আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব ও সুদৃঢ় প্রভাব

0

কূটনীতি ডেস্ক:

জিএসপি ছিল পিছিয়ে পড়া দেশগুলিকে বিশেষ সুবিধা দেয়ার একটা প্রক্রিয়া। তবে একটি বিষয় হলো, বিশ্ব রাজনীতিতে সমীহ জাগাতে হলে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটি আরও ২ যুগ আগে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল সেটি হল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি। বিশ্ব মোড়লদের মত মাঝে মাঝে সামরিক শক্তি নিয়ে হম্বিতম্বি করা, এসবের মাধ্যমে একটি অঞ্চলে প্রভাব টিকিয়ে রাখা যায়।

সময়ের সাথে সাথে আরেকটু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস আবির্ভূত হয়েছে, তা হলো অর্থনৈতিক শক্তি। আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের সাথে এক সময় ধমকের সুরে কথা বলা বিশ্বব্যাংকও এখন নরম সুরে কথা বলে।

সময়ের সাথে বাংলাদেশের এই পরিবর্তনে বাংলাদেশ পাশে পেয়েছে দুটি দেশকে। এক হলো জাপান; যারা অনেকটা নিঃস্বার্থভাবে আমাদের পাশে ছিল। অন্যটি হলো চীন; যারা বে অব বেঙ্গলে প্রভাব বিস্তারে বাংলাদেশকে বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত করে। অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশে প্রচুর বিনিয়োগ করার মাধ্যমে এ দেশের অবস্থান পরিবর্তন করতে সাহায্য করছে।

আধুনিক বিশ্ব ব্যবস্থায় অর্থের গরমে, অর্থনীতির গরমে চীনের কাছে আমেরিকাও অনেকটা অ’সহায়। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই কাঁচামাল সরবরাহ করে চীন এত কম মূল্যে পণ্য দিয়ে আমেরিকার বৃহৎ কোম্পানিগুলোর অস্তিত্বের সং’কট সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে দেশটি। আর অর্থনৈতিক স্নায়ুযু’দ্ধের মজার ব্যাপার হলো, এতে সামরিক হাম’লা করে বিলিয়ন ডলার ব্যয় করা লাগে না। যার ফলে অনেক বড় বড় দেশের ওপর চীন ছড়ি ঘোরাতে পারছে।

সম্প্রতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী স্টিফেন বাইগান বাংলাদেশ সফর করেছেন। তার বার্তা পরিস্কার-

১. বাংলাদেশকে আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির ক্রিটিক্যাল মেম্বার হিসাবে উল্লেখ করেছে আমেরিকা।

২. চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ এর কাউন্টার হিসাবে আমেরিকা তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রভাব ফিরে পেতে বেল্ট এক্ট করতে যাচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো, আমেরিকা বুঝতে পেরেছে আফগানিস্থান ও ইরাকযু’দ্ধে আমেরিকার ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষ’তি হয়েছে। হারিয়েছে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক প্রভাব। আর আমেরিকার সেই প্রভাব এখন চীনের হাতের মুঠোয়। সবশেষে তারা বেল্ট এক্টের অধীনেও বাংলাদেশকে চাচ্ছে।

৩. সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একসময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যা দেয়া আমেরিকা এখন এতটাই মরিয়া যে, Free Trade Agreement (FTA) করার জন্য বাংলাদেশকে প্রস্তাব দিয়েছে। যা কল্পনা করাও কঠিন।

এখানে উল্লেখ করা যায়, বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে দায়িত্বরত মার্কিন রাষ্ট্রদূতেরা বাংলাদেশকে বেশ তোয়াজ করে চলেছে। যেখানে আগে নর্ম ছিল তারা এদেশে লর্ড স্টাইলে চলত। আর এখন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট বলেছেন, এদেশে বিনিয়োগ না বাড়ালে কিছুই পাবে না তারা। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে মাথা যেন না ঘামায়, সব দেশকেই সেই বার্তা দেয়া হয়েছে। যে আমেরিকা এক সময় রিজেক্ট করেছিল এফ-১৬ ফাইটার জেট বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করবে না, তারা দেড় যুগ পর এসে আগ বাড়িয়ে বলছে তাদের কাছ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনতে।

তবে যাই হোক, আমাদের এখন অর্থনীতিকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া উচিত। আর এক্ষেত্রে অবশ্যই আমেরিকার অফার গ্রহণ করে আমেরিকার সাথে এফটিএ চুক্তি করা উচিত। প্রশ্ন আসতে পারে কেন?

১. GSP এর মেয়াদ শেষ আগামী ডিসেম্বর মাসে। আমাদেরকে বাণিজ্য সুবিধা পেতে এফটিএ করার বিকল্প নেই।

২. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এমন যে, আমাদের প্রধান রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র। তাদের দেশ থেকে আমরা খুব বেশি আমদানি করি না। কিন্তু আমাদের রপ্তানির বিশাল সুযোগ সৃষ্টি হবে যদি শুল্ক বাধা না থাকে। এমনকি আমরা ভিয়েতনামের মত প্রতিযোগী দেশের সাথে প্রতিযোগীতা করার সামর্থ্য পাব।

৩. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এফটিএ করলে ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যদেশের কাছেও একটা বার্তা পৌছাবে। এতে আমাদের রপ্তানির সবচেয়ে বড় গুচ্ছ বাজার ইউরোপিয় ইউনিয়নের সাথেও এফটিএ করতে পারব। আসিয়ানের সাথেও এফটিএ করা সহজ হবে। এতে দ্রুত রপ্তানি বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

চীন সম্প্রতি বাংলাদেশকে ৮ হাজার ২৫৬টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। হয়ত বাংলাদেশে চীনের এই উপস্থিতি আমেরিকাকে বাধ্য করেছে এফটিএ করার প্রস্তাব দেয়ার ক্ষেত্রে। চীন এত বেশি পণ্যে সুবিধা দিলেও চীন কিন্তু আমাদের প্রধান আমদানি অংশীদার। হয়ত এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রপ্তানি কিছুটা বাড়বে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র আমাদের রপ্তানি অংশীদার হওয়ায় সেখানে আরো দ্রুত আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠিত বাজার আরো শক্ত অবস্থানে নিতে সক্ষম হব।

আমরা চাই, আগামী ১০ বছর পর বাংলাদেশ এমন পর্যায়ে যাক, যেখানে বিশ্ব আমাদের সমীহ করবে। যা ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। এর আগে আমাদের মানসিকতাও উন্নত করতে হবে। নিজেকে, নিজ দেশকে আগে সন্মান করতে শিখি। ডিফেন্ড করতে শিখি। আমাদের মানসিকতা যেন নিচু না হয়। আমাদের অগ্রযাত্রা থামবে না।

@ ডিফেন্স রিসার্চ ফোরাম।

শেয়ার করুন !
  • 253
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply