পাকিস্থানি ক্যাম্পে ৭ মাস থেকে পরিবারকে রক্ষা করেছিলেন বীরাঙ্গনা টেপরি বেওয়া

0

সময় এখন ডেস্ক:

ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলা বলিদ্বারা গ্রামের বীরাঙ্গনা টেপরি বেওয়া (৬৫)। বাড়িতে ঢুকতেই মুখে মৃদু হাসি দিয়ে পরিচয় জানতে চাইলেন। এরপর বসতে দিলেন চেয়ারে। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে কাছে এসে বললেন, কী জানতে চান বলেন?

গত ১৮ অক্টোবর রবিবার সকালে একান্ত সাক্ষাৎকারে টেপরি বেওয়া তাঁর নিজ বাড়িতে আলাপকালে জানান, ১৯৭১ সাল। দেশে তখন স্বাধীনতাযু’দ্ধ। আমার বয়স তখন ১৬-১৭-এর মতো হবে। প্রতিদিন বাবা-ভাইয়ের সঙ্গে ভ’য়ে কাটত দিন। প্রতিদিনই মনে হতো, এই বুঝি পাঞ্জাবিরা এসে তাদের মে’রে ফেলবে।

এপ্রিলের শেষ দিকে টেপরির গ্রামের এক মোল্লা তার বাবা-ভাইকে বলে, যদি তোমরা তোমাদের এই মেয়েটাকে পাকিস্থানের ক্যাম্পে পাঠিয়ে দাও তাইলে এই মেয়ের উছিলায় তোমার পুরো পরিবার বেঁচে যেতে পারে। কোনো উপায় না থাকায় সহজ-সরল বাবা মেয়ের হাত ধরে কাছের পাকিস্থানি সৈন্যদের ক্যাম্পে দিয়ে আসে আমাকে। সারা রাস্তা ধরে একটা কথাও হয় নাই বাপ-মেয়ের মধ্যে। টেপরিকে দিয়েই মাথা নিচু করে ফিরে আসেন।

এরপর ৭ মাস টেপরি ছিল সেই পাকি ক্যাম্পে। টেপরির কাছে প্রতিরাতেই আসত ৩/৪ জন পাকিস্থানি শু* র বাচ্চা। পালা করে প্রতিদিনই ধ* করত তারা। আর বাকি অত্যা’চারের কথা মুখে বলার নয়। এভাবেই দীর্ঘ ৭ মাস নিজের দেহের বিনিময়ে নিজের পরিবার ও দেশকে রক্ষা করে টেপরি বেওয়া।

এর মধ্যে সময় অতিবাহিত হওয়ার পর দেশ স্বাধীন হলে পাকিস্থান ক্যাম্প থেকে বাবা টেপরিকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। টেপরি তত দিনে গর্ভবতী। গ্রামের লোকেরা বলে ‘ওটা’ ফেলে দিতে বলে। কিন্তু টেপরির বাবা বলেন, রেখে দে মা। তোর তো আর কেউ রইবে না। এই বাচ্চাই তোর একমাত্র সম্বল হবে। শেষ বয়সে তোর দেখাশোনার জন্য সেই তোকে আগলে রাখবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এরই মধ্যে জন্ম হয় টেপরি বেওয়ার একমাত্র ছেলের। ছেলের নাম রাখা হয় সুধীর।

ছোট থেকেই সুধীরের সঙ্গে কেউ খেলত না, তার থেকে সবাই দূরে দূরে থাকত। যেন সুধীর কোনো ছোঁয়াছে রোগ। তাকে সব সময় পাঞ্জাবির বাচ্চা, * রজ বলে ডাকত সবাই। অনেক অপ’মান সইতে হয়েছে তাকে। কিন্তু সুধীর কিছুই বলত না। বলার ভাষাও ছিল না তার জানা।

কেন কোনো প্রতিবাদ করতেন না- সুধীরকে জিজ্ঞেস করা হলে সুধীর বলছিলেন, ঝগড়া করতে তো লোক লাগে; কিন্তু আমার সাথে কেউ মিশত না। জীবনটা এখনো ফাঁকা ফাঁকা লাগে। এভাবে একাই জীবন কাটে ভ্যানচালক সুধীরের। পরিবারে মা, বউ আর দুই মেয়ে- এই সুধীরের পৃথিবী।

গ্রামের কারো সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তেমন নেই। সুধীরের ছোট মেয়ে জনতা রায়। তিনি দিনাজপুর কেবিএম কলেজে অনার্স ৩য় বর্ষে অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। তার দুই যমজ মেয়েকে সুধীর আগলে রাখেন। এ নিয়ে টেপরি বেওয়াসহ ৬ সদস্যের ভরণপোষণ ক’ষ্ট করে চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

টেপরি বেওয়া সরকারি বীরাঙ্গনার ভাতা ১২ হাজার টাকা পেলেও ঋ’ণের কিস্তি বাবদ অর্ধেক টাকা চলে যায়। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসকের দেওয়া একটি অটোচার্জার সুধীরকে দেওয়া হলে তিনি এখন ভ্যান ছেড়ে অটো চালাচ্ছেন। তবু সংসারের ঘানি টানতে হিমশিম খাচ্ছেন।

টেপরি বেওয়ার ছোট নাতনি জনতা রায় বলেন, দাদির ভাতার টাকা, বাবার অটো চালানোর টাকা দিয়ে ৬ জনের পরিবারের ভরণপোষণ ও আমার লেখাপড়ার খরচ চালানো বাবার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। গত বছর ডিসি স্যার আমাদের বাড়িতে এসে আমার পড়ালেখার বিষয়ে খরচ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু তা এখনো আমি পাইনি।

সংবাদ প্রতিবেদককে বীরাঙ্গনা টেপরি বেওয়া বলেন, শরীর তেমন আমার ভালো নেই, কোমরে সব সময় ব্যথা লেগেই আছে। সুধীরের সংসার টানতে খুব ক’ষ্ট হচ্ছে। এই করোনাকালে ছেলের আয় কমে গেছে। সব মিলিয়ে এখনো অনেক ক’ষ্ট করে সংসার চলে! প্রতিবেদক: সফিকুল ইসলাম শিল্পী।

শেয়ার করুন !
  • 867
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply