দক্ষিণ কোরিয়াকে বদলে দেয়া একটি মহাসড়ক এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

0

অর্থনীতি ডেস্ক:

১৯৫০ সাল থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কোরিয়ান যু’দ্ধে পুরোপুরি বিধ্ব’স্ত দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি। অবকাঠামো বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই। কোরিয়া ছিল তখন গরীব একটি দেশ। কিন্তু এই দেশটি হঠাৎ করে সারা বিশ্বের বুকে শক্তিশালী দেশে পরিণত হয়। আর এই শক্তিশালী অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার হবার পেছনে রয়েছে একটি জাতির শক্ত মনোবলের ইতিহাস।

কোরিয়াকে পরিবর্তন করে দেয় একটি মহাসড়ক। হ্যাঁ। আজকের গল্প গিয়ংবু এক্সপ্রেসওয়ের। সালটি তখন ১৯৬৩। রুগ্ন কোরিয়ার ক্ষমতায় আসেন পার্ক চুং হি। তিনি সিদ্ধান্ত নেন কোরিয়ার রাজধানী সিউলের সাথে দ্বিতীয় বৃহৎ শহর বুসানকে যুক্ত করবেন। সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করা হয় গিয়ংবু এক্সপ্রেসওয়ের। এই এক্সপ্রেসওয়েতে তিনি যুক্ত করতে চান দেশের প্রধান শহরগুলোকে। যুক্ত হবে সুয়ং, দাইজিয়ন, গুমি, দাইগু এবং বুসান শহর।

অভাবের দেশে এরকম বিলাসবহুল প্রকল্পের বিরো’ধিতা করেছিলেন সেদেশের অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ এমনকি সাধারণ মানুষও। মহাসড়কটি করতে যেয়ে কোরিয়া বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দেশের কাছে হাত পাতে। সাহায্য চায়। কিন্তু প্রত্যেকেই কোরিয়াকে ফিরিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো চিন্তাও করতে পারেনি দক্ষিণ কোরিয়া তাদের নিজস্ব অর্থে, প্রযুক্তিতে এবং জনবলে এরকম একটি প্রকল্প করতে সক্ষম।

১৯৬৭ সাল। দক্ষিণ কোরিয়ার মোট বাজেটের ২৩.৬ শতাংশ বরাদ্ধ করা হল এই প্রকল্প বাস্তবায়নে। ১৯৬৮ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি শুরু হল এই মহাযজ্ঞের কাজ। দুর্গম পথে বিরতিহীন অ’ক্লান্ত পরিশ্রম চলতে থাকল। ক্রমেই এগোতে লাগল এই প্রকল্প। মাত্র ২ বছর ৫ মাসে শেয় হয় এই প্রকল্পের কাজ। প্রকল্পের পথে পাহাড়ি দুর্গম অঞ্চলও ছিল। ৪২৮ কি.মি দীর্ঘ এই সড়কে রয়েছে ২৯টি বড় ব্রিজ, ১২টি টানেল এবং ১৯টি ইন্টারচেঞ্জ।

এই মহাসড়ক নির্মাণে কতজন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল জানেন? ৮৯ লক্ষ মানুষ! প্রায় ১৬.৫০ লক্ষ কনস্ট্রাকশনের যন্ত্রপাতি ব্যাবহার করা হয়েছে এই সড়ক নির্মাণে। সেই আমলে খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার যা এখনকার সময়ের কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমান। সড়কটি নির্মাণে প্রাণ হারান প্রায় ৭৭ জন মানুষ। আহত হন অসংখ্য।

৭ জুলাই, ১৯৭০, এই সড়কটি উদ্বোধন করা হয়। কী পেয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়া এই এক্সপ্রেসওয়ে করে?

দেশটির প্রায় ৬৩% জনগণ এই রাস্তার মাধ্যমে দ্রুত যোগাযোগের সুবিধা পায়। কোরিয়ার গড়ে ওঠে হাজার হাজার শিল্প কারখানা। যার ৮১% কারখানাই যুক্ত হয় এই সড়ককে ঘিরে। দক্ষিণ কোরিয়া পরিণত হয় সারা বিশ্বের অন্যতম কনস্ট্রাকশন জায়ান্ট হিসাবে।

সেই আমলের এরকম অসাধ্য সাধনকে কোরিয়ানরা বলে থাকে Can Do spirit; অর্থাৎ, আমরা পারবই। হুন্দাই কোম্পানিকে চেনেনা এমন লোক কম আছে। হুন্দাই কোম্পানির যাত্রা শুরু হয় এই মহাসড়ক নির্মাণে যুক্ত থেকেই।

“আমরা পারবই” এই প্রত্যয় থেকেই কোরিয়াতে গাড়ি নির্মাণ, বিমানবন্দর নির্মান, স্টিল মিল নির্মাণের মত কাজ শুরু হতে থাকে যার প্রধান শক্তি ছিল এই প্রকল্প থেকেই।

এবার আসি বাংলাদেশের প্রসঙ্গে। পদ্মাসেতু যখন আমরা করতে প্ল্যান নিয়েছি, তখন বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থা ও গুরুত্বপূর্ণ অনেক ব্যক্তিবর্গই আমাদেরকে তা’চ্ছিল্য করেছে, ফিরিয়ে দিয়েছে। তারা কখনো ভাবেনি বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে এরকম বৃহৎ প্রকল্প করতে পারবে। তারা জানত সামান্য ৫০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলেও বাংলাদেশকে সারা বিশ্বের কাছে হাত পাততে হয়।

এ দেশের বিপুল ডিগ্রিঅলা বড় বড় অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ এমনকি সাধারণ মানুষও বলেছিল- এটা সম্ভব না। হবে না। বিলাসি প্রকল্প। অ’প্রয়োজনীয়… ইত্যাদি। কিন্তু সকলকে উ’পেক্ষা করে শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অদম্য ইচ্ছা ও হার না মানার মানসিকতার কারণেই আমরা নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুতে হাত দিয়েছি।

এই পদ্মাসেতুর হাত ধরে আবদুল মোনেম এর মত দেশিয় প্রতিষ্ঠান সংযোগ সড়কের কাজ পেল। কাজ শুরুর পর একটি চক্র পদ্মাসেতু নিয়ে গুজব তৈরী করে দুর্নীতির। শুরু হয় তদন্ত। পরবর্তীতে কানাডার আদালত পর্যন্ত গড়ায় বিষয়টি। শেষ পর্যন্ত রায় আসে, কোনো দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি। মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বব্যাংকের যে কর্মকর্তাকে দিয়ে দুর্নীতির গুজব তোলা হয়েছিল, সেই কর্মকর্তাই অপর একটি ঘটনায় দুর্নীতির দায়ে বরখা’স্ত হন বেশ কিছুদিন পর।

এই একটি সেতু নির্মাণ শুরু হতেই বিশ্ব ব্যাংক এখন আমাদেরকে টাকা সাধে। আমরা পদ্মাসেতু করবই, পারতেই হবে। এই প্রত্যয়ে শুরু হল পদ্মাসেতুকেন্দ্রিক অন্যান্য প্রকল্প। নেয়া হলো পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরের প্রকল্প। ঢাকা থেকে পায়রা পর্যন্ত রেলপথ।

এ দেশের কোনো কোম্পানি রেল লাইন নির্মাণ করতে পারে, সেটা কারো ধারণা ছিল না। ম্যাক্স সেটা করে দেখাচ্ছে। হয়ত এখনো তাদের অবস্থান ক্ষুদ্র পরিসরে। হয়ত এক সময় তারাও শুধু বাংলাদেশে নয় বরং সারা বিশ্বে মাথা উচু করবে এই দেশের।

আমরা পারি। এটা আমরা জানি। এই সেতুর কাজ শেষ হলে, পায়রা বন্দর হয়ে গেলে, রেলপথে যুক্ত হলে এই অঞ্চল ঘিরে গড়ে উঠবে অসংখ্য শিল্প প্রতিষ্ঠান। ঢাকা চট্টগ্রাম চার লেনের কাজ হয়ে গেছে। খুব শীঘ্রই এক্সপ্রেসওয়ের কাজও শুরু হবে। ঢাকা মাওয়া বাংলাদেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ের কাজ দ্রুত চলছে। গাবতলী থেকে নবীনগর দ্বিতীয় এক্সপ্রেসওয়ের কাজও দ্রুত শুরু হবে।

এসব উন্নয়নের কথায় অনেকেই বিরক্ত হন। কিন্তু এর প্রভাব অর্থনীতিতে যে কতটা সুফল এনে দিবে সেটা হয়ত আর ৮-১০ বছরের মধ্যেই দেখতে পারবেন। এ দেশে আমরা এখনও এসব প্রকল্পের বিরো’ধিতা করি। অজুহাত দেখাই, খেতে পারি না ব্রিজ দিয়ে কী করব? অনেকে স্যাটেলাইট পাঠানোকে নিয়েও ট্রল করে। এসব কোনো কাজে আসবে না বলে গুজব ছড়ায়।

যাদের চিন্তাধারা এমন, সুফল তারাও পাবেন। সময় এখন আমাদের, ঘুরে দাঁড়ানোর। শক্তিশালী বাংলাদেশে যে দক্ষিণ কোরিয়ার মত উত্থান হবে না সেটা কেউ বলতে পারে না। একটি দেশের অর্থনীতি কত দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব সেটা দেখিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার এই মহাসড়কটি।

আমাদের অবকাঠামোয় ঘাটতি রয়েছে। নতুন এক্সপ্রেসওয়ে করতে গিয়ে বিদ্যমান রাস্তা মেরামতে খরচ করা সম্ভব হয়ত হচ্ছে না। কিন্তু যখন এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে তখন আমূল পরিবর্তন আসতে বাধ্য। অপেক্ষায় নতুন সেই দিনের।

© ডিফেন্স রিসার্চ ফোরাম

শেয়ার করুন !
  • 130
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply