহারের পাশাপাশি তাঁর এসএসএফ প্রটোকলও সরিয়ে নেওয়া হয়। মূলত এভাবেই নিরাপত্তাহীন করে দেয়অ হয় তাঁকে। পরবর্তীতে যা আরো স্পষ্ট হয়, এ সবই ছিল সুদূর প্রসারী পরিকল্পনারই একটা অংশ।

৭৫ এর ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর জন্মভূমিতে ফিরে আসাই যেখানে অ’নিশ্চিত ছিল ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে যাওয়া শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার, সেই অ’নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার কথা তুচ্ছ করে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসে দলের দায়িত্ব হাত তুলে নেন। সংগঠিত করে তোলেন নেতাকর্মীদেরকে। কো’ন্দল দূর করে আবারও আওয়ামী লীগকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান। নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকারও গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুর হ’ত্যাকারীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করেন। যু’দ্ধাপরাধীদেরও বিচারের বিষয়ে এগিয়ে নিয়ে যান পরিকল্পনা।

আর এসব দেখেই বিএনপি জামায়াত জোট সরকার তাকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে থাকে। কারণ ইতিপূর্বে শেখ হাসিনার ওপর যতবারই হাম’লা করা হয়েছে, প্রতিবারই দলের কর্মীরা নিজেদের প্রাণ তুচ্ছ করে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে রক্ষা করেছেন। আর এ কারণেই ২০০১ এর পর তাঁর সকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা সরিয়ে নেয়া হয়। যা দেখে চিন্তায় পড়ে যান আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। শেখ হাসিনাকে ঘিরে বলয় তৈরী করে চলাফেরা করছেন নেতাকর্মীরা। তবুও তাদের ভাবনার শেষ নেই।

এমন সময় এগিয়ে আসেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। তারা তহবিল গঠন করেন। সেই অর্থে একটি Mercedes G63 AMG মডেলের গাড়ি কিনে পাঠান শেখ হাসিনার জন্য। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের সেই বিকেলে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে যখন হাম’লা শুরু করে তৎকালীন সরকারের মদদপুষ্ট হাম’লাকারীরা, সে সময় শেখ হাসিনা গাড়িতে ওঠার পরেও তিন দিক থেকে বেশকিছু গ্রেনেড ছোড়া হয় গাড়িটিকে লক্ষ্য করে। এতে গাড়ির একটি চাকা পাংচার হয়। মেশিনগানের গু’লিতে পেছনের জানালা ক্ষ’তিগ্রস্ত হয়। তবে গাড়িটি ঠিকই নিরাপদে গন্তব্যস্থলে পৌঁছায়।

সেই গাড়ির ড্রাইভার ছিলেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ড্রাইভার আব্দুল মতিন। তিনি বলেন, ‘নেত্রী (শেখ হাসিনা) গাড়ি থেকে বার বার নেমে যেতে চাইছিলেন। বলছেন- এখানে (বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ) এত আহত নিহ’ত মানুষ রেখে আমাকে নিয়ে যেও না। আমাকে নামিয়ে দাও। এখানে এদের দেখার মতো লোক নাই।’ তখন গাড়িতে থাকা তৎকালীন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী নেত্রীকে জানান- ওদের দেখার মতো লোক আছে। আগে আপনাকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু শেখ হাসিনা তাকে ধমক দিয়ে বলেন- ‘আমাকে নিস না, আমি যাব না ওদের ফেলে রেখে।’

মতিন আরও বলেন, ‘সেদিন ঘটনাস্থল থেকে নেত্রীকে সুধাসদনে জোর করে নিয়ে যেতে হয়েছে। যখন সুধাসদনে রওনা হই, তখনও গাড়ি লক্ষ্য করে ছোড়া হয় একে-৪৭ এর গু’লি। তাই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেই রাস্তা পরিবর্তনের। চাকা পাংচার হওয়ার পরেও গাড়িটি সচিবালয়ের সামনে দিয়ে, দোয়েল চত্বর, পলাশী মোড় শহীদ মিনার, নিউ মাকের্ট হয়ে সুধাসদনে পৌঁছাই। আমার উদ্দেশ্য ছিল, রাস্তায় পরিস্থিতি বেতাল দেখলে গাড়ি বিডিআর সদর দপ্তরে ঢুকিয়ে দেবো।’

এতগুলো গ্রেনেড, বিভিন্ন ধরণের অটোমেটিক এবং হাই ভেলোসিটি স্নাইপার রা’ইফেলের গু’লি সহ্য করে, পাংচার হওয়া চাকা নিয়ে ক্ষ’তিগ্রস্ত গাড়িটি নিরাপদেই এসে পৌঁছায় শেখ হাসিনাকে নিয়ে সুধাসদনে। গাড়িতে ঢুকে পড়ার পর ভেতরে থাকা শেখ হাসিনা এবং তাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখা নেতৃবৃন্দের গায়ে আঁচ লাগেনি আর।

পরবর্তীতে এই গাড়ির পার্ফরম্যান্সে সন্তষ্ট হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার পরবর্তীতে আরো দুটি একই মডেলের গাড়ি ক্রয় করে। ২১ আগস্টের সেই গাড়িটি বর্তমানে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের কাজে ব্যবহৃত হয়। আর অপর দুটি ওয়াগন মাঝেমধ্যে প্রধানমন্ত্রী নিজে ব্যবহার করেন।

দেখতে অতি সাধারণ মনে হলেও কাজে একেবারেই অ’সাধারণ এই গাড়িটি। নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথা বলতে গেলে এতে রয়েছে ৩৬০° কম্পোজিট ম্যাটেরিয়াল। ৭.৬২ মিমি এর শক্তিশালী বু’লেট সাধারণ কোনো গাড়িতে একপাশ দিয়ে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলেও এই ওয়াগনটির বডির রঙে কোনো আঁচড়ও লাগতে দেয় না। গ্রেনেড এর বিপক্ষে এর ক্ষমতা ২১ আগস্টেই প্রমাণিত।

যদিও বর্তমানে আপগ্রেডেড ভার্সনে এখন আরো বেশি শক্তিশালী আর্মার্ড (প্রতিরক্ষামূলক ধাতব পাত) রয়েছে গাড়িটিতে। আর গতির কথা বলতে গেলে ০ থেকে ১০০ কি.মি গতিতে পৌঁছাতে এর ইঞ্জিনের সময় লাগে মাত্র ৫.৭ সেকেন্ডে। যেখানে R-15 version-3 মডেলের মোটরসাইকেল এর ০ থেকে ১০০ কি.মি গতিতে পৌঁছাতে সময় লাগে ১২ সেকেন্ড। এছাড়াও মার্সিডিজ কোম্পানির এই অত্যাধুনিক গাড়িটেতে রয়েছে আরও কিছু বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা। নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষজ্ঞরা এই গাড়িতে আরও কিছু অতিরিক্ত ফিচার যুক্ত করেছেন। যা নিরাপত্তার কারণে প্রকাশযোগ্য নয়।

এই মডেলের গাড়িটির সাধারণ ভার্সনটি দেশে আনতে হলে শুল্কসহ ১১ কোটি টাকার মতো পড়বে। কিন্তু শেখ হাসিনার ব্যবহৃত আর্মার্ড ভার্সনটি কিনতেই খরচ হবে ১.২ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৯ কোটি টাকা। আর শুল্কসহ যা গিয়ে দাঁড়াবে ৩০ কোটি।

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী এই মার্সিডিজ গাড়িটি বেশিরভাগ সময় ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেন। সরকারি কাজে BMW 7 Series ব্যবহার করেন। BMW 7 series এর আর্মার্ড ভার্সনটি ভারতের প্রধানমন্ত্রীসহ বিশ্বের বেশিরভাগ সরকার প্রধান ব্যবহার করে থাকেন।

তথ্যসূত্র: ডিফেন্স রিসার্চ ফোরাম

শেয়ার করুন !
  • 683
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply