অগ্রণী ব্যাংকের সেই জমি ফের হাজী সেলিমের দখলে!

0

সময় এখন ডেস্ক:

নৌবাহিনী কর্মকর্তাকে প্র’হারের জেরে জেলে যান সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম। এরপরই একের পর এক বেরিয়ে আসে নানা অপরাধের তথ্য। সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের দখ’ল অ’নিয়মের তথ্যও প্রকাশ্যে আসে। ইরফান সেলিমকে গ্রেপ্তারের সময় পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে অগ্রণী ব্যাংকের একটি জমি হাজী সেলিমের দখ’ল থেকে উদ্ধার করেন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

উদ্ধারের কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই জমি আবার দখ’লে নিয়েছেন হাজী সেলিম। সেখানে স্ত্রীর নামে সাইনবোর্ড টানিয়েছেন তিনি। ওই জমিতে অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণের জন্য নির্মাণ সামগ্রী নিয়ে রেখেছিল। পুনরায় দখ’ল করে ওই সামগ্রীও সরিয়ে ফেলেছে হাজী সেলিমের লোকজন।

আবার দখ’ল হলেও ওই জমি নিয়ে কথা বলতেও ভ’য় পাচ্ছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। তারা সরকারি এই সম্পত্তি উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা চাইলেও, কোনো ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।

২০ শতকের এই জমিটি গত কয়েক মাস ধরে সংসদ সদস্য হাজী মোহাম্মদ সেলিম দখ’ল করে রেখেছিলেন। যার বাজার মূল্য শত কোটি টাকা। জমিটি নতুন করে দখ’লে নেয়ার পর বসিয়েছেন পাহারা। পর্যায়ক্রমে হাজী সেলিমের লোকজন পাহারা দিচ্ছেন। ফলে ব্যাংকের কর্মকর্তা কর্মচারীরা ওই জমির আশেপাশে যেতে পারছেন না। দখ’ল হওয়া জায়গাটি অগ্রণী ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা পুনরুদ্ধার করে নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন। সেই কাজের মালামাল নেই ওখানে। জায়গাটি পুনরুদ্ধার হওয়ার পর নির্মাণ কাজ, নির্মাণ সামগ্রীর বেশ কয়েকটি ছবি রয়েছে এই প্রতিবেদকের হাতে। কিন্তু ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, এখন এর কিছুই নেই সেখানে। গত ১৫ দিন ধরে কাজও বন্ধ রয়েছে। ব্যাংকের নির্মাণ সামগ্রী সরিয়ে জমিতে স্ত্রীর মালিকানা দাবির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন ওই এমপি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন বলেন, জন্মের পর থেকেই অগ্রণী ব্যাংকের এই শাখা আমরা এখানে দেখে আসছি। কিন্তু কার জায়গা আমার জানা নেই। এখন আবার শুনছি এটা হাজী সাহেবের জায়গা। তারা নাকি দখ’ল করেছে এটা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকের ওই শাখার এক কর্মকর্তা বলেন, ২০০৩ সালে স্ত্রী গুলশান আরা বেগমের নামে জমিটি দখ’লে নেয়ার চেষ্টা শুরু করেন হাজী সেলিম। সে সময় এর একটি দলিলও বানান তারা। আর জায়গা না ছাড়ায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের হুম’কিও দেয়া হয়। এরপর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আদালতে মামলা করেন। কিন্তু চলতি বছরে করোনার প্রভাবে যখন সবকিছু স্থ’বির হয়ে পড়ে ঠিক তখনই হাজী সেলিমের লোকজন জায়গাটি দখ’ল করে নেন। বুলডোজার দিয়ে পুরনো ভবন গুঁ’ড়িয়ে দিয়ে সীমানা প্রাচীর তুলে দেন।

এই ঘটনার পর গত ২০ মে চকবাজার থানায় লিখিত অভিযোগ করেন ওই শাখার দায়িত্বে থাকা সহকারী মহাব্যবস্থাপক বৈষ্ণব দাস মন্ডল। পরে ১৫ জুন র‌্যাব-৩-এ একটি অভিযোগ দেন তিনি। ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা দাবি করছেন, ভুয়া দলিল ও কাগজপত্র তৈরি করে তারা সেটা অনেক আগে থেকেই দখ’ল করার পাঁয়তারা করছেন। থানায় অভিযোগ করলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না।

সরকারের জমি দখ’ল করে নেয়ার বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সাধারণ ডায়েরি করার পরও ব্যবস্থা না নেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মওদুত হাওলাদার বলেন, দেওয়ানি বিষয়ে আমাদের কোনো হস্তক্ষেপ করার নিয়ম নেই। আমি তাদেরকে বলেছি কোর্টে একটি মামলা করার জন্য। কোর্ট যখন আদেশ দেবে তখন আমরা ব্যবস্থা নেবো। এর আগে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব না।

জানা গেছে, ৭০ বছর ধরে এই জমিটি ওই ব্যাংকের দখ’লে রয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকেই জমিটি সে সময়ের হাবিব ব্যাংকের ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর হাবিব ব্যাংক ও কমার্স ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় অগ্রণী ব্যাংক। আর সেখানেই করা হয় ব্যাংকটির শাখা। পরে ওই জমিতে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় ব্যাংকটির আরেকটি শাখা পাশের একটি ভবনে সরিয়ে নেয়া হয়। আর এই জমিতে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।

কিন্তু গত এপ্রিলে জায়গাটি দখ’লে নেন হাজী সেলিমের লোকজন। এরপর নিজেদের উদ্যোগে জায়গাটি অগ্রণী ব্যাংক উদ্ধার করলেও বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারেনি। গত ৪ নভেম্বর রাতে গেটে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে। তাতে জমির মালিক হিসেবে হাজী সেলিমের স্ত্রী গুলশানারা বেগমের নাম লেখা রয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ করে কেউ কোনো কথা বলতে চাননি। এক ব্যাংক কর্মকতা বলেন, এখানে আমাদের আরো একটি শাখা আছে। এমনিতেই আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি, কেউ ভ’য়ে কথা বলছে না। তাছাড়া আমরা এখন একা একা চলতেও ভ’য় পাচ্ছি। এ ঘটনার পর ৫ নভেম্বর চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেছে অগ্রণী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। র‌্যাবকেও চিঠি দেয়া হয়েছে। এসব নিয়ে জানতে চাইলে মৌলভীবাজার শাখার ব্যবস্থাপক বৈষ্ণব দাস মন্ডল কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আমাদের মৌলভীবাজার শাখার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা খুব শ’ঙ্কায় আছেন। তাদের ওপর যে কোনো মুহূর্তে হাম’লা হওয়ার সম্ভবনা আছে। আবার আমাদের জমিটাও উদ্ধার প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে তো এভাবে চলতে পারে না। একজন এমপি কিভাবে সরকারি জমি দখ’ল করতে পারেন? আমি যতোটুকু জানি আমাদের ব্যাংকের এমডি, পরিচালকরা এই বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন করেছেন। তারা আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য কাজ করছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাজী মো. সেলিমের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তার ব্যক্তিগত সহকারী মহিউদ্দিন আহাম্মেদ বেলাল ফোনটি রিসিভ করেন। তার কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমপি মহোদয় কোনো কথা বলতে পারেন না। এই বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দিতে পারবো না।

বিষয়টি নিয়ে হাজী সেলিমের আইনজীবী সৈয়দ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। পূর্বপশ্চিম।

শেয়ার করুন !
  • 86
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

এই ওয়েবসাইটের যাবতীয় লেখার বিষয়বস্তু, মতামত কিংবা মন্তব্য– লেখকের একান্তই নিজস্ব। somoyekhon.net-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে এর মিল আছে, এমন সিদ্ধান্তে আসার কোনো যৌক্তিকতাই নেই। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে somoyekhon.net আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো প্রকার দায় বহন করে না।

Leave A Reply