পরমাণু শক্তির ব্যবহারে বাংলাদেশ অতিরিক্ত ৪৫ লক্ষ মেট্রিক টন ফসল উৎপাদন করছে

0

বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি ডেস্ক:

কোনো বিজ্ঞানী মিসাইল তৈরি করলে তাকে আমরা জাতীয় বীর উপাধি দেই। অথচ সভ্যতার কল্যাণে মিসাইলের ব্যাবহার নেই। কিন্তু যেই বিজ্ঞানীর সাধনা ফসল নিয়ে, কৃষি নিয়ে, দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানো নিয়ে, সেই বিজ্ঞানীর মূল্য আমরা দেই না। যেমন- ধান, সবজি, মাছ, ফল উৎপাদনে এখন আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু কিছু ফ্যাক্ট কখনো চিন্তা করে দেখেছেন?

১৯৭১-এ দেশে মানুষ ছিল ৭ কোটি। মানুষের অনুপাতে কৃষি জমিও ছিল বেশি। কিন্তু তখন দেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। আর এখন ২০১৯ সালে মানুষের সংখ্যা ১৭ কোটি৷ শিল্প কারখানা, নতুন শহর বাড়িঘরে কৃষি জমি প্রতি বছর কমছে। কিন্তু কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ১০ গুণ। এমনকি এখনো প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।

এই অসাধ্য সাধনের জন্য অ’ক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা। আপনি কি জানেন, প্রতি হেক্টর জমিতে আমাদের কৃষি উৎপাদন ভারতের থেকে অনেক বেশি? আপনি কি জানেন ‘বিনা’ উদ্ভাবিত ধানের জাত ২০টি দেশে চাষ হচ্ছে? আপনি কি জানেন, আমাদের বিজ্ঞানীরা বন্যা, লবণাক্ত ও খরা সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করছেন?

পরমাণু কৌশল কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৬০টি ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত ফসলের ৮ শতাংশ এখন এসব জাত থেকেই আসছে। আর পরিমাণের দিক থেকে তা প্রায় ৪৫ লাখ টন।

কৃষি প্রযুক্তির প্রথাগত ব্যবহারের পাশাপাশি কৃষিতে এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত সংস্থা বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। এই গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন সংস্থাটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম। তিনি এককভাবে ১৩টি ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছেন। যৌথভাবে উদ্ভাবন করেছেন ৭টি জাত।

ধান ছাড়াও উন্নত আঁশযুক্ত পাট, শাক হিসেবে ব্যবহারযোগ্য পাট, টমেটো, মুগডালসহ বিভিন্ন জাতের ফসল রয়েছে ওই তালিকায়।

ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলামের উদ্ভাবন করা লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধানের জাত বিনা-৮ দেশের উপকূলীয় এলাকার ২০ শতাংশ জমিতে চাষ হচ্ছে। ভারত, নেপাল, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের ২০টি দেশে ধানের এই জাত রাষ্ট্রীয়ভাবে নেওয়া হয়েছে, সেখানেও চাষ হচ্ছে।

সম্প্রতি ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কার কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বিনা-৭, ৮, ১১ ও ১২ জাতটি সেসব দেশে চাষের জন্য নেওয়া হয়েছে। শ্রীলঙ্কা, সিয়েরালিওন ও মিয়ানমারে পরমাণু কৃষি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের জন্য পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন বাংলাদেশের এই বিজ্ঞানী।

বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সক্ষম ফসলের জাত হিসেবে বিনা উদ্ভাবিত জাতগুলো বিশ্বের বিভিন্ন ফোরামে আলোচনারও জন্ম দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নিয়মিতভাবে এই জাত তাদের দেশে চাষের অনুমতি চাওয়া হচ্ছে।

ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সির (আইএইএ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশে নানা ধরনের বিপদ বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা এসব বিপদ সহ্য করতে পারে এমন ফসলের জাত উদ্ভাবন করে চলেছেন, যা বিশ্বে অনুকরণীয়।

২০১৪ সালে ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলামকে পরমাণু কৃষি গবেষণায় আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার দেয় আইএইএ এবং বিশ্ব খাদ্য সংস্থা (এফএও)। বিশ্বের ৮টি দেশের বিজ্ঞানী ওই বছর পুরস্কারটি পান। বাংলাদেশ ছাড়াও পেরু, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম ওই পুরস্কার পেয়েছিল।

ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, প্রকৃতির সাথে ল’ড়াই করে বাংলাদেশের কৃষকেরা ফসল উৎপাদন করে যাচ্ছেন। আমরা- বিজ্ঞানীরা এসব প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে সহনশীল নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন করে কৃষকদের হাতে তুলে দিচ্ছি। বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, কম জমিতে ও কম পানি দিয়ে বেশি নিরাপদ ফসল উদ্ভাবন। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

লবণাক্ত এলাকায় নতুন আশা:

আইএইএ’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়া। এর ফলে দেশটির উপকূলের ১০ লাখ একর জমিতে ফসল হয় না। লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলের ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হবে। বিনার উদ্ভাবন করা জাত এসব এলাকায় চাষ হচ্ছে। ফলে উপকূলের এসব মানুষ নিজের এলাকায় চাষবাস করতে পারবে। সংস্থাটির বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, লবণাক্ততা সহিষ্ণু ও বন্যা সহিষ্ণু ধানের জাত চাষ হলে দেশে অতিরিক্ত ৬০ লাখ টন ধানের উৎপাদন হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বিনা-৮ জাতের ধানের উৎপাদন দেশের উপকূলীয় এলাকায় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এত দিন লবণাক্ততা সহিষ্ণু ধানের জাত হিসেবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ব্রি ধান-৪৭, ব্রি-৬১ ও ব্রি-৬৭ চাষ হতো। সাম্প্রতিক সময়ে বিনা-৭ ও ৮ জনপ্রিয় হচ্ছে। বিশেষ করে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটে এই জাতের চাষ সবচেয়ে বেশি হচ্ছে।

অল্প পানিতেও ফলন দেয়

বন্যা মৌসুমে দেশের ফসলের সবচেয়ে বড় বিপদ ছিল বন্যা। বেশির ভাগ ধান পানির নিচে তিন থেকে ৫ দিন ডুবে থাকলে ফসল ন’ষ্ট হয়ে যেত ও ফলন কমে যেত। বিনা উদ্ভাবিত বিনা-৭ ও ২০১৮ সালে উদ্ভাবন করা বিনা-১২ বন্যার বিপদ থেকে ফসল রক্ষা করছে। সর্বোচ্চ ২৪ দিন এটি পানির নিচে ডুবে থাকলেও ন’ষ্ট হয় না। দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের কৃষকের কাছে এই জাত খুব দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে।

দেশে আমনের জাতগুলো প্রতি একরে ৩-৪ টন উৎপাদিত হয়। বিনা উদ্ভাবিত বিনা-১৭ জাত ৭ টন করে ফলন দিচ্ছে। দেশের আমনের উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনেও বিনা উদ্ভাবিত এই জাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে দেখা গেছে।

২০১১ সালে আফ্রিকার দেশ উগান্ডা থেকে নেরিকা নামের একটি ধানের জাত নিয়ে আসা হয়। খরা সহিষ্ণু এই জাতটি নানা কারণে দেশে তেমন জনপ্রিয় হয়নি। বিনার বিজ্ঞানীরা নেরিকা-১০ জাতটি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। সর্বশেষ ২০১৮ সালের আগস্টে তারা নেরিকা থেকে বিনা-২১ জাতের একটি জাত উদ্ভাবন করেন। এটি অন্য ধানের তুলনায় ৪০ শতাংশ কম পানিতে চাষ করা যায়। একই সঙ্গে এতে ইউরিয়া সারের ব্যবহার ৩০ শতাংশ কম লাগে। তথ্য সহায়তা- প্রথামআলো।

বিশেষ কৃতজ্ঞতা: ডিফেন্স রিসার্চ ফোরাম গ্রুপ।

শেয়ার করুন !
  • 262
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply